দিনযাপন । ১১০৬২০১৬

ঢাকা শহরে একটা মেয়ের চলাফেরায় অসহায়ত্বের যে কয়েকটা ফ্যাক্টর আছে, তার মধ্যে অন্যতম সিগ্নিফিকেন্ট সম্ভবত তার পিরিয়ড হওয়ার সময়টা … অন্তত আমি আমাকে দিয়ে চিন্তা করলে দেখি যে আমি এমনিতে যেভাবেই চলি না কেন, পিরিয়ড হওয়া মানেই আমি কয়েক ধাপ পিছিয়ে যাই শুধুমাত্র এই চিন্তা করে যে ‘প্যাড চেঞ্জ করার জায়গা পাবো তো?’ কিংবা ‘রাস্তা-ঘাটে জ্যামে বসে থাকতে থাকতে কোনো অকওয়ার্ড কিছু ঘটবে না তো যদি প্যাড চেঞ্জ করার টাইম ওভার হয়ে যায়?’ … আমার জন্য পিরিয়ডের সময়টা খুব পেইনফুল কারণ আমি দুনিয়ার ওষুধপত্র খাওয়ার পরেও আমার মিনিমাম দেড় ঘণ্টার মধ্যে একবার প্যাড চেঞ্জ করতে হয়। ওষুধ খাচ্ছি তো অনলি রিসেন্টলি … তার আগে তো এমন অবস্থা হতো যে এক ঘণ্টা পাড় হবার আগেই প্যাড ওভারস্পিল্ট হয়ে যাবার অবস্থা হতো! … একেবারে ঘড়ি ধরে ধরে ৫০ মিনিট পর পর প্যাড চেঞ্জ করতাম তখন … এখন তাও ওষুধের কল্যাণে দেড়- দুই ঘণ্টা অন্তত সাস্টেইন করা যায় …

কিন্তু কাহিনী সেটা না … আমার অসহায় লাগে বেশি ওয়াশরুম ক্রাইসিস ইস্যুতে … ঢাকা শহরের বেশিরভাগ জায়গাতেই ওমেন-ফ্রেন্ডলি ওয়াশ-রুম নাই … একমাত্র বড় বড় অফিস আর রেস্টুরেন্ট ছাড়া … আর ঢাকা ইউনিভার্সিটির মতো এত বড় একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে একমাত্র কমনরুম ছাড়া আর কোথাও মেয়েদের ওয়াশরুম নাই … আর সেই ওয়াশরুমেরও যা অবস্থা … এমনি সময়েই খুব কাহিনী করে যাই … আর পিরিয়ড হলে কীভাবে কি করবো, চেঞ্জ করার আগে জিনিসগুলো কই রাখবো, চেঞ্জ করা প্যাডটা কই ফেলবো এগুলা নিয়েই একটা গোলমাল বেঁধে যায় ! … এখনো পর্যন্ত ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কমার্স ফ্যাকাল্টির গার্লস কমন রুমটা তাও যা একটু পদের পেয়েছি … যদিও ওয়াশরুমেও বিবিধ টাইপের মেয়ে যায় বলে খুব ঝকঝকে –তকতকে থাকে না … তারপরও ইমার্জেন্সিতে চলে যায় …

আজকে ওয়াশরুম নিয়ে এত লিখতেসি কারণ এই ওয়াশরুম ইস্যুতে আজকে বেশ ভুগসি … ৪টায় ক্লাস ছিলো … সোয়া দুইটা সময় বাসা থেকে বের হলাম … ভাবলাম যে এমন সময় বের হচ্ছি, সাড়ে ৩টা নাগাদ তো পৌঁছায়ই যাবো … নেহায়েত কাঁটায় কাঁটায় ৪টার একটু আগে-পরে হবে … কিসের কি! এমনই জ্যাম যে ভার্সিটি গিয়ে পৌছালাম পৌনে ৫টার দিকে! এদিকে পিরিয়ড চলছে … ২টার দিকে প্যাড চেঞ্জ করেছিলাম, আর অলরেডি ৩ ঘণ্টা হয়ে গেছে। যদিও প্রথম দিন বলে ব্লিডিং কম, তাও সেফ থাকার জন্য প্যাড চেঞ্জ করে ফেলতে পারলে ভালো হতো … ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এমনিতেই গরমের ছুটি চলছে, তারওপর আজকে শনিবার … আমাদের জাপান স্টাডি সেন্টারের সেমিনার রুমের ওয়াশরুমই একমাত্র ভরসা … সেমিনার রুমে আজকে ভাইভা হচ্ছে ১০ম বা ১১তম ব্যাচের, সো ওইখানে তখন আর যাওয়া গেলো না … একদিকে প্যাড চেঞ্জ করার টেনশন, আরেকদিকে ব্লাডারে কিঞ্চিৎ চাপ নিয়ে ক্লাসে গিয়ে ঢুকলাম … ক্লাসে যেতে যেতেই আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেলো নিজের অসহায় অবস্থার কথা ভেবে … রাস্তায় জ্যামের জন্য এত দেরি করে ফেলেছি, ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, পিরিয়ডের টেনশন, ওয়াশরুমের টেনশন সবকিছু মিলায় খুব কান্না পেয়ে গেলো … এর মধ্যে সামনের সব বেঞ্চ ফিলড আপ … প্রতীতির পাশে একটা ছেলে বসে ছিলো, সে আমার ‘সামনে জায়গা নাই?’ ‘ পেছনে বসবো না’ ‘এখানে না’ ‘ওখানে না’ টাইপের উসখুস অবস্থা দেখে জায়গা ছেড়ে দিলো … আমি বসতে বসতেই আমার গলায় ঠেকে থাকা কাণ্ণা চোখ ফেটে বের হয়ে আসছিলো … বেঞ্চে মাথা পেতে মুখ ঢেকে কতক্ষণ লিটেরালি কাঁদলাম! স্যার তখন ক্লাসে ছিলো না ভাগ্যিস … জিয়া ভাইদের গ্রুপটাকে তাদের টপিকের প্রেজেন্টেশন দিতে বলে উনি জরুরি কাজে নিচে গিয়েছিলেন … স্যার ক্লাসে থাকলে হয়তো আমাকে পেছনে গিয়েই বসতে হতো আর তারপর আর ক্লাসেই মনোযোগ দিতে পারতাম না …

আজকে ক্লাস শেষ হয়ে গেলো সাড়ে পাঁচটার পর পরই … ক্লাস শেষে ওয়াশরুমে যাওয়ার টেনশনটা আরো বেড়ে গেলো … আমার খালি মনে হচ্ছে যে আর একটু দেরই করলেই প্যাড ওভারস্পিল্ট হয়ে একটা কেলেংকারি অবস্থা হয়ে যাবে … ঠিক করলাম সেমিনার রুমে গিয়ে দিলরুবা ম্যা’ম বা লোপা ম্যা’ম যদি থাকে উনাদের ডেকে বলবো যে আমার এই এই ব্যাপার, সেমিনারের ওয়াশরুমটায় একটু যেতে দেন। দেখলাম যে উনারা নাই। অফিসে মামুন স্যার-ই কি একটা কাজ করছিলেন। তার কাছেই গেলাম। মনে মনে ভাবলাম যে এমনিতে যদি ইমার্জেন্সি শুনে ওয়াশরুমে যেতে না দেয়, তাহলে স্যারকেও পিরিয়ডের কথা বলে ফেলবো … স্যার দেখলাম ওয়াশরুমে যাওয়া লাগবে শুনেই ‘হ্যাঁ, অবশ্যই … কেন নয়! এইটার জন্য আবার রিকোয়েস্ট করতে হয় নাকি?’ এইসব বলে উঠলেন … কিন্তু কপালে শনির দশা থাকলে যা হয় আর কি! ওয়াশরুম তালা মারা, এবং আজকে অফিসের শাহীন ভাই, লাভলু ভাই কেউই চাবি আনে নাই। সাইদ ভাইয়ের কাছে চাবি, আর উনি ৩ তলায় পরীক্ষার হলে গেছেন, সহসা আসবেন না! …

শেষপর্যন্ত সেই ওয়াশরুমে আমার যাওয়া হলো বাসায় এসে … তাও ভালো যে ইফতারের সময়টায় রওনা দিয়েছিলাম আর ১৫ মিনিটে বাসায় পৌঁছে গেছি! …

তারপর ভাবলাম, আজকে পিরিয়ডের প্রথম দিক বলে এইভাবে থাকতে পেরেছি … যদি আজকে সেকন্ড বা থার্ড দিন হতো, তাহলে বোধহয় ভার্সিটির ত্রিসীমানায়ও যাওয়া হতো না … শুধুমাত্র ওয়াশরুম ক্রাইসিস-এর জন্য ক্লাস বাদ দিয়ে ঘরে বসে থাকতাম … কালকে খুব নেচে নেচে নিশাতের সাথে গুলশান যাওয়ার প্ল্যান করছি … কিন্তু সেইটা আদৌ কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে হয় না … একে তো যাবো পিঙ্ক সিটিতে … তার আগে হয়তো আশে-পাশের কোনো রেস্টুরেন্টে ওয়াশরুমে যাওয়া যাবে, কিন্তু ধানমন্ডি থেকে পিঙ্ক সিটি যাওয়ার ধকল এবং সময়ক্ষেপন সংক্রান্ত রিস্কটা তো থেকেই যাবে! ….. ওর সাথে কথা বলার সময় এই চিন্তাটা মাথাতেই আসে নাই … পিঙ্ক সিটির কাজতা হচ্ছেই না, এই টেনশনে হ্যাঁ হ্যাঁ কালকেই যাবো বলে বলে আমিও নেচে ফেললাম … নাহ! আই থিঙ্ক আই শুড সুইচ ইট ফর দ্য ডে আফটার টুমরো …

13344731_830730277062810_2141761461060035292_n

আজকে সকাল থেকেই কি যে লাগছে! কালকে সারারাত ঘুমিয়েছি খুব অস্বস্তি নিয়ে কারণ ব্লিডিং কতটুকু হচ্ছে, সারারাতে কিছু এদিক সেদিক হয়ে দাগ লেগে যায় নাকি বিছানায় এইসব টেনশনে খুব আরামদায়ক পশচারে ঘুমাতে পারিনি … সকালে নাস্তা করার পর থেকেই কেমন অস্বস্তিকর একটা বমি বমি ভাব শুরু হলো … কিন্তু বমির উদ্রেক হচ্ছে এমন না … দুপুরে খাওয়ার পর গোসল-টোসল করে বের হবো বলে রেডি হচ্ছি, তখন এমন বমির উদ্রেক হলো যে মনে হলো যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানেই বমি হয়ে যাবে … কোনোরকমে সামলায় বাথরুমে দৌড়ায় গেলাম, কিন্তু তখন আর বমি হলো না … এই অবস্থায় একবার ভাবলাম যে আদৌ বের হবো কি না … পরে ক্লাসের কন্টেন্ট মিস হয়ে গেলে ঝামেলা চিন্তা করে বের হলাম …

তো, সেই ক্লাসের কন্টেন্ট তো মিস-ই হলো! … গিয়ে খালি লাস্ট আধাঘণ্টা পেলাম … তাও স্যারের লেকচার না … ক্লাসের ৩ জনের খাপছাড়া প্রেজেন্টেশন … আজকে যে কি মেজাজ খারাপ হলো ক্লাসে … স্যার নেই … ৩ জন তাদের টপিক নিয়ে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছে, আর কয়েকজন পেছনে বসে ইচ্ছামতো কথা বলে যাচ্ছে আর মন্তব্য করে যাচ্ছে … না ওদের কথা শোনার গরজ, না যারা শুনতে চায় তাদের শুনতে দেবার গরজ … সামনে থেকে বারবার করে সবাই বলছে চুপ করতে, তাও আবার সেটার পাল্টা মন্তব্য করে! … স্যার ক্লাসে ফিরে এসে বলছিলেন যে এভাবে ক্লাসমেটরা লেকচার দিচ্ছে আর অন্যরা শুনছে – এই ব্যাপারটায় উনি অভিভূত … এমনই মেজাজ খারাপ ছিলো আমাদের কয়েকজনের যে আমরা বলেই দিলাম স্যারকে যে এমনটা হচ্ছে আপনি ক্লাসে আছেন বলে! যতক্ষণ ছিলেন না, ততক্ষণ পেছন থেকে বাজে মন্তব্য আর আজাইরা কথা বলা ছাড়া কেঊ আর কিছুই করে নাই … ব্যাপারটা স্কুলের বাচ্চাদের মতো আচরণ হয়ে গেলো, কিন্তু কয়েকজন আছে আমাদের ক্লাসে, যারা দিনের পর দিন এমনই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে যে এদের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেই ইচ্ছা করে না আমার, কিংবা আমার মতো আরও কয়েকজনের …

আজকে আরো কিছু বিষয় নিয়ে লিখবো ভেবেছিলাম … কিন্তু খুব টায়ার্ড লাগছে … মাথা ব্যথাও করছে খুব … কালকে আবার সকাল ৯টার মধ্যে স্কুলে যেতে হবে … সো, এখন খেয়ে-দেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে থাকতে চাই …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s