দিনযাপন । ১৬০৬২০১৬

এই রোজার ভীড়ে বাইরে বের হলেই কেমন অস্থির লাগতে থাকে। এত মানুষ, আর তাদের এত অসহনশীলতা, এত অস্থিরতা! এ ওর আগে যেতে চাইছে, ও একে গায়ে ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে, পায়ে পায়ে হেঁটে চলছে মানুষ, রাস্তায় গাড়ির পর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, এর মধ্যে আবার রিকশাওয়ালার সাথে গাড়ির ড্রাইভার, নইলে দুই গাড়িরই মালিক একে অপরের সাথে ঝগড়া করছে, সিএনজি খুঁজে পাওয়াই মুশকিল … বেলা ৩ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত সিএনজির গ্যাস নেয়ার উপায় নাই … তাই রাস্তায় তারা বেরও হয় কম … বেলা ১২ টার পর থেকে সিএনজি পাওয়াটাই কষ্টকর … হয় ১২টার আগে বের হয়ে গিয়ে গন্তব্যস্থলে বসে থাকতে হবে, নইলে ধরেই নিতে হবে যে সিএনজি পাওয়া, রাস্তায় জ্যাম পার হওয়া সব মিলিয়ে কাজের জায়গায় সময়মতো পৌঁছানো যাবে না …

এই যে মানুষের কেনাকাটার ভীড় আর রাস্তায় অসহনীয় অবস্থা, এ জন্য যারপরনাই অসামাজিক হয়ে যেতে হবে। নইলে আর উপায় নাই … এখন বাসা থেকে বের হলেই ৫০০ টাকা খরচ … গত ১২ তারিখ হয়ে স্কুল বন্ধ হয়ে গেলো, তারপর একদিন খালি ক্লাস হয়েছে, আরেকদিন নিশাতের সাথে বের হয়েছি … দুইদিনই অবশ্য এইটা সান্তনা ছিলো যে পরিচিত সিএনজিওয়ালাকে ফোন করে এনে তাকে নিয়েই বের হয়েছি। ফলে বাসা থেকে বের হয়ে সিএনজি খোঁজার হ্যসেলে পড়তে হয়নি। আজকে আবার বের হলাম, কিন্তু সিএনজিওয়ালাকে আজকে ফোন করিনাই … অবশ্য বেশি ঝামেলায় পড়তে হয়নি, এই বাঁচোয়া … শনিবার দিন একটা ক্লাস হবার কথা আছে … সেটা যদি হয়, তাহলে তো ওইদিন বের হবো … আর না হলে ভাবছি রোজার বাকি কয়েকটা দিন আর কোনোভাবেই ধানমণ্ডি এলাকার কাছাকাছি যাবো না … গ্রুপের দিকে যাওয়ারও আমার তেল নাই মোটেই … ৫০০ টাকা খরচ করে যাবো আসবো, তারওপর ওই এলাকায় আল্লাহর ওয়াস্তে সারাদিন তো বটেই, সন্ধ্যাবেলায় আরো উপচায় পড়া ঈদ শপিং-এর ভিড় … কোনো মানে নাই! …

এই যে ১৪ তারিখেই, বনানীর দিকে গিয়েছিলাম নিশাতের সাথে … প্রথমে গুলশানে পিঙ্ক সিটিতে একটা কাজ ছিলো, সেখান থেকে বনানীতে ‘ঝালমুড়ি’ নামে একটা মেলা হচ্ছিলো, ঐটাতে গেলাম … ঐখানে আবার নায়ীমীও গেলো … তো, সেদিন আবার অমিত-এর জন্মদিন ছিলো … আমি ভাবছিলাম যে নায়ীমীর সাথে গ্রুপের দিকে চলে যাবো … তারপর অমিত আসলে ওর সাথে দেখা-টেখা হবে … কিন্তু ফেরার সময় রাস্তার কি অবস্থা হবে, আদৌ যদি গিয়ে দেখি অমিত গ্রুপে যায় নাই, তাইলে কেমন বিরক্ত লাগবে এইসব ভেবে ভেবে আর গেলাম না! … বনানী থেকে ফেরার পথে হাসতে হাসতেই নিশাত আর নায়ীমীকে বলছিলাম যে ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিস্টেমের কারণে আমি কি পরিমাণ অসামাজিক হয়ে যাচ্ছি যে নিজের ভাইয়ের জন্মদিনেও ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলাম না, জাস্ট কীভাবে বাসায় ফিরবো সেটা চিন্তা করে! … কিন্তু আসলেই এটা একটা ফ্যাক্ট! … আমি রিসেন্টলি অনেক দাওয়াত আর হ্যাং-আউটে যাওয়ার প্ল্যান বাদ দেই খালি রাস্তার অবস্থা কি, কীভাবে যাবো-আসবো এইসব চিন্তা করে … আসলে মানুষ যে ঢাকা শহরে একটু টাকা হলেই গাড়ি কেনে, সেটার অন্যতম কারণ এই সাইকোলজিক্যাল ট্রমাই হবে … এমন যদি হইতো যে রিকশা-ওয়ালা, সিএনজিকে ডাকলেই কোনো প্রকার দ্বিরুক্তি না করে প্যাসেঞ্জার ওঠায়, তাহলে কিন্তু অনেক মানুষই গাড়ির ওপর ডিপেন্ডেন্ট হতো না … কিন্তু কতদিনই বা একজন মানুষ এই ঠ্যাকা নিয়ে চলতে পারে যে রিকশাওয়ালা, সিএনজিওয়ালাদের মর্জি হলে তারা যাবে, নয়তো যাবে না! … আমি নিজেকে দিয়েই এখন দেখি যে যেদিনই আমি জানি যে আমার পরিচিত সিএনজিওয়ালা আমাকে নিয়ে যাবে, আমার মাথা খুব ঠাণ্ডা থাকে, আমি খুব রিলাক্সড মুডে সব কাজ শেষ করি … কিন্তু যেদিনই আমার বের হয়ে সিএনজি খুঁজে যাওয়ার ব্যাপার থাকে, আমি সকাল থেকেই ক্যামন প্যানিকড ফিল করতে থাকি আর বের হয়ে সিএনজি পাবো কি না, টাইম মতো পৌঁছাতে পারবো কি না এইসব চিন্তায় আর কোনো কাজেই মন দিতে পারি না! …

আমার খালি মনে হচ্ছে এই শনিবারে ক্লাস না হোক … মামুন স্যারের ক্লাস … গতকালকে আর আজকেও ক্লাস হবার কথা ছিলো, কিন্তু স্যার রংপুর গেছেন, তাই ক্লাস হয়নি … ক্লাস না হয়ে একদিন থেকে ভালো হয়েছে … দেখা যেতো গত শনিবারের ক্লাসের ইস্যু নিয়ে ক্লাসে আরেকটা কাহিনী হতো … স্যারকে ইতিমধ্যে একপ্রকারভাবে জানানো হয়েছে বিষয়গুলো, সুতরাং স্যারও নিশ্চয়ই ক্লাসে এসে ঐ প্রসঙ্গ তুলতেন … আমার খালি মনে হচ্ছে শনিবারের ক্লাসটাও না হোক … যেইসব আজাইরা পাবলিক এইসব যাবতীয় কাহিনীর মূল হোতা হিসেবে কাজ করছে, তারা ‘খালি কলসি’ বলেই বেশি বাজে … ফলে এই লম্বা ছুটির পর যখন ধুন্ধুমার মিডটার্ম আর ফাইনাল পরীক্ষার ধামাকা শুরু হবে, তখনই বোঝা যাবে এদের দৌড় কতদূর … ছুটির মধ্যে তো দিলরুবা ম্যাডামের টার্ম পেপারের কাজও করতে হবে … আলটিমেটলি দেখা যাবে ১৭ তারিখ যখন টার্ম পেপার সাবমিট করতে হবে, অনেকেই জমা দেবে না। কেউ বলবে বুঝি নাই, কেউ বলবে করতে পারি নাই, কেউ বলবে ঢাকায় ছিলাম না ইত্যাদি ইত্যাদি … দিলরুবা ম্যাডাম এর মেথড খুব সিস্টেমেটিক … উনি কবে কি করাবেন, কতটুকু করাবেন সবই ওয়েল প্ল্যানড … ফলে এটার জন্য উনি থেমে থাকবেন না … যারা জমা দেবে তাদেরটা ঠিকই নেবেন, আর বাকিদেরকে পরে জমা দিতে বলে ঠিকই উনার ক্লাস এগিয়ে নিয়ে যাবেন … মামুন স্যারের টার্ম পেপার হলে ধরেই নিতাম যে স্যার তার ফ্লেক্সিবল অ্যাটিচুডের কারণে একদিন-দুইদিন করে সাবমিশন ডেট পিছিয়ে দেবেন, আর তারপর আমারও বিরক্ত লাগতে থাকবে যে এত কষ্ট করে কাজটা করে নিয়ে আসলাম, এখন ম্যাক্সিমাম স্টুডেন্ট দেয়নাই দেখে আমি টাইম মতো জমা দিতে পারবো না? … কারণ, ডেফিনিটলি আমি ডেডলাইনের মধ্যেই আমার সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে একটা কাজ করে নিয়ে যাবো, আর যাদের জন্য আমি এক/দুই ক্লাস পরে সেটা সাবমিট করবো, তাদের কারণে কিন্তু আমি বেনিফিটেড হবো না … কারণ এমন তো না যে দুইদিন বেশি পাবো ভেবে আমি দুইটা কাজ রেখে দেবো আর যখন সাবমিশনের ডেট পেছাবে তখন করবো!

13177917_1047054252070204_6453712393047892920_n

ঘরের জিনিসপত্র গোছানোর একটা মাস্টারপ্ল্যান মাথায় ঘুরছে … গোছানো মানে একপ্রকার রিঅ্যারেঞ্জমেন্ট আর কি … ক্লাস-টাস সব বন্ধ হয়ে গেলে একদিন মিস্ত্রীকে ডেকে এগুলা করাতে হবে … খাটের প্লেসমেন্ট চেঞ্জ করবো, কাপড়ের আলমারিটা সরাবো … প্লাস্টিকের বাক্সগুলো বারান্দায় দিয়ে দেবো … বেতের এক-দুইটা পার্টিশন কিনতে হবে … বাথরুমের পাশের অংশটাকে ড্রেসিং রুম, আর এই পূর্বদিকের অংশটাকে লিভিং কাম ওয়ার্কিং বানানোর প্ল্যান আর কি … খাটটাকে বারান্দা থেকে সরিয়ে জানালার পাশে নিয়ে আসবো … আর পড়ার টেবিলটাকে সরিয়ে দেয়াল বরাবর প্লেস করবো … তাহলে ঘরের এই অংশটুকুতে ঘুম, পড়া, থাকা, খাওয়া সবই করা যাবে … এখন সমস্যা হচ্ছে, এই এ বিষয়টা মাথায় ঢুকেছে, এই কাজ না হওয়া পর্যন্ত তো আমার শান্তি হবে না! … উফ! কি যে একটা অভ্যাস আমার! একবার একটা জিনিস মাথায় গেঁথে যাওয়া মানেই দিনরাত ওইটাই ফ্যানটাসাইজ করতে থাকবো! … এই যেমন এখন, টেবিলে বসে কাজ করছি ঠিকই, কিন্তু মাথায় ঘুরছে যে এইখানে খাটটা নিয়ে আসবো, আর মাটিতে আগে মুন্সিগঞ্জ থেকে আনা শীতলপাটিটা বেছাবো, তার ওপর রংপুর থেকে আনা লাল শতরঞ্জিটা … তারপর যাবতীয় জিনিসপত্র বিছানার ওপর, আশেপাশে ছড়ায়-ছিটায় কাজকর্ম করবো …

ঠিক করেছি এবার ঈদের শপিং হিসেবে কিছু গাছ কিনবো … বাড়ির বাইরে রাখবো … আমাদের সিড়ির অংশটায় একটা খোপের মতো আছে, ওইটাকে গাছ রেখে, শো-পিস রেখে ইউটিলাইজ করা যায় … তাতে করে এইটা যে আমাদের বাসা, সেইটার একটা আইডেন্টিফিকেশনও তৈরি হবে … বাসার ইন্টেরিওর-এক্সটেরিওরের কাজ যতটুকু পারা যায় গুছিয়ে নেয়া আর কি … যা কিছু আছে ঘরের মধ্যে সেগুলোই তো এখনো গোছানো হলো না, প্রায় এক বছর হয়ে যাচ্ছে এসেছি … এই ছুটিতে এগুলোই গুছিয়ে নিতে হবে … তারপর আস্তে আস্তে নতুন জিনিসের চিন্তা … যেমন, আমি ভাবছি যে একটা বিশাল বইয়ের আলমারি বানাবো … যাবতীয় সাইকোলজির বই, গল্পের বই, ম্যগাজিন সবকিছু ওইটাতে রাখবো … আর ছোটো বুকশেলফ দুইটার একটাতে স্কুলের যাবতীয় বই আর কাগজপত্র, আরেকটা জাপানিজ স্টাডিজ-এর যাবতীয় জিনিসপত্র …

উফ! যেভাবে ভাবছি এভাবে ভাববার সাথে সাথেই যদি সবকিছু গোছানো হয়ে যেতো! …

যাই হোক, বেশি কল্পনাবিলাসিতা হয়ে যাচ্ছে … আজকের জন্য যথেষ্ট … এখন দিনযাপন লেখা শেষ করে জাপানের তকুগাওয়া পিরিয়ডের আর্ট আর আর্কিটেকচার নিয়ে গবেষণা শুরু করি … টার্ম পেপারের জন্য যেই লেভেলের পড়ালেখা করতে হচ্ছে, মনে হচ্ছে তকুগাওয়া বিশারদ হয়ে যাবো ! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s