দিনযাপন । ০২০৭২০১৬

মাথাটা কেমন জানি ভার হয়ে আছে! … সারাটা দিন আজকে ঘুমিয়েই কাটলো … ১২টার দিকে উঠলাম … বের হবো কি হবো না একটা কফিউশনের মধ্যে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে মাথা ধরলো … বের না হবার সিদ্ধান্তটা যে ভালো ছিলো সেটা পরে টের পেলাম … কারণ বের হলে গোসল না করেই বের হয়ে যেতাম, আর তখন এই মাথা ব্যথা নিয়ে বাইরে থাকতে আরও অসহ্য লাগতো … দুপুরে দেড়টার দিকে একবার ভাবলাম যে গোসল করে ফেলি … তারপর আবার আলসেমি করলাম যে থাক! খাওয়া দাওয়া করেই একবারে গোসল করবো, তারপর বিকালে না হয় একটু বের হবো … ৩টার দিকে খাওয়া-দাওয়া করে এসে বসতে বসতেই মাথাটা এমন ভার হয়ে গেলো যে গোসল, বের হওয়া সব চিন্তা বাদ দিয়ে শুয়েই পড়লাম … ভাবলাম যে ৫টার দিকে উঠে গোসল করে বের হবো, গ্রুপের দিকে না যাই, লালামের বাসার দিকে যাবো … কিসের কি! মাথার ভার হওয়া ভাবটা একটা ঘোর লাগা মাথা ব্যথায় পরিণত হলো … একেবারে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ঘুমাইলাম … কি কি জানি দেখলাম ঘুমায় ঘুমায় … সবকিছু ঠিক মনেও নাই …

গতকালকে রাত থেকেই এই অবস্থা! কালকে রাতে গুলশানের ঘটনার কারণেই সম্ভবত ধানমন্ডি/শাহবাগ পর্যন্তও রাস্তা পুরা প্যাকড হয়ে ছিলো ট্রাফিকে। কালকে গ্রুপে গিয়েছিলাম। রাতে সাড়ে ১১টা সময়ও শাহবাগে যখন সিএনজি খুঁজি, তখনও যতদূর দেখা যায় খালি ট্রাফিক আর ট্রাফিক … আমি একবার ভাবছিলামও যে রাস্তা খালি না হওয়া পর্যন্ত রানা আর গোপীকে নিয়ে শাহবাগেই বসে থাকি, দরকার হলে ওদের রিকোয়েস্ট করবো আমাকে বাসা পর্যন্ত দিয়ে ঐ সিএনজিতেই আবার ফিরতে, ভাড়াও দিয়ে দেবো … এদিকে তখন অলরেডি আমার মাথা ভার লাগাও শুরু হয়ে গেছে … এর মধ্যে একটা সিএনজি পেয়ে উঠে গেলাম … দেড় ঘণ্টা লাগলো বাসায় পৌঁছাতে … পৌনে ১ টা বাজে তখন! … সিএনজিতে বসে বসে ঘুমায়ই যাচ্ছিলাম প্রায় … জোর করে চোখ খুলে রইলাম … আগের দিন রাতে ঘুমিয়েছিই সাড়ে ৪টার দিকে … আবার উঠেছি সকাল সকাল … তারজন্যই ক্লান্তিটাও বেশি ছিলো … বাসায় এসে কোনোরকমে গোসল করে চুল শুকিয়ে নিতে যতক্ষণ … তারপরেই ঘুম …

সেই ঘুম থেকে উঠেছি আজকে ১২টায় … তার মধ্যেই আবার রানা যোগাযোগ করলো যে মুভি দেখতে বের হচ্ছি কি না … গতকালকে রাতে কথা হয়েছিলো যে আজকে দুপুরে সিনেপ্লেক্সে কনজুরিং ২ দেখতে যাবো … কে কে যাবে শিওর ছিলো না … আমি আবার রানাকে বলছিলাম যে শেষে খালি আমি আর রানা গেলে তো মজা হবে না … আর কেউ যাবে কি না জেনে প্ল্যান ফিক্সড করতে বলসিলাম … ও আর রাতে জানায়নাই যে নায়ীমীও যাবে … আমিও ভাবসি যে আর কেউ হয়তো যাবে না, তাই আর কিছু বলে নাই … এদিকে সাড়ে ১২টা সময় রানা ফোন করলো বাসার নাম্বারে যে বের হইসি কি না! … শো শুরুই হবে পৌনে ২ টায় … আমি বের হইতে হইলেও মিনিমাম ১টা বাজবে! নাস্তা করবো, চা খাবো, বাথরুমে যাবো, রেডি হবো … আর রাস্তার কি অবস্থা কে জানে! … তখনই মাত্র ফেসবুকে পড়ছিলাম যে গুলশান ২ এর রাস্তা ব্লকড … সেটার ইফেক্ট কতদূর পড়েছে সেটাও তো জানি না! … পৌনে ২ টার মধ্যে পৌঁছানো তো দূরের কথা, ৩টা সময়ও পৌছাবো কি না আল্লাহ মাবুদ জানে। রানাকে পরে জানায় দিলাম যে যাবো না … দেখা যাবে ওরা টিকিট কাটবে, আমারও পৌঁছানো হবে না, টিকিটের টাকাটা শুধু শুধু মার যাবে!

13532863_842888865846951_1807652815823967378_n

কেমন জানি একটা অদ্ভুত রকমের শূণ্যতা ভর করে আছে! মনে হচ্ছে এই শূণ্যতা বোধের কারণেই হয়তো মাথাটা আরও ভাড় হয়ে আছে … কালকে রাতে যখন শাহবাগে দাঁড়িয়ে সিএনজি খুঁজছি তখনও পর্যন্ত গুলশানের ঘটনার কথা জানি না … যেহেতু এখন আমার সিম ডিঅ্যাক্টিভেটেড, তাই ফোনের নেট-ও ব্যবহার করা হয় না, ফলে নিউজ আপডেট-ও পাই না … বাসায় এসে ফেসবুকে বসতে না বসতেই জানলাম যে গুলশান ২ একটা হোটেলে ঢুকে ৬/৭ জন নাকি কুপিয়ে মেরে ফেলেছে অনেককে, বিদেশী বাংলাদেশী অনেকেই নাকি আছে! … এমনকি কয়েকজনকে নাকি হোস্টেজও করে রাখা হয়েছে … পুলিশ ঘটনার প্রায় সাথে সাথেই নাকি ওদিকটায় গেছে, কিন্তু পালটা গোলাগুলি আর গ্রেনেড আক্রমণে দুইজন পুলিশ মারাও গেছে … এরপর ভোরবেলার দিকে আর্মি গিয়েছে, গোলাগুলি হয়েছে, ৬ হামলাকারী মরেছে, ১ জনকে নাকি ধরেছেও … হোটেলে কয়জন ছিলো, কয়জন মারা গেছে, বা কয়জন উদ্ধার হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান হয়তো সরকার কখনোই প্রকাশ করবে না, কিন্তু মোটামুটি ২০ জনের মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সূত্র থেকে! … পুরো ঘটনাটাই কি ভয়ঙ্কর! … কথা নাই বার্তা নাই, গুলশান ২ এর একটা ডিপ্লোমেটিক জোনে এভাবে কয়েকজন বন্দুক আর তলোয়ার নিয়ে ঢুকে মানুষ মেরে ফেলবে! … কি হয়েছে, কারা মেরেছে, কীভাবে মেরেছে সেই খবরের অনেকরকমের ভার্সন পাওয়া যাচ্ছে … আর বাংলাদেশের নিউজ মিডিয়া, বিশেষ করে অনলাইন মিডিয়াগুলোর ঊপর ইদানীং যেহেতু বিশ্বাসটা অনেকই কমে গেছে, তাই যা-ই পড়ছি সেটাই বিশ্বাস করে ফেলছি না … অনেকে বলছে এটা জামাত শিবিরের কাজ, কেউ বলছে আইএস, কেউ আবার ইন্ডিয়ান একটা জঙ্গিদলের কথা বলছে … একটা ব্যাপার বারবার আসছে যে ওখান থেকে উদ্ধার হওয়া জিম্মিরা বলছে যে যারাই ওখানে হামলা করেছে তারা নাকি কোরানের আয়াত পড়তে বলেছে, সুরা বলতে বলেছে, যে বলতে পেরেছে তাকে মারে নাই, আর যে বলতে পারে নাই তাকে মেরেছে, আবার আইএস নাকি টুইটারে হোটেলের ভেতরের ছবি দিয়ে পোস্ট করেছে যে তারাই এটা করেছে, আবার কারা অ্যাটাকার ছিলো তাদেরও নাকি কয়েকজনের ছবি দিয়েছে! … এখন বাংলাদেশে আসলেই আইএস আছে কি নাই, যারা এরকম করে মানুষ মারে তারা সন্ত্রাসী এবং সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নাই, সন্ত্রাসীরা মুসলমান হইতে পারে না টাইপ অনেক কথাবার্তা শুরু হয়েছে … আমার তো মনে হয়, ঘটনাটা কে ঘটিয়েছে, তার চেয়ে ভয়ঙ্কর এটাই যে এরকম ঘটনাও আমাদের দেশে ঘটতে শুরু করেছে … গত ৬ মাসে কতকিছু হচ্ছে বাংলাদেশে! … গত কয়েকদিনেই তো কতকিছু হচ্ছে! … এই একজনকে খোলা রাস্তায় মেরে ফেলছে, তো আরেকজনকে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে যাচ্ছে, একজনকে রেইপ করছে তো আরেকজনকে মেরে ঝোপের ভেতর ফেলে যাচ্ছে, গত ৩/৪ দিনে দেশের এইখানে ওইখানে খালি হিন্দু মন্দিরের পুরোহিত/ঠাকুরকে কুপিয়ে মারারই খবর শুনছি! … এইগুলা সবই কি একটা বড় পরিকল্পনার অংশ না বিচ্ছিন্নভাবেই দেশে একের পর এক অপরাধ হয়ে যাচ্ছে সেটা নিয়ে কতজন ভাবছে? … দেশের সবাই কি একসাথে অপরাধী হয়ে যেতে পারে? … নাকি একটা কেন্দ্র থেকে এইসব অপরাধ করানো হচ্ছে? …

আমি ফ্যানাটিক না … ধর্ম নিয়েও না, জঙ্গিবাদ নিয়েও না, মৌলবাদ নিয়েও না, রাজনীতি নিয়েও না … আমি নাস্তিকও না … আমি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করি, কিন্তু তাকে শুধু ‘আল্লাহ’ নামে ডাকি না। আমার কাছে সৃষ্টিকর্তা একজনই, আর তাকে একেকধর্ম একেক নামে, একেক রূপে ডাকে। তাই সব ধর্মের প্রতিই আমার সমান সম্মান আছে … যাই হোক, এইসব খুন, ধর্ষণ, যাবতীয় কোপানো যদি ধর্মের নামে হয়ে থাকে, বা না-ও থাকে, আমি এইসব ঘটনাগুলো নিয়ে আহত হই কারণ আমি শান্তিকামী মানুষ … ‘ধর্ম’ শান্তির জন্য, মানুষে মানুষে ক্যাচাল বাঁধানোর জন্য না! আমি জানি, যা ঘটছে, যেভাবেই ঘটছে, এসব ঘটনায় আমি কিছু করতে পারবো না, আমার হাতে কোনো ম্যাজিক পাওয়ার নাই যে আমি মাঠে নেমে সবকিছু চেঞ্জ করে ফেলবো … কিন্তু আমার খারাপ লাগাটুকুই আমাকে অনেক অস্থির করে রাখে … গতকালকে থেকে লিটেরেলি আমার মন খুব বিষণ্ণ হয়ে আছে … আমি মানতেই পারছি না ঢাকা শহর কিংবা পুরো দেশটাই একটা ভীষণ রকমের পারসিকিউশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে … এখানে রিলিজিয়াস পারসিকিউশন আছে, পলিটিক্যাল পারসিকিউশন আছে, এমনকি হিউম্যানিটির’ও পারসিকিউশন হচ্ছে … মানুষের মোর‍্যাল এথিকস, কমনসেন্স, সিভিকসেন্স এসবের সংজ্ঞা পালটে যাচ্ছে …

কালকে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে অব্জার্ভ করার চেষ্টা করছিলাম ফেসবুকে কে কি বলছে, আর সেটার রিপ্লাইতেও কে কি বলছে … অনেকক্ষণ পর্যন্ত মানুষের আলাপ আলোচনা চললো সাংবাদিকরা কি করছে, তারা কি বলছে, সংবাদমাধ্যমগুলো কি করছে এগুলো নিয়ে … চ্যানেলগুলো উত্তেজনার চোটে নাকি পুলিশ কি স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আগাচ্ছে সেটাও বলে দিচ্ছে … আরেক নিউজ রিপোর্টার নাকি বাথরুমে লুকিয়ে আছে এক হোস্টেজের সাথে কি কথা হয়েছে, সে যে বাথরুমে লুকিয়ে আছে সেই খবর শুদ্ধ বলে দিয়েছে! … সেইটা নিয়েই ঘন্টাখানেক পর্যন্ত ফেসবুক গরম … কালকে মাথা ভার করা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে না পড়লে হয়তো আরও অনেকটা সময় আমি ফেসবুকে কাটাতাম … কিন্তু সেটা হলো না … উঠলামও দেরি করে … উঠে দেখলাম যে আর্মিরা অভিযান চালিয়ে হোস্টেজদের যারা জীবিত ছিলো তাদের উদ্ধার করেছে … এখন আবার আর্মিদের গুণগান চলছে … কয়েকদিন আগেই কিন্তু তনু হত্যার বিচারের দাবি চাইতে গিয়ে আর্মিদেরই গুষ্টি উদ্ধার করেছে ফেসবুক জনতা … এখন আবার মাত্র ’১০ মিনিটে’ আর্মি নাকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে, সেইজন্য আর্মিরা ন্যাশনাল হিরোর মর্যাদা পাচ্ছে …

ফেসবুক জনতাদের এই চিন্তার এবং আবেগের ফ্লাকচুয়েশন দেখলে আমার যেমন বিরক্ত লাগে, তেমনই হাসি পায়। যেকোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথে সবারই একটা মন্তব্য করার টেন্ডেন্সি তৈরি হয়ে যায় … যে কোনো সোশ্যাল ইস্যুতে পার্টিসিপেট করতেই হবে ‘উইথ অপিনিয়ন’, ব্যাপারটা এখন এমনই দাঁড়িয়েছে! … যে কিছু বলবে না, চুপচাপ পুরো ঘটনা দেখবে, জানবে, শুনবে, নিজের অপিনিয়ন নিজের মধ্যেই রাখবে, প্রয়োজন না হলে মুখ খুলবে না, সে যেন চরম অসামাজিক! … আর আমার কাছে মনে হচ্ছে , যে কোনো ঘটনার ক্রিটিক্যাল রিজনিং-এর ক্ষমতা যেন মানুষের দিন দিন কমে যাচ্ছে! … সবাই খালি একটা স্টেটমেন্ট দিতে চায়, একটা ‘পক্ষ’ ধারণ করতে চায়! … কে কোন পক্ষে, কোন দলে থাকবে সেটা নিয়েই নিজেরাই কোন্দল করতে থাকে, আর ঘটনার আসল গভীরতা আস্তে আস্তে চাপা পড়ে যায় …

আজকে অনেক লিখসি … আর লিখবো না … অস্থির লাগতেসে! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s