দিনযাপন । ১৪০৯২০১৬

কোথাও একটু হাওয়া বদলের জন্য মুখিয়ে ছিলাম … ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া যাওয়ার একটা হাল্কা-পাতলা প্রস্তাব এলো টিয়ামের কাছ থেকে … এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম …ফলে আগের দিন রাতে কথা বলে প্ল্যান করে পরদিন সকালবেলা উঠে ব্যাগ গুছিয়ে-টুছিয়ে দুপুরবেলা রওনা হয়ে গেলাম … ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া … কামতা’র বাসায় … 

ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া না গিয়ে অন্য কোথাও যাওয়া হলে হয়তো গত ৩ দিনের চিন্তা প্রক্রিয়াটাও ভিন্ন হতো … কিন্তু জায়গাটা ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া বলেই ইট ওয়াজ নট জাস্ট আ ঈদ ভেকেশন ট্যুর ফর মি … আজকে থেকে ২ বছর আগের কুরবানি ঈদে এই ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া যাওয়ার পাক্কা প্ল্যানটা  ক্যান্সেল করার মধ্য দিয়েই যেন একটা ভয়াবহ সময়ের সূচনা হয়েছিলো … আর এবার সেই ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া যাওয়ার মাধ্যমে মনে হলো যেন সেই থমকে যাওয়া প্ল্যানটাই বাস্তবায়ন করলাম … কিন্তু তাতে করে ভয়াবহ সময়টার কোনো ইতি ঘটবে কি না তা বুঝতে পারছি না … 

যাই হোক … গত ৩ দিনের ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া ভ্রমণটা আসলে নির্ভেজাল ছুটি কাটানোই হয়েছে … সারাদিন ঘুম আর টিভি দেখা … প্রভা আর প্রমার সাথে গল্প-গুজব করা … এই সবই … মনে মনে প্ল্যান ছিলো যে পাইকপাড়ার বাড়িটা এক পলক দেখে আসবো, মিশন স্কুলে যাবো আর এমনিই একটু এদিক সেদিক ঘুরবো … কিন্তু ৩ দিন ধরেই এমন বৃষ্টি হলো সারাদিন যে বের হওয়া আর হলো না … এমনকি কামতা’র মানে আমার মামা’র গ্যাস ফিল্ডের কোয়ার্টারের প্রেমেসিস-এও হাঁটতে বের হলাম না … ৩টা দিন টানা বাসা বন্দী … সিনেমা দেখলাম বসে বসে … দেখা সিনেমাই আবার রিভিশন দিলাম … কুংফু পান্ডা … ট্রান্সফর্মার্স এজ অব আল্ট্রন… এক্স-মেন ফার্স্ট ক্লাস … আর সেই সাথে খালাজ অ্যান্ড কামতাবৌ গ্যাং-এর সিরিয়াল ম্যারাথন … কাজ-কর্ম নাই কি করবো … বসে বসে তাদের সাথেই সিরিয়াল দেখলাম … কি সব গাজাখুরি কাহিনী সিরিয়ালগুলির! … আর বাংলাদেশের চ্যানেলগুলায় ঈদের অনুষ্ঠান কি হয় বোঝার চেষ্টা করলাম … দেখার মতো কিছুই পেলাম না … আজকে সকালে চ্যানেল আই-তে কৃষ্ণপক্ষ দেখাচ্ছিলো … হুমায়ুন আহমেদ-এর উপন্যাস, শাওনের ডিরেকশন … পাভেল ভাই-এর অভিনয়ের প্রশংসা শুনেছি অনেকের কাছেই … সেই উৎসাহেই দেখতে বসা … কৃষ্ণপক্ষ মূল লেখাটা আমার পড়া নাই বলে সিনেমার চিত্রনাট্যের অনেক কিছুই রিলেট করতে পারিনি …

যাই হোক, এই ৩টা দিনের মধ্যে গতকালকে সারাটা দিন খুব কষ্ট পেয়েছি গ্যাস্ট্রিসাইটিস আর অ্যাসিডিটিতে … গত পরশুদিন মোটামুটি সারাদিনই মশলাদার মাংস খেয়ে খুব অস্বস্তি লাগছিলো রাতেই … ভোরবেলা থেকে মনে হতে লাগলো সব বমি করে ভাসায় দেবো … ভয় পাচ্ছিলাম যে একবার যদি আমার বমি শুরু হয়, তাহলে অবস্থা একেবারে নাজেহাল হয়ে যাবে … বমি থেকে ডিহাইড্রেশন হয়ে যাবে, আর তারপর পেটও কলাপ্স করবে … সকাল থেকেই তাই স্যালাইনের ওপর থাকলাম … স্যালাইন খাওয়াতে বমি বমি ভাবটা কমলো, আর ডিহাইড্রেশনও হলো না, পেটেরও গোলমাল হলো না … দুপুরে কোরবানীর মাংস দিয়ে ভাত খেলাম, কিন্তু রাতে প্লেইন আলু ভর্তা আর ডাল … অতপর গ্লাস ভর্তি করে বার দুয়েক কোক খেয়ে বড় বড় করে ঢেকুর তুলে শান্তি পেলাম … রাতটাও কিছুটা অস্বস্তিতে কাটলো … ঘুমাতে ঘুমাতে প্রায় ৩টা বেজে গেলো … সকাল থেকে দেখলাম যে আজকে বেশ সুস্থ … আজকে সারাদিনে আর মাংসজাতীয় কিছু খাওয়ারই রিস্ক নেই নাই … দুপুরবেলা এমনিতেও আজকে প্রিয় করলা ভাজি , লাউ চিংড়ি আর পাবদা মাছ ছিলো … আর কোনো আইটেমের দিকে ফিরেও না তাকিয়ে এগুলা দিয়েই আমার করে ভাত খেয়েছি … পেট ঠান্ডা তো দুনিয়া ঠান্ডা কি আর এমনি এমনি বলে! …

আজকে বিকালবেলা রওনা দিয়ে চলে আসছি ঢাকায় … যাওয়ার সময় যেই মাইক্রোতে গিয়েছিলাম সেই ড্রাইভারটা বেশ ভালো ছিলো … আজকের ড্রাইভারটা মনে হলো বেশ অস্থির আর চালালোও একটু রাফ … লং জার্নিতে রাফ চালানো ড্রাইভার পেলে আমার খুব অস্বস্তি লাগতে থাকে … মনে হয় যে এই বুঝি অ্যাক্সিডেন্ট হবে … আর ঈদের সময় তো হাইওয়েতে অ্যাকসিডেন্ট হওয়াটা প্রায় রুটিনের মতো! … আর এইটা আমার কেন জানি সবসময় খুব মনে হয় যে আমি হয়তো রোড অ্যাক্সিডেন্টেই মারা যাবো! … ফলে লং জার্নিগুলাতে এমনিতেই কেমন একটা ‘এই বুঝি অ্যাক্সিডেন্ট’ হলো টাইপের মানসিক চাপ কাজ করতে থাকে! … মানসিক চাপটা যদি মানসিক প্রস্তুতি হতো তাহলে হয়তো ভয় একটু কম লাগতো … তখন মনে হতো, যা হয় হবে! …

গত ৩ দিনের সবচেয়ে পজিটিভ দিক হচ্ছে বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়াতে থেকেও জ্বর আসে নাই … গত পরশুদিন দুপুরে বৃষ্টি দেখে খুব ভেজার লোভ হলো … প্রভাকে বলার পর দেখি ও-ও রাজি … ছাদে গিয়ে দুইজনে বেশ কিছুক্ষণ ভিজলাম … কত বছর পর এভাবে বৃষ্টিতে ভিজেছি সেইটা হিসাব-নিকাশ করেও বের করতে পারবো না … আগে যখন ব্রাক্ষ্ণবাড়িয়াতে পাইকপাড়ার বাসায় থাকতাম, তখন বাসার সামনে ঘাসের উঠান ছিলো … বৃষ্টি হলে বড় বড় ঘাসগুলো পানিতে দুলতো … আর আমি পা ডুবিয়ে হাঁটতাম … তখন ছোটো ছিলাম বলে ওই দৃশ্যের রোমান্টিসিজম বুঝতাম না … তখন ইট ওয়াজ জাস্ট আ নর্মাল থিং টু ডু হোয়েন ইত রেইন্ড … আর এখন সেই দৃশ্যটা কল্পনা করতেই মনের মধ্যে কেমন ‘আহা! আহা!’ করে ওঠে … এবার ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়ায় গিয়ে কংক্রিটের দালানের সিমেন্ট বাধানো ছাদে ভিজলাম হয়তো … কিন্তু বৃষ্টিতে নিজের ইচ্ছায় এভাবে গিয়ে ভেজার ব্যাপারটা শেষ কবে আমার অভিজ্ঞতায় হয়েছিলো সেটা আমি মনে করতেই পারছি না … অন্তত রিসেন্ট কোনো স্মৃতিতে নাই …

ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া গিয়েছি বলেই হয়তো … যেই ভাবনাগুলো মনে আনতে চাইছিলাম না, সেগুলো সব একে একে ভিড় করছিলো সময়ে সময়ে … দুই বছর আগে ৫ অক্টোবর সকালে আমি যদি ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া চলে যেতাম, তাহলে অনেককিছুরই ইতিহাস অন্যরকম হতো … অ্যান্ড ইট ওয়াজ জাস্ট আ ম্যাটার অভ মাই ডিসিশন… গাড়ি তো রেডিই ছিলো … টিয়ামও বলে রেখেছিলো যে যদি আমি সকালে ৮টার মধ্যেও মিরপুর চলে যাই, তাহলেও আমাকে নিয়ে যাবে ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া … আমি চাইলেই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে মিরপুর চলে যেতে পারতাম … তারপর ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া … ফোন বন্ধ করে ৩/৪টা দিন একদম গায়েব হয়ে থাকতে পারতাম … ফোন বন্ধও করতে হতো না … এমনিতেও তো সোহেল আমাকে খুঁজে বের করতে পারতো না … ঢাকায় ফিরে আসার পরে ওর সাথে যা বোঝাপড়া হবার হতো … কিন্তু ততদিনে অন্তত আমার নিজেরও মেন্টাল স্ট্রেংথ ফিরে আসতো … আর আমার ইমোশনাল স্টেটাসের সুযোগ নিয়ে সোহেল আমাকে অন্তত ওর ‘ভালোর জন্য’ কিছু করানোর সুযোগ পেতো না … আর আমিও আজকে এই মুহুর্ত অব্ধি দিনরাত যেই অনুশোচনার পাহাড় বয়ে বেড়াচ্ছি নিজের ভেতর, সেটা হতো না … হয়তো সবকিছুই অনেক বেশিই খারাপ হতো, কিন্তু তবুও সেসব কিছু আমি বুঝে-শুনে আমার নিজের সিদ্ধান্তে করতাম … কেউ আমার হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করেছে দেখে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল্ড হয়ে করতাম না …

একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম … ঘোরটা কেটে যেতো যদি আমি ওই সময়ের অই ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া ট্রিপটা দিতাম …

এইবারের ট্যুরটা কেমন জানি মনে হচ্ছিলো যে ওই যে যাইনাই দুই বছর আগে, ওই ট্যুরটাই যেন এবার ফিল আপ করলাম … কিন্তু যা হবার তা তো হয়েই গেছে! … এইবারের ট্যুরে যাওয়াটা কি নতুন কিছুর সূচনা করবে? … ভালো কিছু না আরো খারাপ কিছু? … মাথার মধ্যে কেবলই এই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে ৩ দিন যাবৎ … গত ১১তারিখ যখন রওনা দিলাম, তখনও যেতে যেতে পুরোটা রাস্তা এই ভাবতে ভাবতে গেছি … ৩টা দিন ধরে সব আড্ডা-গল্প-টিভি দেখার মাঝখানেও ভেবেছি … আজকে আসতে আসতেও ভেবেছি …

ভালো কিছু হবে এরকম ভাবতে আমার এখন অনেক ভয় হয় … আমার মনেই হয় যে আমার জীবনে এখন আর ‘ভালো’ বলে কিছু নাই … যা হয়, যা হবে সবকিছুরই ফলাফল হবে খারাপ … চরম খারাপ … এই যে পড়ালেখা করছি, মাস্টার্স করছি … সেখানেও ভালো কিছু হবে না … শেষমেশ নিজের একাডেমিক লাইফ নিয়ে যেই হতাশা আছে, সেটাই খালি পুরু হবে … এই যে চাকরি করছি … সেখানেও ভালো কিছু হবে না … শেষমেশ ‘আমি আসলে কিছুই পারি না’ টাইপের হতাশাগুলো গাঢ় হবে … থিয়েটার, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক সবকিছুতেই নিজেকে ‘আউটকাস্ট’ ফিল করার ব্যাপারটাও আরো স্তরায়িত হতেই থাকবে … হতেই থাকবে … ভালো কিছু আর কোনো কিছুতেই হবে না …

যাই হোক … এই যে ঢাকায় ফিরেছি … আবারও নিজের জন্য প্রচুর একা সময় পাবো … আরো বেশি বেশি এসব নিয়ে ভাবতে থাকবো … আরো হতাশ হতে থাকবো সবকিছু নিয়ে … দিনযাপনও একসময় হয়ে যাবে হতাশাযাপন …

আজকের মতো থাক … অনেক তো লিখলাম … আর লিখে কি হবে? … এর চেয়ে ভাত খাই গিয়ে … গরুর মাংস দিয়ে …   

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s