দিনযাপন । ২২১০২০১৬

কয়েলের ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে। টপটপ করে পানিই পড়ছে চোখ থেকে। একটু পরে নিশ্চয়ই প্রচন্ড মাথাও ধরে যাবে। নতুন কয়েল বোধহয়। কারণ অন্যদিন যখন কয়েল দেয় তখন এই প্রবলেম হয় না …একটা ট্রান্সক্রিপটের কাজ করতে বসছিলাম। দশ মিনিটের মতো করতে পারলাম। একে তো ওইটার সাউন্ড কোয়ালিটি ভালো না, কিছুই বুঝিনা কথা, তার ওপর এই চোখ জ্বলা … কাজটা করতেই পারলাম না ঠিকমতো …

নাকি কয়েলের জন্য চোখ জ্বলছে না? গতকালকে যে নিশাতের বিয়ের উৎসাহে পার্লারে সেজে ভূত হয়েছিলাম, ওখানে যে কাজলটা দিয়েছিলো, ওটা সম্ভবত স্যুট করেনাই। তখনও চোখ লাল লাল ছিলো। আর বাসায় এসে তো ভ্যাসলিন, লোশন এগুলো দিয়ে যখন ওই কয়েক লেয়ারের মেকাপ উঠাতে গেছি তখন চোখেও কিছুটা গেছে। তারপর তো ঘুমিয়েই গেছি। মেকাপ ইফেক্ট-ও হতে পারে। 

14681721_913437298792107_4523761603519421672_n

আজকে সকালটা শুরুই হয়েছে একটা মৃত্য সংবাদ দিয়ে। দুপুর ২টা বাজে তখনও আমি ঘুমাচ্ছি। ফোন আসলো। অরুণদ্যুতি আপুর ফোন দেখে ধরলাম। রিসিভ করতে না করতেই বলে উঠলো ‘তুই কি জানিস নেসার আঙ্কেল যে মারা গেছে?’ … আমার ঘুম ঘুম অবস্থায় বুঝতে কয়েক সেকন্ড লাগলো কোন নেসার আঙ্কেলের কথা বলছে অরুণদ্যুতি আপু। তারপরেই মনে পড়লো নেসার আঙ্কেল হচ্ছেন আলোহা টেইলার্সের দর্জি।সেই যেই আমলে আলোহা হ্যান্ডিক্রাফটস এর দোকান ছিলো, আর টিয়াম সেখানে কাজ করতো, তখন থেকেই এই নেসার আঙ্কেলকে আমরা চিনি। উনি পরে টেইলার্স শপ দিলেন, আমরাও সবসময় উনার এখানেই জামা-কাপড় বানাই। এমনকি এখন যে মিরপুরে চলে আসছি, এখনো মা আর আমি উনার কাছেই কাপড়-চোপড় বানাতে দেই। তো কয়েকদিন আগে অরুণদ্যুতি আপুর জরুরি ভিত্তিতে কিছু ব্লাউজ বানাতে হবে,তো আমি নেসার আঙ্কেলের কাছে উনাকে যেতে বলেছিলাম। অরুণদ্যুতি আপুও নেসার আঙ্কেলের কাজে বেশ খুশি হয়ে উনার রেগুলার কাস্টমার হয়ে গেলো। সেই নেসার আঙ্কেলের দোকানে আজকে সকালে গিয়েছিলো অরুণদ্যুতি আপু, গিয়ে শুনলো যে গত বুধবার সকালে নাকি নেসার আঙ্কেল রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন।বাস থেকে নামতে গিয়ে আরেকটা বাস তাকে ধাক্কা দিয়েছে, উনি পড়ে গেছেন আর উনার উপর দিয়েই নাকি বাস চলে গেছে! …এই সোমবারেও আমার সাথে উনার দেখা হয়েছিলো… আমি নিশাতের আকদ আর বিয়েতে পড়বো বলে ব্লাউজ বানাতে দিয়েছিলাম। বুধবারেও আমার যাওয়ার কথা উনার দোকানে। ব্লাউজের হাতা টাইট করে ফেলেছিলো, সেটা ঠিক করতে দেয়ার জন্য যাবার কথা। কিন্তু স্কুল থেকে বের হয়ে দেরি করে ফেললাম বলে আর যেতে ইচ্ছা করলো না। পরে তো অন্য ব্লাউজ দিয়ে শাড়ি পরবো ঠিক করলাম বলে আর এই ব্লাউজ তাড়াহুড়া করে ঠিক করতে দৌড়ালাম না। বুধবার দিন গেলে হয়তো শুনতাম যে ওইদিন সকালেই উনি মারা গেছেন!

খবরটা শোনার পর থেকে মন কেমন জানি খিঁচে আছে। মা’কেও এখনো জানাইনাই। মা-কেও জানানো দরকার। কিন্তু কারো মৃত্যু সংবাদ দেয়ার ব্যাপারটাতে আমি খুব অপটু। আর এরকম পরিচিত কারো আচমকা মৃত্যুর খবর দেয়াটা তো আরো কঠিন!

নেসার আঙ্কেলের কাছে মা’র কিছু কাপড় ছিলো। আমার ব্লাউজের টাকাও বলেছিলো ওই কাপড়গুলোর সাথে একবারে দিয়ে দিতে। টাকা বাকি নিয়েই মারা গেলো লোকটা!

আজকে সারাদিনের মধ্যে তো ২টা পর্যন্ত ঘুমালামই। তারপরে আর বের হলাম না। ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজের ক্লাস ছিলো। কিন্তু রাস্তার অবস্থা চিন্তা করে আর বের হলাম না। আওয়ামী লিগের সম্মেলন আজকে আর কালকে। অলরেডি নাকি কিছু রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। আর সমাবেশ/সম্মেলন যেহেতু সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে হবে, সুতরাং শাহবাগ বেল্টে তো জ্যাম হবেই। এদিকে বিজয় স্মরণি থেকে শাহবাগ পর্যন্ত নাকি রাস্তা সকাল ৮টা থেকে বন্ধ। মিরপুর রোডও বন্ধ। আমাকে যদি ধানমন্ডি যেতে হয় তো এই দুই রাস্তার কোনোটা দিয়েই যেতে হবে। এখন রাস্তার আদৌ কি অবস্থা হয়, সেই চিন্তা করে আর বের হলাম না। দেখা গেলো রাস্তায় গিয়ে এমন জ্যামে পড়লাম যে আলিয়াঁস ফ্রসে পর্যন্তই যেতে পারলাম না, কিংবা গেলাম হয়তো কোনোরকমে কিন্তু ফেরার পথে ক্যাচালে পড়লাম। রিস্ক নিয়ে লাভ কি? একদিন না হয় ক্লাস মিসই গেলো। ক্লাসের পড়া আবার বুঝে নেয়া যাবে, কিন্তু রাস্তায় অসহ্য টাইপের জ্যামে আমি মোটেই বসে থাকতে চাই না।

তবে রাস্তা বন্ধের ভয়ে অনেকেই বোধহয় বাসা থেকে বের হয়নাই আজকে। এমনিতেই শনিবার, স্কুল-কলেজ তো বন্ধই থাকে, অনেক অফিসও বন্ধ থাকে। অনেকেই দেখলাম ফেসবুকে লিখেছে যে রাস্তা একদম খালি, কেউ কেউ নাকি ২০ মিনিটে বসুন্ধরা থেকে ধানমন্ডি পৌঁছে গেছে! আসলে সব জায়গাতেই এরকম অবস্থা ছিলো কি না কে জানে! … নিজে রাস্তায় বের না হলে আসলে এইসব সিচুয়েশনে কিছু বোঝা যায় না! … কিন্তু বের হবার রিস্ক তো নিলাম না!

কালকে আমাদের স্কুলও বন্ধ দিয়ে দিয়েছে। কারণ রাস্তা ঘাট এমনিতে বন্ধ, এদিকে ট্রাফিকের অবস্থাই কি হয়, বাচ্চাকাচ্চাই বা কিভাবে আসবে … কালকেও বের হবো না … স্কুলের অনেকগুলা কাজ জমে গেলো … অনেকটা লস হয়ে যাবে … কিন্তু কিছু করার নাই … আমি এই শনিবার স্কুলে যাবো ভেবে রেখে লেসন প্ল্যানের খাতাও আনিনি, বইগুলোও আনিনি। ফলে না পারছি বাসায় বসে লেসন প্ল্যান করতে, না পারছি ওয়ার্কশিট করে রাখতে। সোমবারে স্কুলে গিয়ে একটু ধরা খাবো আর কি! … যাক গে! যা হয় হবে … সোম আর মঙ্গলবার কোনোমতে চালায় দিতে পারলে বুধ-বৃহস্পতিবারে ওয়ার্কশিটের কাজ করানো যাবে।

এদিকে ফ্রেঞ্চ ক্লাসটা পরপর দুইদিন মিস হয়ে গেলো। সেই সেন্সে একটা বিশাল গ্যাপ পড়ে গেলো বলা যায়। ৮ ঘন্টায় তো অনেককিছু পড়ায়। গতকালকে যাইনি নিশাতের বিয়ের প্রোগ্রামের জন্য। আর আজকে তো রাস্তার কথা চিন্তা করে বের হলাম না। কালকের ক্লাসটা যে মিস হচ্ছে এটা নিয়েই বেশ খুঁতখুতানির মধ্যে ছিলাম। তারমধ্যেই আজকেও মিস করে ফেললাম। নায়ীমীর কাছ থেকে দুইদিনের লেকচারগুলো কপি করে নিয়ে নিজে নিজে কিছু বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

এই সপ্তাহে আবার ভার্সিটি খুলবে। সেখান আবার ২৬ তারিখ পরীক্ষাও আছে। জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সের। আমি অবশ্য এখনো পড়ালেখা কিছুই শুরু করিনাই। দেখি,কালকের দিনের ফাও ছুটিটা জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজের পেছনেই ব্যয় করবো। লোপা ম্যা’ম হোমওয়ার্ক হিসেবে লেসন থ্রি আর ফোর শেষ করে উনাকে ভার্সিটি খোলার পর দেখাতে বলেছিলো। সো, কালকে যদি ওইটা রেডি করে ফেলি তাহলে ২৪ তারিখ ভার্সিটি গিয়ে দেখাতে পারবো।

এর মধ্যে নাকি ফার্স্ট সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছেন। প্রতীতি গত বুধবার ফোন করে জানিয়েছে। ৪ এর মধ্যে ৩.৭৫ নাকি হায়েস্ট গ্রেড, আর আমি, ইফা আর তিথি আপু নাকি ৩.৭৫ পেয়েছি। প্রতীতি পেয়েছে ৩.৬৩। আমার আবার ল্যাঙ্গুয়েজ আর হিস্ট্রি দুইটাতেই A+। মামুন স্যারের তো একটা অ্যাসাইনমেন্ট দেই নাই, ওটায় বোধহয় ১০ নাম্বার ছিলো। ওইটা না দেয়ার কারণে ওখানে B+ এসেছে, মানে ৬৫-৭০ এর মধ্যে নাম্বার। ওইটা দিয়ে দিলে A- বা A চলে আসতো আর তখন আমার গ্রেডও ৩.৮৮ বা ৩.৯২ হয়ে যেতো। যাই হোক, রেজাল্ট নিয়ে দুনিয়ার কথাবার্তা শুনিয়েছে টিচাররা … তারা নিজেরাই দেখলো কার রেজাল্ট কেমন … প্রতীতি আমাকে কি যেন বলার চেষ্টা করছিলো, কোথায় তোমার ৩.০৩, আর কোথায় এবারের রেজাল্ট! আমি কথা বাড়াই নাই … অনার্স ফার্স্ট ইয়ারেও আমিই হায়েস্ট গ্রেড পেয়েছিলাম … সেকন্ড ইয়ারেও তাই … তারপর থার্ড আর ফোর্থ ইয়ারে খালি পরীক্ষার সময় গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে এসেছি। তারপরও ফেইল করি নাই। একদম মার্জিনাল নাম্বার নিয়ে পাশ করেছি তাও না! ৪০ এ পাশ ছিলো, আর অন্তত ৫০/৫৫ তো পেয়েছিই! … নিজের মেধা নিয়ে আমার নিজের তো কোনো সন্দেহ নাই! …

তবুও জানি যে এখন এই রেজাল্ট এবং আমাকে নিয়ে বিবিধ রাজনীতি শুরু হবে। অনার্সের সময় ওইগুলা কাটায় চলতে গিয়েই শেষ দুই বছর লিটেরেলিই পড়ালেখা ছেড়েই দিয়েছি। এখানেও কি হবে কে জানে! … আমি কখনো নিজেকে কোনোকিছুতে পুশ করে চলি না। আমি যেটুকু করতে চাই, যেটুকু করতে ভালো লাগে সেটুকুই করি … পড়ালেখার ক্ষেত্রেও তাই … নিজের ইচ্ছায় যেটুকু পড়ি ওইটুকুই আমার পড়া … নিজের ব্যাপারে খুব হাই লেভেলের এক্সপ্রেক্টেশন নিয়েও চলি না … কিন্তু আশেপাশের প্রেশার যদি আসতে থাকে যে এখন তোমাকে এটা হতে হবে, ওটা করতে হবে … সেটাই আমার জন্য সমস্যা! …

আমি শিওর, আগে তো কথা শুনিয়েছেই যে ডিপার্টমেন্টে কেন সময় দেই না … এখন হয়তো দাবিই করে বসবে যে ডিপার্টমেন্টে আমাকে সময় দিতেই হবে! … বাকি যেই দুইজন ৩.৭৫ পেয়েছে, তার মধ্যে ইফা এখন ফুলটাইম চাকরি করে, ও এখন ক্লাসই ঠিকমতো করতে পারে না। এমনিতে ওর মুখস্তবিদ্যা ব্যাপক। বুঝুক না বুঝুক, আই গেজ ও ল্যাঙ্গুয়েজ শুদ্ধাও মুখস্ত করে ফেলতে পারে, কিন্তু আল্টিমেটলি ৯টা-৬টা চাকরি-বাকরি করে এই রেজাল্ট ও ধরে রাখতে পারবেনা।  তিথি আপু এমনিতে তো জাপানে ছিলোই, আবার ল্যাঙ্গুয়েজ পড়ায়ও, পড়ালেখার বেসিকও ভালো। কিন্তু উনার যেহেতু সংসার-বাচ্চাকাচ্চা আছে সো উনিও চাইলেই সব ছেড়েছুড়ে ডিপার্টমেন্টে এসে বসে থাকতে পারবেনা। উনাকেও বাইরে কোথাও পাঠাতে হলেও অনেক কিছু ভাবতে হবে। সুতরাং গিনিপিগ পাবে এই আমাকেই। স্কুলের চাকরি করি, সুতরাং দুপুরের পর ফ্রি। আবার বিয়ে-শাদিও করি নাই, সিঙ্গেল। সো যতরকমের দাবি সব আমার ওপর দিয়েই যাবে। আবার ‘না’ বললে তখন আচরণ নিয়েও কথা শুনতে হবে! …

তারপর যেটা হবে যে এইসব বিষয়আশয়ে বেশি বিরক্ত হয়ে গেলে আমি পড়ালেখা ছেড়েই দিবো! … অনার্সের মতোই হিস্ট্রি রিপিট করবে আর কি! … অলরেডিই আমার যথেষ্ট রিলাক্টেন্সি চলে আসছে ! …

যাই হোক, আজকে আর লিখবো না … চোখ জ্বলছে ক্রমাগত। ক্ষুধাও লেগেছে। খেয়ে দেয়ে শুয়ে থাকি। কাজও কিছু করতে ইচ্ছা করছে না। নইলে হয়তো একটু পড়ালেখা নিয়েই বসতাম! …

যাই তাইলে আজকে …

বন নুই …  

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s