দিনযাপন । ২১১১২০১৬

সব কাজ বাদ দিয়ে এখন দিনযাপন লিখতে বসছি, কারণ কিছুই করতে ভালো লাগছে না … অথচ কাজ কিন্তু অনেক … মামুন স্যারের অ্যাসাইনমেন্ট, ক্লাস সিক্স আর সেভেনের জন্য রিভিশন ওয়ার্কশিট … সংসদ ভবনের ট্রিপ নিয়ে বাচ্চাদের ফ্রি-রাইটিং অ্যাসাইনমেন্ট-এর কয়েকটা লেখা চেক করা, ক্লাস ফোরের রিভিশন ওয়ার্কশিটগুলো চেক করা … এবং ইত্যাদি ইত্যাদি … কিন্তু আমি কিছুই করছি না …

গত দুইদিন ধরে ঘাড় আর পিঠ একেবারে নব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল করে থাকতে হচ্ছে, কারণ নাড়াতেই পারছি না। সম্ভবত এটা গত দেড় সপ্তাহ যাবৎ সোফায় শোবার ফল। সোফায় তো এক কাতেই ঘুমাতে হয়, ফলে মাসল-এ একবার টান লাগলে যে আবার অন্য পাশ ফিরে শোবো বা হাত-পা একটু নাড়া-চাড়া করবো সেই উপায়ই পাই না। গত সপ্তাহে সোফায় ঘুমিয়েছি একা একা ঘুমাচ্ছিলাম বলে, আর এখন শুচ্ছি কারণ মা আমার বিছানায় ঘুমায়। এতদিন তো মা মাটিতেই ঘুমাতো। কিন্তু সেটা এখন তার নিষেধ। আর শোবার একটা অল্টারনেটিভ জায়গা আমার শোবার জায়গার পাশাপাশি না হওয়া পর্যন্ত তাই মা বিছানায়, আমি সোফায়।

একটা বেতের ডিভান বানাতে দেয়া হয়েছে ড্রয়িং রুমে রাখার জন্য। অনেকদিন আগেই এটা ভাবা হয়েছিল যে ড্রয়িং রুমে একপাশে সোফা সরিয়ে একটা ডিভান রাখলে সেখানে মানুষ বসতেও পারবে, আবার রাতে শুতেও পারবে। কিন্তু আব্বু সেই প্ল্যানে সায় দিতো না। এখন পরিস্থিতিই তাকে রাজি করালো এই কাজের জন্য। আশা করি আগামী সোম/মঙ্গলবার নাগাদ ডিভান চলে আসবে। আরো একটা সপ্তাহ এই কষ্ট করতে হবে আর কি …

প্রচণ্ড কোমর ব্যথাও আছে সাথে … সম্ভবত সারাক্ষণ সোজা হয়ে বসে থাকতে হচ্ছে বলে পুরো চাপটা কোমরেও পড়ছে … আজকে তো ভার্সিটিতে ক্লাস করতেই যাওয়ার সাহস করতে পারলাম না এই অবস্থায় … দিলরুবা ম্যা’মের দুইটা ক্লাস পর পর মিস হয়ে গেলো … গত সপ্তাহে তো কোনো ক্লাসেই যেতে পারি নাই, মা হাসপাতালে ছিলো বলে … আর এই সপ্তাহে অবশ্য গতকালকে ক্লাস হয়নাই রেজা স্যারের। আজকে ম্যামের ক্লাস হয়েছে। কিন্তু শরীরের অবস্থা বিবেচনা করে আর যাওয়ার রিস্ক নেই নাই। ভাবলাম যে এই অবস্থায় ৮টা পর্যন্ত ক্লাস করে তারপর আবার বাসায় ফিরে মামুন স্যারের অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বসার আর বিন্দুমাত্র শক্তি থাকবে না … গতসপ্তাহে মামুন স্যারের ক্লাস নাকি হয়নাই। আমি তো টেনশনে ছিলাম যে স্যারকে তো ফোন করেও কিছু জানাই নাই, আবার অ্যাসাইনমেন্ট-ও শেষ করি নাই … কি জানি কি অবস্থা হবে … তো এই সপ্তাহে শুক্র আর শনিবারে কাজ করলেই আমার অ্যাসাইনমেন্ট শেষ হয়ে যেতো … কিন্তু গত সপ্তাহের যাবতীয় টেনশন, ব্যস্ততা আর কাজের চাপ মিলিয়ে শুক্র আর শনিবার আমি খালি ঘুমিয়েই কাটিয়েছি। সারাদিন ঘুমিয়েছি আর সন্ধ্যায় আলিয়সঁ ফ্রঁসেস-এ গিয়েছি ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাসে। ওই দুইটা দিন আমার লিটেরালিই কোনো কাজ করতেই ইচ্ছা করে নাই … বৃহস্পতিবার তো বাসায় ফিরেছিই প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে … মনে হচ্ছিলো বাসায় আর ঢুকতেই পারবো না … তার আগেই হয়তো মাথা-টাথা ঘুরায় পড়ে যাবো সিএনজি’র মধ্যেই … বাসায় এসেই শুয়ে পড়লাম … প্রচণ্ড শীত লাগছিলো হঠাৎ করে … হাত-পা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেলো … কাথা-টাথা জড়িয়ে ঘণ্টা দেড়েক ঘুমিয়ে তারপর কোনোমতে টলতে টলতে গিয়ে গোসল করলাম রাত নয়টা সময় … তারপর আবার ১০টার মধ্যেই ঘুম …

fb_20160908_23_48_23_saved_picture

শরীর আর চলছে না … মনে হচ্ছে চাকরি করতে গিয়ে দিন দিন যেন ‘চাকর’-ই হয়ে যাচ্ছি … এত প্রেশার, এত স্ট্রেস! … গতবছরও তো এমন ছিলো না! … আর সেই বেসিসেই আমি একসাথে এতগুলা ক্লাস পড়ানোর লোড নিতে রাজি হয়েছিলাম … এখন দেখছি সেটা সুই হয়ে বিঁধে ফোড় হয়ে বের হচ্ছে ক্রমাগত! …

যাই হোক, আজকে এমনিতেও আমার মন মেজাজ একটু খারাপও আছে … স্কুলে একটা বিচ্ছিরি কাহিনী ঘটায় আসছি! … দিনযাপনে কখনো মেনশন করা হয়েছে কি না আমার মনে পড়ছে না … সেটা হলো যে আমার একটা ফোবিয়া আছে … এবং ফোবিয়া মানে সেটা একেবারে ভয়াবহ পর্যায়ের ফোবিয়া … শীতকালটা একদিকে আমার বেশ পছন্দ যে এই সময় একটু স্টাইল-টিস্টাইল করা যায়, একই সাথে এইটা আমার অনেক অপছন্দেরও সিজন কারণ এই সময়টাতেই এই ফোবিয়াটা নিয়ে আমাকে খুব যন্ত্রণায় থাকতে হয়।

কথা হচ্ছে, আমি প্রজাপতি এবং মথ জাতীয় প্রজাতিকে বিশেষ ভয় পাই … মানে কেমন যে একটা ফিলিংস হয় এইগুলা দেখলে আমি সেটা কাউকে বোঝাতে পারি না … প্রজাপতি বা মথ দেখলে ভয় পাওয়া বিষয়টা এতই দুর্লভ যে এইটা যে আসলে কারো ফোবিয়াও হইতে পারে সেইটাই মানুষের কাছে খুব উইয়ার্ড লাগে! … আমার নিজের কাছেও লাগে … বাট ট্রুথ ইজ, আই হ্যাভ দিস ফোবিয়া, নো ম্যাটার হোয়াট … নেট ঘেঁটে একবার বের করেছিলাম যে এই জাতীয় ফোবিয়াকে মোটোফোবিয়া টাইপের একটা কিছু বলে … কিন্তু এ ব্যাপারে খুব ডিটেইল আর কিছু পাইনাই … কি জানি হয় আমার … কোথাও কোনো প্রজাপতি বা মথ ইভেন বসে আছে দেখলেও আমার ভেতরে কেমন জানি অস্বস্তি লাগতে থাকে। আর উড়তে দেখলে তো কথাই নাই … কেমন একটা আতঙ্ক এসে ভর করে আমার ভেতর … কেন এই আতঙ্কের অনুভূতি আমি জানি না … কিন্তু কি জানি কি হয়ে যায় … আমি নিজেই টের পাই আমার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে ভেতরে কেমন একটা পালপিটিশন শুরু হয়ে যায় … খুবই হরিবল একটা ফিলিং … শীতকালে তো আমি পারতপক্ষে বাসা থেকে বেরই হই না সন্ধ্যাবেলা … আর সন্ধ্যার আগেই বাসায় চলে আসতে চেষ্টা করি … একদম মনে হয় যে হাইবারনেশনে চলে যেতে পারতাম পুরো শীতকালটার জন্য … কিংবা শীতকাল আসলেই এমন একটা জায়গায় চলে যেতে পারতাম যদি, যেখানে এই প্রজাপতি বা মথ নাই তাইলে ভালো হইত … মরুভূমি এলাকায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে … অনেক ড্রাই জায়গা তো … গাছপালা নাই …

তো, আজকে যেটা হইলো … এমনিতেই আমাদের স্কুল প্রেমেসিসে এখন প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় যে এখানে সেখানে প্রজাপতি বসে থাকে … তো গতকালকে গিয়ে দেখি টিচার্স রুমের ভেতরেই একটা ঢুকে বসে আছে। তো স্কুলের খালাদের মধ্যে রুনা খালা আবার এইটা বেশ ভালোভাবেই জেনে গেছে এতদিনে যে আমার এই প্রজাতির ব্যাপারে ফোবিয়া আছে … তো উনি কালকে এক ফাঁকে ওই প্রজাপতিকে জায়গা থেকে উড়ায়-টুরায় দিয়ে ধরে জানালা দিয়ে বের করে দিলো … আজকে ক্লাস সিক্সে সকাল বেলা অ্যাসেম্বলি করাতে গিয়ে দেখি যে ওই রুমে একটা প্রজাপতি ঢুকে বসে আছে। কি যন্ত্রণা! মনে মনে ভাবলাম যে ক্লাস নিতে আসবো সেই সেভেন্থ পিরিয়ডে ততক্ষণে এইটার কি অবস্থা হয় আল্লাহ খোদা জানে … উড়ে-টুড়ে যদি দেখি হোয়াইট বোর্ডের ওপরেই এসে বসে আছে তাহলে তো শেষ! … এদিকে থার্ড পিরিয়ডে খবর পেলাম যে প্রজাপতিটা নাকি উড়ছে আর ক্লাসের ২/৩টা স্টুডেন্ট নাকি তাতে ভয় পেয়ে চিৎকার-চেচামেচি করছে … আশার আলো দেখতে পেলাম যে বাচ্চাদের উছিলা দিয়ে এখন প্রজাপতিটাকে বের করার একটা ইনিশিয়েটিভ নেয়া যাবে … যথারীতি রুনা খালাকে বললাম … তো রুনা খালা টিফিন টাইমে গেলো ক্লাসে … এদিকে আমি অরুণদ্যুতি আপু আর আরিফিন স্যারের সাথে ওইসময় কথা বলছি, আর এমন একটা জায়গায় দাঁড়ানো যে পাশেই করিডোর … আরিফিন স্যার আজকে সকাল থেকেই বেশ কয়েকবার প্রজাপতি নিয়ে আমার সাথে মজা করছিলো … ওইসময়ও ইন ফ্যাক্ট প্রজাপতি নিয়েই কি কথা হচ্ছে এর মধ্যে দেখি রুনা খালা ক্লাস সিক্সের সেই প্রজাপতি ধরে সামনে হাত বাড়িয়ে হেঁটে হেঁটে আসছে … আমি খালি দেখলাম যে রুনা খালার হাতে প্রজাপতিটা ধরা, আর বাড়ানো হাতটা নিয়ে উনি হেঁটে হেঁটে আমার ডিরেকশনেই আসছে … কি জানি কি হয়ে গেলো এর মধ্যে … এক চিৎকার দিয়ে সোজা নিজের টিচার্স রুম পার হয়ে জেবিন আপার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় গেলাম … সারা শরীর ভয়ে কাঁপছে … আর কাঁদতে শুরু করলাম … কি অবস্থা! টিচার্স রুমের বাকি সবাই আমাকে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে আসতে দেখা পর্যন্ত মনোযোগ দিলো, কিন্তু আমি যে তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছি আর কাঁদছি, সেইটা বেশ কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলো জেবু আপা … তারপর তো সবাই মিলে প্যাম্পারিং শুরু হলো … জড়ায় ধরে, মাথায় হাত-টাত বুলায় একাকার অবস্থা … কি একটা বিচ্ছিরি টাইপের এম্ব্যারেসিং সিচুয়েশন! …

এর আগে একদিন ভার্সিটিতে এরকম একটা সিচুয়েশনে পড়েছি … একেবারে পালিয়ে আসা টাইপের সিচুয়েশন! … মামুন স্যারেরই ক্লাস ছিলো … গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে … ক্লাসে গিয়ে বসেছি, হঠাৎ দেখি পর পর  দুইটা প্রজাপতি ক্লাসে ঢুকে গেলো উড়তে উড়তে … কি যন্ত্রণা! আমি এক চিৎকার দিয়ে কোনোরকমে ক্লাস থেকে বের হয়ে আসলাম … একটু পরে প্রতীতিও বের হয়ে আসলো আমার অবস্থা দেখার জন্য। আমি ওইদিন আর ক্লাসেই গেলাম না … প্রতীতি ব্যাগ এনে দিলো ক্লাস থেকে, অফিস রুম পর্যন্ত সাথে গেলো … আমি বেশ কিছুক্ষণ অফিসরুমে বসে থেকে তারপর চলে আসলাম বাসায় … এরপরে খালি একদিন দিলরুবা ম্যামের পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম … আর তাও ভালো যে পরীক্ষাটা সেমিনার রুমে হয়েছিলো … নইলে পরীক্ষার মাঝখানে ওরকম একটা কিছু ঘটলে কি করতাম? এরপরে ক্লাস করতে আর যাই-ই নাই … তারপর তো গত সপ্তাহে আর এই সপ্তাহেও যাওয়াই হলো না এখন পর্যন্ত! … আগামীকাল যে কি হবে! … দুই দিন ধরে যা ঘটছে প্রজাপতি নিয়ে!

অনেককিছুই তো লিখে ফেললাম আজকে … আপাতত ইস্তফা দেই … মামুন স্যারের অ্যাসাইনমেন্ট-টা কালকে যে কখন শেষ করবো জানি না … কালকে আমার ৫টা ক্লাস, তার মধ্যে ৪টা ক্লাস টানা … এই ঘাড় আর পিঠের ব্যথা নিয়ে এতগুলা ক্লাস নিতে গেলে কি যে অবস্থা হবে! … ওয়ার্কশিটও তো একটাও রেডি করলাম না! … কালকে সকালে গিয়েই প্রথম ওয়ার্কশিট নিয়ে বসতে হবে … তারপর অন্যসব কাজ … এমনিতেই বৃহস্পতিবার থাকবো না স্কুলে … ডিপার্টমেন্টের একটা প্রোগ্রামের জন্য জাপান অ্যাম্বেসিতে যেতে হবে … সো, সবকাজ আসলে কালকের মধ্যেই গুছায় ফেলতে হবে, আর বুধবারদিন রেডি করে জাবিন আপার হাতে বুঝায় দিয়ে আসতে হবে …

কীভাবে যে কি করবো জানি না … কিছুই ভালো লাগছে না … লিটারেলিই অসহ্য লাগছে … কাজ … পড়ালেখা … সবকিছু …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s