দিনযাপন । ২৬১১২০১৬

কালকে জাপান স্টাডিজ-এর জাপান-বাংলাদেশ রিলেশন কোর্সের পরীক্ষা, আর পরশুদিন দিলরুবা ম্যাডামের স্কাল্পচারাল আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচার কোর্সের। মিডটার্ম পরীক্ষা আর কি। পরীক্ষার প্রিপারেশন নিয়ে তো টেনশন নাই। এখন পড়ালেখার সময়ও আছে, কারণ স্কুলের ব্যস্ততা কম। আবার এই আত্মবিশ্বাসটুকুও আছে যে যেভাবেই যতটুকু পড়ি না কেন, নিজের বেসিক জ্ঞান দিয়ে উৎরায় যাবো। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। যখনই ভাবছি কালকে পরীক্ষা, তখনই মাথায় কাজ করছে যে ক্লাসে বসে যে ঘন্টাখানেক পরীক্ষা দেবো, এর মধ্যে যদি প্রজাপতি ঢুকে যায় তখন কি করবো? আর পরীক্ষা তো সেই সাড়ে ৬টা সময়। ওই সময় তো চারিদিক অন্ধকার আর খালি ক্লাসরুমগুলাতেই আলো জ্বলে। এইসময়টাতেই তো প্রজাপতি এবং মথ প্রজাতির উড়াউড়ির পিক টাইম। আর এইবার তো মনে হয় ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতির বাম্পার প্রডাকশন হয়েছে! বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এত পরিমাণ প্রজাপতি এই সময়েও চোখে পড়েছে বলে খেয়াল হয় না … এইবার মনে হচ্ছে বেশি বেশি! আর ইউনিভার্সিটি এলাকায় যেই অবস্থা হয়ে থাকে বিকাল ৫টার পর থেকে। মনে হয় যেন ওইখানেই প্রজাপতির আখড়া!

কীভাবে কি করবো জানি না … গত কয়েকদিন যাবৎ-ই এই প্রজাপতি সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় আমি এমনই ট্রমাটাইজড যে যখনই মনে হচ্ছে যে কালকে সন্ধ্যাবেলার ওই বিপদজনক সময়ে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে, সাথে সাথে আমার ভেতরে কেমন জানি প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে। এটাও ভাবছি যে পড়ালেখা সব করে পরীক্ষার প্রিপারেশন নিয়ে ভার্সিটি গিয়ে রেজা স্যার আর দিলরুবা ম্যাডাম দুইজনকেই নিজের প্রজাপতি ফোবিয়ার স্বীকারোক্তি দিয়ে অনুরোধ করবো যে আমাকে যেন সেমিনার রুমে বসে পরীক্ষা দেয়ার পারমিশন দেয়া হয়। আমি যে চিট করবো না এইটুকু আমি নিজের ব্যাপারে নিজেই কনফিডেন্ট, উনাদেরও আশা করি সেই বিশ্বাস আছে। কিন্তু সেটা কি আদৌ আমিই উনাদেরকে মুখ ফুটে বলতে পারবো যে ‘আমার অমুক সমস্যা, তাই আমি সেমিনার রুমে বসে পরীক্ষা দেবো’ … কিংবা উনারাও কি আদৌ ব্যাপারটা খুব আমলে নেবেন? … এই প্যানিক অ্যাটাকের কারণে আমার লিটেরেলি পড়ালেখাতেই মনোযোগ বসছে না। আমার খালি চোখে ভাসছে যে আমি ক্লাসে গিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছি, আর এর মধ্যে বিশাল বিশাল কালো-বাদামি ভয়াবহ দেখতে প্রজাপতির দল ক্লাসে ঢুকছে, আর আমি পরীক্ষা-টরীক্ষা বাদ দিয়ে কই পালাবো কি করবো সেই নিয়ে আতঙ্কে আছি …

fb_20160825_01_46_17_saved_picture

একটু আগে মা-কেও বলছিলাম যে পরীক্ষার জন্য তো পড়ালেখা করছি ঠিকই , কিন্তু পরীক্ষা যে আদৌ কীভাবে দিবো তা জানি না! … মা প্রথমে বুঝেনাই। পরে যখন বললাম যে প্রজাপতি (!) তখন ‘ও আচ্ছা’ বলে চলে গেলো। মা জানে এইটার কোনো সলিউশন তার কাছে নাই। বাসার ভেতরে যাতে প্রজাপতি না ঢুকতে পারে তার জন্য সকলরকমের প্রটেকশন সে নিশ্চিত করে প্রতিদিন, কিন্তু ভার্সিটিতে কীভাবে ক্লাস্রুমে প্রজাপতি আসবে না সেইটা সে কি করবে?  সো, কালকে যদি মা দেখে যে আমি স্কুল শেষ করে ভার্সিটি না গিয়ে সোজা বাসায় চলে আসছি, তাতে সে মোটেই অবাক হবে না! … আর আমি জানি না, আমি এখনো পর্যন্ত এক বিন্দুও সাহস সঞ্চয় করতে পারি নাই যে অন্তত আমি ভার্সিটি যাই, রেজা স্যারকে আমতা আমতা করে হলেও ব্যাপারটা বলি, তারপর দেখি কি হয়। সকাল থেকেও যদি সেই সাহস সঞ্চয় না হয়, তাইলে আসলে পরাজিত মন নিয়ে বাসাতেই চলে আসতে হবে …

এখন মনে হচ্ছে খালি যে কেন আসলে এই সন্ধ্যাবেলা ক্লাস করার প্যানা আছে এমন একটা মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হলাম! আর এটাও ভাবছি যে এই সেমিস্টারটা এরকম ভয়ে আতঙ্কে না থেকে ড্রপই দেবো নাকি! আবার গরমকালে আরাম করে নির্ভয়ে পরের সেমিস্টারটা করলাম, আবার তারপর শীতকালে ঘরবন্দী … আমার আসলে এই প্রতিদিন প্রচন্ড আতঙ্ক নিয়ে ভার্সিটি গিয়ে ক্লাসে ঢুকতে হবে এই ব্যাপারটা ভালোই লাগছে না … গত দুই সপ্তাহ তাও মা’র অসুস্থতার কারণে ভার্সিটি যাওয়া হয়নাই, তাও একদিক দিয়ে শান্তি ছিলো যে এই প্যানিকটা এনকাউন্টার করতে হয়নাই। কিন্তু এই সপ্তাহে কি হবে?

জানি না! … কিছুতেই কিছু মাথায় ঢুকছে না … ভয়ে, আতঙ্কে জবুথবু হয়ে আছি … আর মেজাজও কেমন তিরীক্ষি হয়ে আছে আগামী দুইদিনের কথা ভাবতে গিয়ে!

তো, যাই হোক, আজকে বাসায় আমাদের বেতের ডিভান আসছে। এখন মনে হচ্ছে যে ৬ফিট ৪ফিট না দিয়ে ৬ ফিট ৩ ফিট মাপ দিলেই হতো। এইটা এখন একটা প্রায় সেমি-ডাবল খাটই হয়ে গেছে প্রায় … এই মাপ-জোক বিষয়টা আমি সবসময়ই কেমন জানি একটা গড়বড় করে ফেলি। এর আগেও আলমারি বানাতে গিয়ে দেড় ফিটের জায়গায় ৩ ফিট চওড়া বলে এসে এক বিশাল কাপড়ের আলমারির অর্ডার দিয়ে দিয়েছিলাম। আবার আমার খাটের ম্যাট্রেসের হিসাবেও গন্ডগোল করে খাটের চেয়ে ছোট প্রস্থের ম্যাট্রেস বানাতে দিয়ে দুই দিন পর যখন খেয়াল হয়েছে তখন অলরেডি ম্যাট্রেস বানানো হয়েই গেছে। এইসব মাপজোক হিসাব নিকাশ আমার করতে যাওয়াই ঠিক না!

তাও মন্দের ভালো এই যে অবশেষে ঘরে তো আরেকটা শোয়ার জায়গা হলো। গেস্ট আসলে এখন অন্তত এখানে শুতে দেয়া যাবে। মাটিতে বিছানা পেতে আর কাউকে ঘুমাতে হবে না। এমনকি সোফাতেও না। বিকালবেলা ম্যাট্রেসের দোকান থেকে লোক এসে মাপ নিয়ে গেছে। বুধবারের দিকে দেবে। বুধবার পর্যন্তই এই কষ্ট আর কি।

আজকে বহুদিন পর এমন একটা দিন কাটাচ্ছি যেদিন নাকি স্কুলের কাজ নিয়ে মাথায় কোনো চাপ নাই, কোনো চিন্তাও নাই! আজকে থেকে পরীক্ষা শুরু হয়েছে, তাও বানান, শ্রুতলিপি, আর্ট এইসব পরীক্ষা। ২৯ তারিখ থেকে মূল পরীক্ষা শুরু। তখন থেকে আমার খাতা আসতে থাকবে। আর তখন ৫ সেট খাতা দেখা, নাম্বার হিসাব করা এইসব কাজ ছাড়া আর তেমন কোনো চিন্তা মাথায় থাকবে না আর কি। মাদলেন আপা মাঝখানে সেকন্ড টার্মের রুটিন চেয়েছিলেন সবার কাছ থেকে, ২৮ তারিখেই মিটিং-এ বসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা আবার এক বিশাল কাহিনী-টাহিনীর মধ্যে দিয়ে আপাতত একটা ভাসমান অবস্থায় আছে। সেকন্ড টার্মের সিলেবাসের জন্য মাথা খাটানোর কাজটা অন্তত ডিসেম্বরের ১০/১৫ তারিখের আগে করা সম্ভব না। আর কারো কথা জানি না, আমি পারবো না। এক মাথায় আমি একসাথে অনেককিছুর সমান কোডিং করতে পারি না। ১০ তারিখ পর্যন্ত মাথায় খাতা আর নাম্বার থাকবে, এরপর গিয়ে সেকন্ড টার্মের চিন্তা!

ধুর, আজকে আর লিখবো না। কালকের পরীক্ষার হলে কীভাবে যাবো সেই চিন্তা করার সাথে সাথেই আর কিছু ভালো লাগছে না …

বাই দ্য ওয়ে, প্রজাপতির প্রতি এই অযাচিত ভীতিকে বলে ‘লেপিডোপটারোফোবিয়া’ (Lepidopterophobia)। ইন্টারনেটে কয়েকদিন ধরে ব্যাপক পড়ালেখা করছি এই বিষয়টা নিয়ে, কিন্তু তাতে করে কিন্তু ভয় কমছে না, বরং আরো থিতু হচ্ছে যেন! আর যখনই মনে হচ্ছে যে এই বছর যেন অন্য বছরের চেয়ে একটু বেশিই প্রজাপতি দেখা যাচ্ছে, ভয়টা আরো গাঢ় হচ্ছে!

মনে হচ্ছে সব ছেড়েছুড়ে ঘরেই বসে থাকি, তাই-ই ভালো! … বের হলেই তো ভয়ে জবুথবু হয়ে চলাফেরা করা আর আশেপাশের মানুষের যন্ত্রণা বাড়ানো, নয়তো এইরকম ফোবিয়ার কারণে অনেকের হাসির পাত্র হওয়া ! কি দরকার!

উইথড্রআল সিন্ড্রোম মাথাচাড়া দিচ্ছে! হুহ! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s