দিনযাপন । ২৮১১২০১৬

আজকে আগাগোড়াই একটা বাজে দিন গেলো …

ইন ফ্যাক্ট, গত রাত থেকেই বাজে দিনের সূচনা ধরা যায়। বেশ তাড়াতাড়িই ঘুমাতে গিয়েছিলাম কালকে, ভাবলাম যে আজকে যেহেতু সকালে উঠবার তাড়া নেই, সুতরাং একটু আরামে বেশি সময় ধরে ঘুমানো যাবে। কিন্তু নতুন ডিভানের ম্যাট্রেসের ওপরে তোশক নাই বলেই বোধহয় প্রচন্ড অস্বস্তি লাগতে থাকলো কিছুক্ষণ পর। শক্ত একটা ম্যাট্রেসের ওপর শুয়ে আছি, তারওপর ম্যাট্রেসের পলিথিনটাও খোলা হয় নাই, ফলে একটু পাশ ফিরতে গেলেও পচ্‌ পচ্‌ করে শব্দ হতে থাকে। এদিকে ঘুমানোর আগে শুয়ে শুয়ে ডিভান নিয়েই গবেষণা করতে গিয়ে চাইনিজ ফেং শুই নিয়ে পড়ছিলাম। ঘরের কোনদিকে শোবার পজিশন হলে ভালো, খাটের আশেপাশে কি থাকা উচিৎ না উচিৎ এইসব … মাথা থেকে সেগুলা আর বের হয় নাই বোধহয়। ক্রমাগত মনে হতে লাগলো যে ডিভানের প্লেসমেন্টে নিশ্চয়ই সমস্যা আছে, সেজন্যই ব্যাড এনার্জির প্রভাবে এমন হচ্ছে …

অতঃপর, অগত্যা ডিভান ছেড়ে সোফায় গিয়ে শুলাম … আশেপাশে কালকে কি কি জানি খূট-খাত শব্দ হয়েই যাচ্ছিলো ক্রমাগত … আমার খালি মনে হচ্ছিলো জানালা খুলে না চোর আসে! …কুকুরগুলাও বাইরে ক্রমাগত ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছিলো…এদিকে দেখি মা-ও ঘুমের মধ্যে কেমন অস্বস্তি করছে … তারও মনে হয় ঘুম আসছিলো না … এইসব দেখতে দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে গেলাম …

ঘুমের মধ্যে এক অদ্ভুত দুঃস্বপ্ন দেখে আবার জেগে উঠলাম কতক্ষণ পর …

দেখলাম যে অমিতের সাথে দেখা করতে ওর হলে গেছি … কেমন জানি একটা স্যুরিয়েল অ্যাটমোস্ফিয়ার … গভীর রাত … আমি অমিতের হলের রুমের দিকে যেতে যেতে পাশের আরেক হলে দেখলাম সমানে ইলেকট্রিক স্পার্ক হয়ে যাচ্ছে … একদম পজিটিভ নেগেটিভ আয়ন চার্জ হলে যেরকম স্পার্ক তৈরি হয়, সেরকম … অদ্ভুত সুন্দর এক দৃশ্য … বিল্ডিং-এর দেয়ালে গাছের ছায়া, আর ভেতরে বারান্দার করিডোর জুড়ে কয়েক মিটার লম্বা ইলেকট্রিক স্পার্ক … এই দেখতে দেখতে অমিতের রুম পর্যন্ত পৌঁছায় যখন ওকে সেই দৃশ্যের কথা বললাম, ও বললো ‘আরও সামনে পর্যন্ত হেঁটে আয়, আরো অনেক কিছু দেখতে পাবি’ … তো আমিও বের হয়ে হাঁটতে থাকলাম … দেখলাম যে তেমন কিছুই তো নাই দেখার মতো … খালি তো স্টুডেন্টস আর তাদের রুম … এর মধ্যে একজনের সাথে দেখা হলো … ফেসবুকে চারু পিন্টু নামে এক আর্টিস্টের সাথে আমার প্রোফাইল অ্যাড করা আছে, দেখলাম যে চেহারায় ব্যক্তিটা সে, কিন্তু তার ঘাড় দুটো মাথা আর শরীরের তুলনায় বেশ পেশীবহুল। তো আমি স্বপ্নের মধ্যেই ভাবছিলাম যে ওই লোকের তো আর খালি গা অবস্থা কখনো দেখি নাই, সো কে জানে, এরকম হইতেও পারে … তো এখানে আবার তাকে দেখছিলাম বুয়েটের ছাত্র হিসেবেই … সে আমার সাথে গল্প করতে করতে আমাকে অমিতের রুমের দিকে এগিয়ে দিতে গেলো … এর মধ্যে আরো ৫/৬ জনের একটা দলের সাথে দেখা হয়ে গেলো … একজনকে দেখলাম যে চেহারায় সে ধানমন্ডি ৪ নাম্বারে যেই দোকানে ফটোকপি করাই, সেই দোকানের মালিক তানভির-এর মতো দেখতে … কিন্তু স্বপ্নে তাকে আমি চিনি না … সে আবার আমাকে চেনে … কোন এক আসেফ-এর সাথে বাইকে করে আমাকে যেতে দেখেছে … আমি আবার চিন্তা করলাম স্বপ্ন দেখতে দেখতেই যে আসেফ বলতে কার কথা বোঝাচ্ছে? … তারপর মনে হলো যে নর্থ সাউথে পড়ে আসেফ নামের একটা ছেলের সাথে মাঝে মধ্যে আমার ফেসবুকে কথা-বার্তা হয়, সে বাইকও চালায়, কিন্তু তার সাথে তো কখনো বাইকে চড়ে আমি কোথাও যাই নাই … এইসব ভাবতে ভাবতে অমিতের রুম পর্যন্ত পৌঁছায় গেলাম … অমিতকে বললাম যে ‘কিছুই তো দেখলাম না। তুই কি দেখার কথা বলছিলি?’ … অমিত কাজ করতে করতেই খুব ক্যাজুয়ালি বললো যে ‘সাত ভূত’! … আমি এবার একটু কেঁপে উঠলাম … গুনে গুনে সাতজনের সাথেই তো আমার দেখা হয়েছে করিডোরে! … অমিতকে সেটা বলার সাথে সাথে ও কেমন ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো … জোরে হাতের মুঠি ধরে বলে উঠলো, ‘অ্যাই! চুপ! কোনো কথা বলিস না!’ … আমার মনে হইলো সাত ভূতের ব্যাপারটা হয়তো ও ফান করে বলেছিলো, কিন্তু সেটা সত্যি সত্যি মিলে গেছে দেখে ও ভয় পেয়ে গেছে। আমি বললাম, চল তাইলে, ঘুমাইতে যাই, এখানে আর না থাকি … ও ‘হ্যাঁ, চল’ বলে আমাকে হাত ধরে টেনে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো … এদিকে শোবার ঘর খুঁজতে গিয়ে দেখি হঠাৎ সবকিছু প্রচন্ড অন্ধকার হয়ে গেলো আর অন্ধকারের মধ্যে কিছুতেই ঘর খুঁজে পাচ্ছি না আমরা … দুইবার দুইটা দরজা খুলে দেখা গেলো আমাদের সেন্ট্রাল রোডের আগের বাসার পুরানো স্যাঁতস্যাঁতা বাথরুম … এর মধ্যেই কোথা থেকে একটা লোমছাড়া, বড় বড় চোখওয়ালা ভয়ানক কুৎসিত দেখতে একটা কুকুর পায়ে পায়ে ঘুরতে লাগলো … অন্ধকারের মধ্যে একবার কুকুরের গায়ে পা লেগেছে কি লাগে নাই, ডান পায়ের পাঁচ আঙ্গুলেই একটা কামড় খাবার মতো অনুভূতি হলো … সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে গেলো ঠিকই, কিন্তু পায়ে কামড় খাওয়ার সেনসেশনটা যেন সত্যি সত্যি অনুভব করছিলাম … মনে হলো যেন আসলেই কিছু কামড়াচ্ছে, কিন্তু দেখলাম যে আসলে তেমন কিছু না …

কেমন জানি একটা অস্বস্তির অনুভূতি নিয়ে অনেকক্ষণ চোখ মেলে তাকিয়ে রইলাম … মনে হলো যে ঘুমিয়ে গেলেই আবার হয়তো দুঃস্বপ্ন দেখবো …

পরে কখন জানি ঘুমিয়েও গেছি … আর ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠলাম প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে …

15036410_935521603250343_6385725869841181896_n

এদিকে স্কুলে গিয়েও আজকে সকাল থেকে কেমন মেজাজ খারাপ করেই থাকলাম … ইদানীং টিচার্স রুমে এত জোরে জোরে গল্প-গুজব , হাহাহিহি হয়, বিরক্ত লাগে … লাউড সাউন্ড কেন জানি নিতেই পারি না এখন আর … রাস্তায় গাড়ির হর্ন শুনলে পর্যন্ত মনে হয় মাথার ভেতর রগ-টগ সব ছিঁড়েই যাবে! …

তো, এর মধ্যে আরেক কাহিনি করলাম আজকে …

আমাদের এক কলিগ আরিফিন স্যারের একটা কেক-এর বিজনেস আছে, কেকোলজি নাম … নতুন হিসেবে বেশ ভালো … কেক-এর টেস্ট এবং অ্যাস্থেটিক কোয়ালিটি প্রায় দশে দশ … তো প্রায় সমবয়সী হবার সুবাদে স্যারের সাথে কথা-বার্তা, গল্প-গুজবে বেশ বন্ধুসুলভতা আছে আমার … একদিন কথায় কথায় আমি কাপকেক-এর প্রসঙ্গ তুলেছিলাম … কেক-এর সাথে সাথে তো কাপকেক-ও হতে পারে টাইপের আলোচনা … এর মধ্যে একটা পার্টি পার্টি মুডে গতকালকে উপরের ফ্লোরের টিচাররা মিলে প্ল্যান করলো যে খিচুড়ি আর গরুর মাংস খাবে, সাথে আবার সেই কাপকেক প্রসঙ্গ তুলে ফেললাম কথায় কথায় … তো সেটাও আবার এই কথা, ওই কথায় একরকম প্ল্যানও হয়ে গেলো যে কাপকেক নিয়ে আসবে আরিফিন স্যার … এক্সপেরিমেন্ট-টা স্কুল থেকেই শুরু হোক টাইপ ব্যাপার- স্যাপার … তো আমার মধ্যে কাপকেক নিয়ে একটা বেশ উৎসাহ কাজ করছিলো মনে মনে … কাপকেক প্রসঙ্গটা আমিই প্রথম তুলেছিলাম কয়েকদিন আগে, আবার গতকাল্কেও ইনফরমালিই বলছিলাম, সেটা আবার সবাই মিলে কথায় কথায় ফিক্সড প্ল্যানও হয়ে গেলো … কিন্তু সকাল থেকেই মেজাজ গরম থাকার সুবাদে আজকের খিচুরি পার্টি আর কাপকেক এর উৎসাহ সব জিরো লেভেলে চলে গেলো …

এদিকে স্যার ঠিকই কাপকেক নিয়ে আসলো … সবার চিল্লাপাল্লায় অস্থির হয়ে আমি তখন পাশের টিচার্স রুমে গিয়ে বসে কাজ করছি , আর সামনে অরুণদ্যুতি আপু বসে বসে বই পড়ছে … যেই টিচার্স রুমে বসে ছিলাম, ওইখানে আরিফিন স্যারও বসে … প্রতিদিন প্রথম তো নিজের সিটেই আসে, তারপর ব্যাগ-ট্যাগ রেখে অন্য কাজ … আজকে কাপকেকের বক্স নিয়ে স্যার সোজা পাশের টিচার্স রুম দিয়েই ঢুকলো, আর আমি পাশের রুমে জানালা দিয়ে দেখলাম যে বক্সটা নিয়ে ঢোকার সাথে সাথে সবাই ‘দেখি দেখি’ করে প্রায় ঝাঁপায় পড়লো বক্সটার ওপর … আমার কেন জানি খুব মন খারাপ হয়ে গেলো … কাপকেক নিয়ে মনে মনে আমার কি পরিমাণ উৎসাহ ছিলো, এই ‘দেখি দেখি’ টাইপ উচ্ছ্বাসটা তো আমার বেশি থাকার কথা … আমি উঠে গেলাম না … বসেই রইলাম … স্যার যখন রুমে আসলো তখন খুব হাল্কাভাবেই বললাম যে ‘কাপকেকগুলা নিয়ে ওই জঙ্গলের মধ্যেই আগে গেলেন! এদিকে আনলে তো প্রথমে আমরাই দেখতে পারতাম’ … আমার মনে মনে কেন জানি হাল্কা একটা এক্সপেকটেশন কাজ করছিলো যে স্যার ফ্রিজ থেকে কাপকেকের বক্সটা বের করে এনে আমাকে একবার দেখিয়ে নিয়ে যাবে … সেরকম কিছু হইলো না দেখে মন আরো খারাপ হয়ে গেলো … যাহ্‌ শালা! পাত্তাই পেলাম না! খাবোই না কাপকেক! … এবং তারপর শুধু কাপকেক না, খিচুড়িও খেলাম না … জিনাত আপা খিচুড়ি-মাংস সব বাসা থেকে রাঁধিয়ে একেবারে হাড়ি শুদ্ধই নিয়ে আসছে …বিশাল অবস্থা!… ট্রে সেটিং -এর কাজ শেষ করে সবাই আয়োজন করে খেতে বসেছে, তখন আমি একটু অভিমান দেখায়ই বললাম যে কাপকেকের কথাটা আমিই সবচেয়ে আগে বলসিলাম, আর আমিই যখন দেখতে পেলাম না, তখন খাবোও না … সবাই দেখলাম মহা খোঁচাখুঁচি শুরু করে দিলো … এই খোঁচাখুঁচিও আমার সময় বিশেষে ভালো লাগে না … এত আহ্লাদ দেখানোর কি আছে আমার সাথে? … এইসব আহ্লাদ দেখালে আমি আরো ইমোশনাল হয়ে যাই … নিজের ইমোশন ঢাকার জন্য তখন একটু রাফলিই বললাম যে এত ন্যাগিং করবেন না আমাকে প্লিজ, আমার পছন্দ না … যাতে ওই মোমেন্টে সবার সামনে কেঁদে না ফেলি সেজন্য দাঁত-মুখ চেপে বসে বসে হুদাই কতক্ষণ ফাইলপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম … উঠে যাওয়াও তো যায় না! তখন আবার এইটার বিভিন্নরকমের ইন্টারপ্রেটেশন হতো! … আর এমনিতেই তো এমন অনেক টিচার আছেই যাদের আবার তিলকে তাল করার বিশেষ ক্ষমতা আছে!

যাই হোক, কাজটা বেশি ভালো হয় নাই, জানি … কিন্তু কিছুতেই নিজের মেজাজ ঠিক রাখতে পারছি না গত দুই/তিন দিন যাবৎ … আজকেও তো পরীক্ষা দিতে যাই নাই … এই যে পরীক্ষা দিতে গেলাম না, এই রিয়্যালিটিটাকে এক্সেপ্ট করতে পারছিনা, আবার পরীক্ষা দিতে গেলে যে প্রজাপতি নিয়ে একটা প্যানিকিং সিচুয়েশনে পড়তাম, সেই জায়গা থেকে যে রিলিভড হলাম, সেটাও ইগ্নোর করতে পারছি না … দুনিয়াতে এত কিছু থাকতে এই আজিব টাইপের ফোবিয়া আমারই কেন থাকা লাগবে এইটা ভাবতে গিয়েও আমি প্রচণ্ড হতাশ হয়ে আছি …

নিজেকেই নিজে ইদানীং এক্সেপ্ট করতে পারি না … যাই করছি, যাই ভাবছি কেন করছি আর কেন ভাবছি নিজেই যাচাই করতে পারি না …

আর কয়েকদিন এভাবে গেলে হয়তো আস্তে আস্তে সুইসাইডাল হয়ে যাবো … জীবনে এতকিছু করছি, এটাও বাকি থাকবে কেন? …

আর ভালো লাগছে না আজকে লিখতে …

চরম বিরক্ত … নিজের ওপরেই … সবকিছুর ওপরে …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s