দিনযাপন । ২৬১২২০১৬

কেমন জানি একটা অদ্ভুত ওয়েদার! একটু আগে রীতিমতো ঘামছিলাম! মনে হলো ফ্যান ছেড়ে বসে থাকি … কোথায় একটা শৈত্যপ্রবাহ হবে, লেপ-কাথা মুড়ি দিয়ে বাসায় বসে থাকবো, নয়তো প্যাকেট হয়ে বাসা থেকে বের হবো, তা তো হচ্ছেই না, বরং ঘরে গরম কাপড় ছাড়াই ঘুরছি, আর বাইরে গেলে বড়জোড় পাতলা চাদর! …

গত দুইদিনে টুকটাক করে অনেককিছুই লেখা যেতো, কিন্তু ল্যাপটপের আপডেট সংক্রান্ত যন্ত্রণার পাল্লায় পড়ে আর লেখার সুযোগ হয়নি … এই অটো আপডেট বন্ধ করে কীভাবে সেটাও জানতাম না … পরে গতকালকে রাহাতের কাছ থেকে জেনে নিয়ে এই জিনিস বন্ধ করেছি … এক আপডেট শুরু হলে পুরাই যন্ত্রণার মধ্যে পড়তে হয় … কম করে হলেও দুই ঘণ্টা নেয় আপডেটে … তারপর আর কাজের কাজ কিছুই করা হয় না …

যাই হোক, অবশেষে স্কুল ছুটি হলো … ২৪ তারিখ লাস্ট ওয়ার্কিং ডে ছিলো … স্কুলের পরে আমরা আবার সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করতে গেলাম … ধানমন্ডি ২৭ নাম্বারে আল-আমার বলে একটা লেবানিজ রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানে … মূল প্রোগ্রাম ছিলো আসলে আবিদ স্যার আর রুবাইয়া দুইজন টিচার চলে যাচ্ছে, তাদেরকে আনঅফিশিয়ালি কয়েকজন মিলে ফেয়ারওয়েল দেয়া … স্কুল থেকে অফিশিয়াল প্রোগ্রাম করতে গেলেই তো আবার এইটা না সেইটা, অমুক না তমুক শুরু হয়ে যেতো … ফলে ওপেন কল দেয়া হয়েছিলো, যে ইচ্ছা পারটিসিপেট করবে টাইপ … যারা যারা অ্যাটেন্ড করেছে তাদের মধ্যেই টাকা তুলে দুইজনের জন্য গিফট কেনা আর খাওয়া-দাওয়া … তো বেশ মজাই হলো সেদিন … আল-আমার থেকে আমরা কয়েকজন আবার কফি ওয়ার্ল্ডে গেলাম … সেখানে বেশ কিছুক্ষণ একটা ভালো আড্ডা হলো … এর আগে একদিন গিয়েছিলাম, কাশফিয়া আপু, অরুণদ্যুতি আপু আর আমি, সেদিন অরুণদ্যুতি আপু একটা ফ্র্যাপে নিয়েছিলো, ব্লুবেরি চিজ ফ্র্যাপে … সেটা দুই চুমুক খেয়েই আমার আর কাশফিয়া আপুর ক্রেভিং ছিলো যে আমরা আবার আসবো এই ফ্র্যাপেটা খাওয়ার জন্য … তো আল-আমার এর পাশেই যেহেতু কফি ওয়ার্ল্ড, সো ওইদিনই প্ল্যানটা হয়ে গেলো আর কি …

গতকালকেও বেশ মজা হয়েছে … এবার আমার খুব ঝোঁক উঠলো যে ফার্মগেট চার্চে যাবো ক্রিসমাস ডে-তে … কাশফিয়া আপুর বাসা ফার্মগেটেই, আর উনিও হলিক্রসের স্টুডেন্ট, সো উনিও রাজি হয়ে গেলেন … অরুণদ্যুতি আপুও যেতে চাইলো … তো ২৪ তারিখেই কফি ওয়ার্ল্ডে বসে মুখে মুখে একটা প্ল্যান হয়ে গেলো যে ২৫ তারিখ ৪টার দিকে যাবো আমরা … তো কালকে অরুণদ্যুতি আপু জানালো যে তার জ্বর আর শ্বাসকষ্ট … আমি আর কাশফিয়া আপু প্ল্যান ফিক্স করে গেলাম … এদিকে চার্চে গিয়ে আরেক কাহিনী … আমি পৌঁছে গেছি আগেই … ৪টার দিকে … তো আমার ফোনে টাকা শেষ, ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সও নেয়ার উপায় নাই, ফলে কাশফিয়া আপু ফোন না দিলে জানাতেও তো পারছি না যে আমি পৌঁছেছি … তো আমি একাই কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে চার্চের ভেতরের সেমিটারিটার পাশে গিয়ে বসলাম … অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম সেখানে … এর মধ্যে কাশফিয়া আপুর সাথে কথা হলো … বললো যে দশ মিনিট লাগবে আসতে … আমি সেমিটারির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বেশ আনমনা হয়ে গেলাম … মৃত আত্মাদের কথা ভাবছিলাম … ভাবতে ভাবতে নিজের কথাও মনে হচ্ছিলো … কীভাবে আমি একটা জীবন শুরু হবার আগেই সেটাকে নিজের হাতেই শেষ করে দিলাম … এর মধ্যে আবার দেখছিলাম কিছু লোকজন চার্চে ঘুরতে এসে ওই সেমিটারির কবরগুলোর ওপরেই দাঁড়িয়ে পেছনে যিশু খ্রিস্টের মূর্তিকে রেখে সেলফি তুলছে … কবরের ওপর দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার মাহাত্ম্যটা কি আমি বুঝলাম না … এক সময় কাশফিয়া আপু ফোন করলো … উনাকে নাকি ঢুকতে দিচ্ছে না … বললো গেটের সামনে যেতে … ওখানে গিয়ে দেখি অবস্থা বেশ খারাপ … যারা ক্রিশ্চিয়ান তাদেরকেই কেবল ঢুকতে দিচ্ছে … সরাসরি জিজ্ঞেস করছে ‘আপনি কি ক্রিশ্চিয়ান ?’ … আমি যখন ঢুকেছি তখন তো কোনো সমস্যাই হয়নাই … হঠাৎ কি হলো কে জানে! … তো কাশফিয়া আপু যখন ঢুকতে পারবে না তখন আমিই বা থেকে কি করবো? আমিও বের হয়ে আসলাম …

হঠাৎ মাথায় ঢুকলো চার্চে না যেতে পারলাম, সিস্টারদের কোয়ার্টার তো পাশেই, সেখানে যাই! … আমি ২০০৭ সালে একবার গিয়েছিলাম ক্রিসমাসের দিন … তো এবার একটু অনিশ্চিত ছিলাম যে সিস্টাররা সবাই আছেন কি না, বা আদৌ এবার ঢুকতে দেবে কি না … গেটে নক করলাম, এক মাসি খুলে দিলো, বললো যাওয়া যাবে … ওখানে বেশ সুন্দর একটা সময় কাটলো … সিস্টার পুষ্প, সিস্টার শিখা, সিস্টার রাণী, সিস্টার পলিন … কতদিন পর একেকজনের সাথে দেখা … সিস্টার পুষ্পকে আমি পাইনি, কিন্তু কাশফিয়া আপু যখন স্টুডেন্ট ছিলেন তখন উনি ছিলেন … ২০০৭ এ যখন গিয়েছিলাম সেবার সিস্টার রাণী, সিস্টার শিখা কারো সাথেই দেখা হয়নি …এত বছর পরে গেছি, তারপরও দেখি একেবারে নাম শুদ্ধা মনে রেখেছেন উনারা! সিস্টার শিখা দেখেই যখন বললেন ‘প্রজ্ঞা না? তুমি জ্যোতিতে কাজ করেছিলে’ … ওই অনুভূতিটা যে কি ভালো লাগার সেটা বলে বা লিখে বোঝানো যায় না … সিস্টার রাণী, সিস্টার পলিন কেউই ভোলেননি … এর মধ্যে বুলবুল মিস আর শারমিন মিস এলেন … আমরা ভর্তি হবার আগেই বুলবুল মিস রিটায়ার করে গিয়েছিলেন, কিন্তু গার্লস গাইডের সূত্রে উনাকে দেখেছি অনেকবার … আবার শারমিন মিস যেহেতু মর্নিং শিফটে ছিলেন, তাই উনাকে সরাসরি কখনো পাইনি … ইন ফ্যাক্ট আমি প্রথমে চেহারায় রিকল করতে পারলেও নাম মনে করতে পারছিলাম না উনার …

তো যাই হোক, ওখানে বেশ অনেকটা সময় কেটে গেলো … এর মধ্যে একদল সিস্টার এলেন, কীর্তন করেন উনারা ঘুরে ঘুরে … উনাদের সাথে সিস্টার পুষ্প, সিস্টার পলিন উনারাও নাচলেন তাল মিলিয়ে … আমিও কতক্ষণ সার্কেলে ঘুরে ঘুরে নাচলাম … সিস্টার পলিন আবার খুব প্রশংসা করলেন যে প্রজ্ঞা তো খুব ভালো তাল বোঝো … মনে মনে ভাবলাম যে থিয়েটারের কল্যাণে যেকোনো তালে তালি বাজানো আর পা মেলানো তো শেখা হয়েই যায় … কিন্তু পুরো ব্যাপারটা বেশ মজা ছিলো ওখানে …

আমার প্ল্যান ছিলো চার্চে ঘুরে সেখান থেকে শিল্পকলা অ্যাকাডেমি যাবো … গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের আখতার ভাই মেসেজ পাঠিয়েছিলেন যাওয়ার জন্য … রাজশাহীর একটা দলের নাটক হবে … যেন সবাই উপস্থিত থাকি … কিন্তু সিস্টারদের ওখানে বসে গল্প করতে করতে সাড়ে ৬টার বেশি বেজে গেলো … আমার তো যাওয়ারই কথা ৬টা সময় … যদি সিস্টারদের কোয়ার্টারে না ঢুকতাম তাহলে শিল্পকলায় চলে যেতাম তার আগেই….. তো সাড়ে ৬টা সময় বের হয়ে চিন্তা করলাম যে এখন শিল্পকলা পর্যন্ত গিয়ে আসলে কি লাভ হবে কোনো? এইটা তো গ্রুপের নাটক না যে গিয়ে গ্রিন রুমের দরজা দিয়ে ঢুকে যাবো … ওখানে তো কাউকে আদৌ চিনিই না ওভাবে ! আর আখতার ভাই-ও আমার গ্রুপের কেউ লাগে না যে গিয়ে ফোন দেবো আর বলবো ‘ভাই কই আপনি?’ … তো এর মধ্যে আমার বাসা মিরপুর শুনে বুলবুল মিস বললেন উনি ১০ নাম্বার পর্যন্ত যাবেন শারমিন মিসের গাড়িতে, আমিও তাহলে উনার সাথে যেতে পারি … তো ভাবলাম যে শিল্পকলায় যাওয়ার প্যানা না নিয়ে বাসার দিকেই চলে যাই … তো চলে আসলাম মিসদের সাথে … মিরপুর ১০ নাম্বারে নেমে বুলবুল মিস আমাকে পারলে হাতে ধরে রাস্তা পার করে দেয় … আমি বললাম যে আমি পারবো তো … বলেন যে তুমি আগে রাস্তা পার হও, আমি এখানে দাঁড়িয়ে দেখবো তুমি ঠিকভাবে গেলা কি না … টিচাররা সারাজীবনই মনে হয় টিচারই থাকে, স্টুডেন্টরা যত বড়ই হোক, তারা বাচ্চাই থাকে! …

আজকে ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গেছে অদ্ভুতভাবে … স্বপ্ন দেখছিলাম অনেককিছু মিলিয়ে-মিশিয়ে … তো একপর্যায়ে স্কুলের কিছু ঘটনার মধ্যে নিজেকে দেখতে শুরু করলাম … টিচার্সরুমে ইউজ্যুয়াল হা হা হি হি আড্ডাবাজি যেসব হয় আর কি … এর মধ্যে আরিফিন স্যারও আছে … সেও বরাবরের মতোই এটা ওটা বলছে আর সবাই হাসতে হাসতে ভেঙ্গে পড়ছে … একবার আরিফিন স্যার কার অঙ্গভঙ্গি যেন নকল করে দেখাচ্ছে আর আমরা খুব হাসছি … তো এর মধ্যে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো আর আমি আবিষ্কার করলাম যে আমি সত্যি সত্যিই গা কাঁপিয়ে খিল খিল করে হাসছি! …  মজাই পেলাম ব্যাপারটায়। স্বপ্নে ভয় পেয়ে কিংবা কাঁদতে কাঁদতে জেগে উঠেছি তো অনেকবার, এমনকি ঘুম ভেঙ্গে আবিষ্কার করেছি সত্যি সত্যি কাঁদছি, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে … কিন্তু এভাবে হাসার অভিজ্ঞতাটা এই প্রথম হলো … ঘুম থেকে উঠে ভাবলাম স্কুলের এই মজার সময়গুলো মিস করছি বলেই হয়তো এভাবে স্বপ্ন দেখলাম … এই আরিফিন স্যার ব্যক্তিটা মানুষ হিসেবে খুব সুইট … নিজে ভালো মুডে থাকলে আশেপাশে সবাইকে মাতায় রাখে … গত এক মাসে আরিফিন স্যারের সাথে একই টেবিলে বসে কাজ করতে গিয়ে আরেকটু কাছ থেকে অনেককিছু দেখার সুযোগ হইসে … আর দেখা গেছে যে বাসায় মা’র অস্থিরতা, ডিপার্ট্মেন্টে সেমিস্টার ড্রপ দিচ্ছি বা যাবতীয় সবকিছু নিয়ে খুব মন খারাপ করে স্কুলে গেছি, কিন্তু আরিফিন স্যারের আশেপাশে থাকার প্রভাবে একসময় মন ভালো হয়ে গেছে …  এই ছুটিতে স্কুলের প্রসঙ্গে আরিফিন স্যারকেই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি মিস করবো … চাইলেই তো মেয়ে কলিগদের সাথে দেখা করে সময় কাটানো যায়, কিন্তু আরিফিন স্যারের সাথে তো সেটা সম্ভব না … আর ফেসবুকে দিনের বিভিন্ন সময় চ্যাট করা, ইভেন দরকারে অদরকারে কারো সাথে ফোনেও কথা বলে যোগাযোগ করা যায় … কিন্তু একটা মানুষ স্রেফ সামনে উপস্থিত থেকেই যখন পরিবেশটা অন্যরকম করে দেয় সেই আনন্দ তো আর উনার সাথে সামনাসামনি দেখা হওয়া ছাড়া পাবো না … সেজন্য স্কুল খোলা পর্যন্তই অপেক্ষা করতে হবে… 

আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায় আমি একটা মেয়ে হিসেবে আরেকটা মেয়েকে মিস করা যতটা স্বাভাবিক, একটা ছেলেকে মিস করা ততটাই মনে হয় অস্বাভাবিক! অথচ একটা মানুষ যেকোনোভাবেই তো আরেকটা মানুষকে মিস করতে পারে! …

যাই হোক … আজকে অনেক কিছু লিখে ফেলসি … আরেকটা কাহিনী আজকে ঘটসে, কিন্তু সেইটা নিয়ে এখন লিখবো না … এই লেখাটাই অর্ধেক লিখে রাখসিলাম গতকাল, আর আজকে গ্রুপে গেসিলাম, সেখান থেকে বাসায় ফিরতে দেরি হইলো বলে এই লেখা টাইমলি পাবলিশ করতে পারলাম না … ২৬ তারিখের লেখা পাবলিশ করছি ২৭ তারিখ …

তবে, আগামীদিনের দিনযাপনে আজকের বিশাল একটা কাহিনীর ব্যাপারে লিখবো হোপফুলি … যদি না সারাদিনে আর কিছু হয় …

আজকে শেষ করি … কালকে বাকি কথা হবে …   

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s