দিনযাপন । ০১০১২০১৭

বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই হঠাৎ ঘাড়ের বামদিকে এমন এক টান পড়লো যে এখন আর বাম দিকে মাথা ঘোরাতে পারছি না … বাম কাতে শুয়ে থাকলে হয়তো ঘাড়টা রেস্ট পাবে … যদিও এই ঘাড় টান নিয়েই আমি ২০১৭ সালের প্রথম দিনযাপন লিখতে বসেছি … সুতরাং, ঘাড়ের সেই আরাম পেতে একটু দেরিই আছে!

আজকে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দিন শুরু হলো জুঁই-এর অ্যাক্সিডেন্ট-এর খবর পেয়ে …ফেসবুকে প্রথমে মুন্না ভাইয়ের পোস্ট দেখলাম, তারপর ওর বোনও উনার নাম্বার দিয়েই জুঁই এর ওয়ালে একটা পোস্ট দিয়ে রেখেছে যে ইমার্জেন্সি হলে কেউ কন্টাক্ট করতে পারে … তো ওর বোনকে ফোন করলাম … উনি বললো যে গতকালকে সন্ধ্যায় নাকি ও গ্রুপে যাচ্ছিলো, তো অটোবাইক না ইজিবাইকে ছিলো, ওইটার চাকায় অর গলার ওড়না পেঁচিয়ে খারাপ অবস্থা … গলার হাড় নাকি সরে গেছে, মাথায় ব্যথা পেয়েছে, ঘাড় নাড়াতে পারছে না, কথা বলতে পারছে না … আজকে দুপুরে এমআরআই করার কথা ছিলো, কিন্তু ও শুতে পারছে না দেখে নাকি করা যায় নাই … এদিকে এমআরআই না করা গেলে ওর চিকিৎসাও প্রপারলি শুরু করা যাচ্ছে না … অপারেশন লাগবে কি না সেটাও বোঝা যাচ্ছে না … কি বিপদের মধ্যে পড়লো বেচারি …

আমি এইসব ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশনে মানুষকে কীভাবে সান্ত্বনা দিতে হয় জানি না … আর ফলে যথারীতিই জুঁই-কে দেখতে যাওয়ার সাহসও করতে পারলাম না … শুনলাম ওর বাবা-মা-বোন নাকি অনেক ভেঙ্গে পড়েছে … আমি ওখানে সরাসরি উপস্থিত হয়ে কীভাবে কি বলতাম? …  

15622662_961735603962276_1338881594333454303_n

আজকে সারাদিনে টুকটাক অনেকগুলা কাজ করেছি … সকালে ঘুম থেকে উঠেছি অবশ্য বেশ দেরিতে … প্রায় ১১টার বেশি বেজে গেলো … তারপর বের হবো, বের হচ্ছি করতে করতে শেষে যখন বের হলাম তখন বাজে আড়াইটা … ভেবেছিলাম যে পার্লারে গিয়ে ভ্রু প্লাক করবো আর শ্যাম্পু করবো চুলে, কিন্তু সেটা আর করা গেলো না … সময়ে কুলালো না আর কি … তো ওইটা কাল-পরশুও করা যাবে চিন্তা করে প্রথমে ব্যাংকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম … ২৭ নাম্বারে এবি ব্যাংকে … অনেকদিন ওই ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলি না, মাঝখানে খালি চেক জমা দিয়ে আসছিলাম, তাও দুই-তিন মাস আগে … তো আজকে ভাবলাম যে স্যালারি অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা না তুলে ওখান থেকেই তুলি … এদিকে ফোন নাম্বারটাও চেঞ্জ হয়েছে, বাসার ঠিকানাও চেঞ্জ হয়েছে … এই আপডেটগুলা তো এই ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে করা হয়নাই … তো আজকে টাকা তুলতে যাওয়ার উছিলায় ফোন নাম্বার আপডেটের ফর্ম ফিল-আপ করে আসলাম, বাসার ঠিকানা চেঞ্জের জন্য ইউটিলিটি বিলের কপি লাগবে, সো ওইটা আজকে করা গেলো না । এদিকে টাকা তোলার সময় জানতে চাইলাম যে অ্যাকাউন্টে কত টাকা জমা আছে আপাতত। টাকার অঙ্ক শুনেই নিজেই টাস্কি খেলাম … যেই অঙ্কের টাকা আছে তা আসলে আমি যা ভাবছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশিই! চাইলে আমি এখনই অল্প কিছু টাকা ভরে একটা ব্র্যান্ড নিউ ম্যাকবুক কিনে ফেলতে পারি! … বেশ খুশি খুশি লাগলো … মনে হলো যে আমি তো বেশ বড়লোক! শেষ কবে এই পরিমাণ টাকা একসাথে ছিলো আমার কাছে মনে করতে পারলাম না …

যাই হোক, ব্যাংক থেকে বের হয়ে উল্টা পাড়ে ক্রিমসন কাপ-এ ঢুকলাম … আজকে নিজেই নিজেকে ট্রিট দেবো, এইরকম একটা চিন্তা-ভাবনা নিয়ে বের হয়েছিলাম আর কি ! … তো ক্রিমসন কাপে ঢোকার মুখে সানিডেলের এক স্টুডেন্ট-এর সাথে দেখা, ফাহিমা … আবার ক্রিমসনে ঢুকে দেখি সানিডেলের আরো ৩ স্টুডেন্ট! সানিডেলে আমার প্রথম বছরের স্টুডেন্ট ছিলো ওরা ৩ জন। তখন ওরা ক্লাস সিক্সে পড়তো, আর এ বছর ও লেভেল দেবে। তো ওদের সাথে হাই-হ্যালো করে গিয়ে বসলাম … একা একা খাওয়া-দাওয়া ব্যাপারটায় আমি স্বচ্ছন্দ্য না … অন্তত পাবলিক প্লেসে তো না-ই … কেমন জানি মনে হতে থাকে যে সবাই যেন তাকিয়ে তাকিয়ে আমার খাওয়া দেখছে … সাথে কেউ না কেউ থাকলে তো গল্প করতে করতে মনোযোগ আর অন্যদিকে যায় না! নইলে নিজেকেই কেমন আউটকাস্ট মনে হতে থাকে! সবাই দলে বলে খাচ্ছে আর আমি একা! … তো আজকে যেহেতু নিজেকেই নিজে ট্রিট দেয়ার কথা ভেবেছি, আজকে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গাটা একটু ইগ্নোর করতেই হলো … আমি যেই টেবিলে বসেছি তার উল্টা দিকের টেবিলেই আরেক ভদ্রলোক এসে বসলেন। একাই। একটা কফি অর্ডার করে সেটা নিয়ে বসে খেতে থাকলেন। মনে মনে ভাবলাম যে যাক!আমি তাইলে একাই ‘একা’ না! কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেলো ওই লোকের এক মেয়েবন্ধু অথবা প্রেমিকা এসে হাজির! লে হালুয়া! আবার মনে মনে ভাবলাম, আমিই মনে হয় সেই অভাগাদের একজন যার কোনো ব্যাকআপ-ও নাই, প্রেমিক বা কাছের ছেলেবন্ধু তো দূরের কথা! … চারপাশে যেদিকেই তাকাই সবাই জোড়া জোড়া! … বন্ধুই হোক, আর প্রেমিক/প্রেমিকাই হোক! …

ক্রিমসন কাপ থেকে বের হয়ে শিল্পকলার দিকে গেলাম … ওই যে কালকে বললাম যে বকুল ভাইয়ের ডিরেকশনের নাটক দেখতে যাবো … যথারীতিই নাটক দেখার এক্সপেরিয়েন্সটা প্যাথেটিক ছিলো … পুরোটা নাটক জুড়ে কেবল নিজের অভিজ্ঞতাগুলোর কথাই ভেবেছি আর কেঁদেছি … মূল চরিত্রে যেই মেয়েটা অভিনয় করেছে তার ইংরেজি বলার ভঙ্গিটা একদমই ভালো লাগেনি বলে সংলাপগুলো মনে হয় একটু কমই ধাক্কা দিতে পেরেছে। ইমোশনাল হবার মাঝে মাঝেও মেয়েটার হিন্দি অ্যাকসেন্ট-এ ইংরেজি বলার ভঙ্গিতে বিরক্ত হয়ে মনোযোগ চলে যাচ্ছিলো ওর কথা বলার ভঙ্গির দিকেই … চরিত্রের দিকে না … কিন্তু সে যাই হোক, ওরিয়ানা ফালাচ্চি’র গল্পের কাহিনী আর নিজের কাহিনীর মধ্যে যেহেতু যথেষ্টই মিল আছে, সো ঘটনাক্রমগুলাই আমাকে বারবার নিজের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো … এর মধ্যে আরেক কাহিনী … পাশেই এসে বসেছে ঝুনা চৌধুরী আর গিয়াস ভাই … এদের সামনে শান্তিমতো চোখের পানিটাই বা ফেলি কীভাবে? দেখা গেলো তখন আরেকটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো এমনভাবে চোখের পানি ফেলা যাতে পাশে আর কেউ টের না পায় … কিন্তু নাটকের শেষে আর শেষরক্ষা হলো না … মেয়েটা যখন ‘হোয়্যার ইজ মাই বেবি’ বলে কাঁদছিলো, আমার ভেতরে সবকিছু মনে হলো দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে! হ্যাঁ! ঠিক এভাবেই ‘আমার বাচ্চা! আমার বাচ্চা’ বলে তো আমিও সেদিন হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম! ঠিক এভাবেই তো! নিজেকে সামলাতে সামলাতে হলের লাইটগুলা জ্বলে উঠলো … গিয়াস ভাই আমাকে দেখে ‘কি খবর’ টাইপের একটা হাসি দিলেন, আর আমি কোনোরকমে চোখের পানি মুছতে মুছতে এক দৌড়ে বের হয়ে গ্রিন রুমের দিকে চলে গেলাম … কাঁদছি কেন এইটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেলে তো এখন বিপদে পড়বো! …

তো যাই হোক, বের হয়ে এর সাথে তার সাথে কথা বলতে বলতে একটু নিজেকে সামলানো গেলো … বাসায় ফেরার পথে সিএনজিতে বসে বসে একেবারে মন-প্রাণ খুলে কান্নাকাটি করা গেলো … কিছুতেই পারি না এই একটা বিষয়ে নিজেকে সামলাতে … কোনোদিন কি আদৌ পারবো? …

উফ! ঘাড়ে খুব টান লাগছে … বসে থাকতে পারছি না আর … আজকের মতো বিদায় নেই … সেটাই মনে হচ্ছে ভালো হবে … ঘাড়টাকে একটু আরাম দেয়া দরকার …  

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s