দিনযাপন । ২২০২২০১৭

আজকে সকালটাই কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিলো … আজকে ঠিক করেছিলাম যে সকালে সিএনজি বাসার নিচে আসার সাথে সাথেই বের হয়ে যাবো … যত তাড়াতাড়ি স্কুলে পৌঁছানো যাবে ততই লাভ … তো আমি আগেই রেডি হয়ে গেলাম আজকে … সিএনজি বাসার নিচে আসলো যখন, তখন ৬টা ২০ বাজে … আমি বের হয়ে গেলাম … এদিকে বের হয়ে দেখি তখনও লিফট চালায় নাই … তো সিঁড়ি দিয়েই নেমে গেলাম … নিচে নেমে দেখি তালাও খোলা হয়নাই গেটের, আর দারোয়ান চাচা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে … তো আমি বেশ কয়েকবার জোরে জোরে তাকে ডাকলাম, উনি যেই ঘরে ঘুমায়, সেখানে স্লাইডিং ডোর দেয়া, সেই দরজার কাচে জোরে জোরে বাড়ি দিলাম, গেটের তালায় বাড়ি দিয়ে দিয়ে শব্দ করলাম, তাও দেখি চাচার ওঠার কোনো নামগন্ধ নাই … হঠাৎ আমার মনে হতে লাগলো যে বুড়ামানুষ, মরে টরেই গেলো নাকি ঘুমের মধ্যে! … এরপর আমি বেশ ভয়ে ভয়েই তাকে আরো কয়েকবার ডাকলাম … এক পর্যায়ে সে ঠাস্‌ করে ঘুম থেকে জেগে উঠে বসলো! … আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যে যাক, এই যাত্রা উনি মরে নাই! …

কিন্তু তখনও আমি জানি না যে আজকেই দুপুরবেলা একটা মৃত্যুর খবর শুনতে হবে আমাকে … তাও আবার কণা’র! …

স্কুলে আজকে মোটামুটি একটা দৌড়ের ওপর দিন পার করে সোয়া ১টার দিকে যখন কালকের স্পোর্টস নিয়ে টিচার্স মিটিং চলছে, তখন দেখি একের পর এক ফোন আসছে একটা নাম্বার থেকে … নাম্বারটা কার আমি রিকগনাইজ করতে পারছিলাম না, কিন্তু খুব মনে হচ্ছিলো যে নাম্বারটা পরিচিত কারো … কেবলই মনে হচ্ছিলো যে এই নাম্বারে আমি আগেও কথা বলেছি … তো মিটিং শেষ হবার পর আমি ওই নাম্বারে কলব্যাক করলাম … শাফায়াৎ -এর গলা … কিন্তু সে যেটা বললো সেটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না মোটেই … কণা মারা গেছে! … সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শাফায়াতের সাথে কথা বলছিলাম, ওখানেই থমকে গেলাম … ও জানালো যে কণা সোহরাওয়ার্দিতে আছে, সেখানে যাচ্ছে ও এখন, গ্রুপের আরো কয়েকজনও যাচ্ছে, কলি আপু আর শশাঙ্ক দা অলরেডিই ওখানে … এদিকে স্কুলে তখন স্পোর্টস এর কাজ নিয়ে সবার দৌড়াদৌড়ি অবস্থা … আমি একবার ভাবলাম যে কাজকর্ম অন্যরা সামলাক, আমি হাসপাতাল যাই … এরপরেই আবার মনে হলো যে গতকালকে ওকে যে-ই অবস্থায় দেখেছি, সেইটুকুই শেষ স্মৃতি হয়ে থাকুক, লাশ হিসেবে ওকে দেখতে চাই না … কেমন জানি লাগছিলো … নিজেকে খুব শক্ত রাখার ভাবভঙ্গি নিয়ে টিচার্স রুমে গিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম … কান্না পাচ্ছিলো খুব … কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করছিলাম কারণ এটাও ভাবছিলাম যে এখন কাঁদতে শুরু করলে সবাই আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে, আবার ভাবতে পারে স্পোর্টস রিলেটেড কিছু নিয়ে হয়তো একটা কিছু হয়েছে … নুসরাত আপু আমাকে খুঁজতে খুঁজতে টিচার্স রুমে এসে আমাকে দেখে খালি কাঁধে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলো ‘কি হয়েছে ?’ … আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না … ‘আমার একটা ফ্রেন্ড একটু আগে মারা গেছে’ বলে আমি কাঁদতে শুরু করলাম …

16427219_1827858674120488_5251099989348465009_n

কেমন যে লাগছিলো তখন … খালি মনে হচ্ছিলো কালকে আমরাই হয়তো অনেক গাফিলতি করেছি কণা-কে টেক কেয়ার করার ব্যাপারে … সবাই শো নিয়ে ব্যস্ত ছিলো, আমিও ঘুরতে গিয়েছি মুডে ছিলাম বলে অতটা গরজ করি নাই যে আর কেউ ওকে বাসায় দিয়ে আসতে না পারুক, আমিই না হয় একটা সিএনজি করে ওকে দিয়ে আসি… বাসা তো ওর ওই রেসিডেন্সিয়াল মডেল থেকে মিনিট পাঁচ-এরই দূরত্ব ছিলো! … তারপর ওকে যখন মেডিকেল বুথে নিয়ে যাওয়া হলো, ওখানকার ডাক্তাররা বারবার বলছিলেন যে ওকে আপনারা হাসপাতালে নিয়ে যান, কাছেই তো সোহরাওয়ার্দি, ওখানে নিয়ে একটা ইমার্জেন্সি চেক-আপ করান … হাসপাতাল পর্যন্ত কীভাবে নেয়া হবে সেইটা নিয়েই খুব রিলাকটেন্ট আচরণ করেছি আমরা সবাই … জার্নাল ভাই কিছুক্ষণ গাড়ি পাওয়া যায় কি না খোঁজাখুঁজি করে হাল ছেড়ে দিলো … পরে যখন কনক দা’র গাড়ি পাওয়া গেলো তখন আমরা ওর খালাতো ভাই (মতান্তরে ওর জামাই) -এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম যে ওই ছেলে এসে ওকে বাসায় নিয়ে যাবে … কিংবা কণার বাসার পাশের পরিচিত ডাক্তারের কাছে …খালি মনে হচ্ছিলো যে আমি, শাফায়াৎ, শুভ আর শাহিন যে অতক্ষ্ণ ছিলাম বর্ণমেলায়, আমরাই কি যথেষ্ট ছিলাম না ওকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য? … একটা সিএনজি ডেকে এনে ওকে নিয়ে যেতাম সোহরাওয়ার্দিতে … কেন করলাম না সেটা? … কেন একবারও মনে হলো না যে আমরাই তো ওর এইটুকু দায়িত্ব নিতে পারি …

এইগুলা ভাবতে ভাবতে আরো খারাপ লাগা বেড়ে গেলো … নায়ীমী তখনও খবর পায়নি … কাশফিয়া আপুরা ওকে ডেকে আনলো … কেমন যে লাগলো নায়ীমীকে মুখ ফুটে বলতে যে কণা মারা গেছে! … যেটা নিজেই মানতে পারছি না, সেটা আরেকজনকে কীভাবে বলবো? কীভাবে মানাবো? …

স্কুলের কাজে ব্যস্ত থেকে মনের মধ্যে আঁকুপাঁকু করতে থাক এই চিন্তাগুলোকে ভুলে থাকার চেষ্টা করছিলাম … মাদলেন আপাদের সাথে হাহা-হিহি, লিপি আপা, রোকসানা আপাদের অ্যাডাল্ট জোক, এর মধ্যে আরিফিন স্যারকে স্পোর্টস রিলেটেড একটা ব্যাপারে ফোন করতে গিয়ে উনার এক বন্ধু ফোন ধরে বললো যে স্যার নাকি সেলুনে ফেসিয়াল করে, এইসব নিয়ে কাশফিয়া আপু, অরুণদ্যুতি আপুর সাথে, আরিফিন স্যারের সাথেও ফোনে ফাজলামি করতে করতে আবার এটাও মনে হচ্ছিলো যে আসলেই কি আমার এখন এইসব হাহাহিহি করা উচিৎ? নাকি যে কথাগুলো ভুলে থাকার চেষ্টা করছি সেগুলো ভুলে না থেকে আরো গভীরভাবে সেগুলো নিয়েই ভাবা উচিৎ? … কোনোভাবেই কিছু ভালো লাগছিলো না … ৫টার দিকে বের হয়েছি স্কুল থেকে, বাসায় ফিরতে ফিরতে সিএনজিতে বসে সারাটা রাস্তা এইসব ভাবতে ভাবতেই আসলাম … রিঙ্কন দা যেদিন মারা গেলো, সেদিনের কথা ভাবছিলাম … জেম এর মা যেদিন মারা গেলেন, সেদিনের কথা ভাবছিলাম … কীভাবে কীভাবে কিছু মানুষের মৃত্যুর সাথে আমরাও জড়িয়ে যাই, সেগুলো নিয়ে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরলাম …

আগামীকালকের স্পোর্টস নিয়ে যতটুকু উত্তেজনা ছিলো এখন আর কিছুই অনুভব করছি না … মনে হচ্ছে হ্যাঁ, কালকে স্পোর্টস, যাবো, বাচ্চা-কাচ্চা সামলাবো … এই তো! … এইরকম মনের অবস্থা থাকলে স্পোর্টস আর এনজয় করবো কীভাবে? … কালকে তো আবার স্কলাস্টিকাতেও যাবো বিকালে … সেখানেও বোধহয় গিয়ে আর হাসি হাসি মুখে নাটক দেখা আর নাটকের ছবি তোলার মুড থাকবে না …

আজকে আর লিখবো না … কি এক বাজে টাইপের ঠাণ্ডা লেগেছে, সেটাও ভালো হচ্ছে না … কেমন একটা শুকনা খুস্খুসে কাশি হঠাৎ হঠাৎ শুরু হয় আর অস্থির লাগতে থাকে … কালকে আবার ধুলাবালির মধ্যে দৌড়াবো … ঠান্ডার অবস্থা আরো খারাপ কিংবা জ্বর না আসলেই হয় …

আজকে এখানেই শেষ করবো … খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে থাকা যায় কি না দেখি … কালকের তো অনেকগুলা দায়িত্ব, সেগুলা তো অন্তত ঠিকঠাক হতে হবে, মনের অবস্থা যা-ই হোক …  

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s