দিনযাপন । ২১০৫২০১৭

আজকে একটু দেরি হয়ে গেলো, তাও দিনযাপন লিখতে বসলাম। এত গরম দুইদিন যাবত! গতকালকে তো মনে হয় এই গ্রীষ্মের হায়েস্ট টেম্পেরেচার ছিলো … আজকেও যে তাপমাত্রা খুব কম তা না … মনে হচ্ছে একটু পরে বাথরুমে গিয়ে গায়ে পানি দিয়ে আসা লাগবে। আজকে বিকালে ঘুমাইনাই, তাই ঘুম ঘুমও লাগছে … ঘুম কাটানোর জন্য ঠাণ্ডা আইসক্রিম খাবো কি না ভাবছি … অবশ্য ঠাণ্ডা কিছু খেলে সাথে সাথেই মনে হয় যেন গরম বেশি লাগতেসে …

ঘরের মধ্যে একটা মাকড়সা দুই/তিন ধরে ঘুরঘুর করতেসে। কিভাবে ঢুকেছে কে জানে! মাকড়সাতে এমনিতে আমার সমস্যা নাই, কিন্তু তারপরও, রুমমেট হিসেবে মাকড়সা আসলে খুব আকাঙ্ক্ষিত না আমার কাছেও। আরেকদিন এক বিশাল সাইজের লাল রঙের সেন্টিপেড ঘরের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলো। সম্ভবত বাথরুমের পাইপলাইন দিয়ে ঢুকেছে! কার্পেটের ভেতরে ঢুকে যাবার জাস্ট আগের মুহুর্তে খেয়াল করে ওইটাকে জুতা দিয়ে চাপা দিয়ে আটকে ফেলেছিলাম। নইলে এই জিনিস যদি বেয়ে বেয়ে বিছানায় উঠে যেতো কি ভয়ঙ্কর অবস্থা হইতো!

আজকে স্কুলেও কোথা থেকে এক মেটে সাপের বাচ্চা বাথরুমে ঢুকে গেছে। প্রথমে ওটাকে কেঁচো ভেবে সবাই উসখুস করছিলো, কিন্তু মেরে ফেলার সাহস করতে পারছিলো না কেউ। এদিকে ওইটার রঙ দেখে আবার কেউ শিওর-ও হতে পারছিলো না যে ওইটা আদৌ কেঁচো কি না … কারণ কেঁচো তো ছাই রঙের হয় না! … আর যেভাবে কিলবিল করছিলো, সেটাও কেঁচোর মুভমেন্টের সাথে বেমানান। এদিকে আমি একটু সাহস করে ওইটাকে মারতে গেলাম। জুতা দিয়ে বাড়ি মেরে মারবো ভেবেছিলাম, কিন্তু দেখলাম যে এর চেয়ে চাপা দিয়ে মারাটাই সহজ। আমি জুতাটা ওই সাপের বাচ্চার ওপর রেখে চাপ দিবো কি দিবো না সেঁতা নিয়ে ইতস্তত করছিলাম। জিশা পাশ থেকে ‘মিস, দেন! চাপ দেন! … এই তো! আরেকটু জোরে … ‘ বলতে থাকায় আমারও একটু উৎসাহ আসলো। সাপ মারাটা আসলে বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস ব্যাপার টাইপের একটা অ্যাটিচুড নিয়ে ওইটাকে মারতে থাকলাম। এইদিকে দেখি যে এইটার রক্ত বের হচ্ছে। শিওর হওয়া গেলো যে এইটা আড় যাই হোক, কেঁচো না! ফৌজিয়া আপা এসে দেখে বললেন যে এইটা মেটে সাপের বাচ্চা … মরা সাপকে ভালমতো অব্জার্ভ করে দেখা গেলো যে এইটার একটা মাথা আর পয়েন্টেড লেজও আছে! …

18527616_1071533732982462_8673022964557895536_n

সাপ মারার মতো সাহসী অভিযানের পরে বিকালে এক মহা অ্যাম্বেরেসিং ঘটনা ঘটে গেলো! স্কুলের ক্লাস পার্টিতে টেক আউটের বার্গার নেয়া হবে, সেটার অর্ডার দিতে গিয়েছিলাম আমি আর কাশফিয়া আপু, সাথে আবার কিভাবে কিভাবে জেবু আপাও জুটে গেলো। এদিকে বার্গারের দোকানে অর্ডার নিয়ে কথা বলে, নিজেরা বার্গার খেয়ে নামার সময় আমার উৎসাহেই দুইতলায় ডোনাটের দোকান গ্লেজড-এ ঢোকা হলো … আমরা ডোনাট খেয়ে উঠবো উঠবো করছি এমন সময় হঠাৎ খেয়াল করলাম কোথা থেকে এক প্রজাপতি উড়ে উড়ে আমাদের দিকেই আসতেসে … কাশফিয়া আপুই প্রথম খেয়াল করলো জিনিসটা … উড়ন্ত জিনিস দেখে প্রথমে বোধহয় ভাবসিলো তেলাপোকা। কারণ এম্নিতেই ওইখানে অনেক মশা ছিলো, আর কাশফিয়া আপুরা বসে বসে ব্যাট দিয়ে মশাও মারতেসিলো। তো ‘ওমা! এইটা কি?’ বলেই সাথে সাথে বললো … আরেহ প্রজাপতি! … আমার কি আর তখন  জানে পানি থাকে? এইরকম গরমকালে এভাবে দোকানের ভেতর কথা না বার্তা নাই প্রজাপতির সাথে এনকাউন্টার! আমি এখন কি করবো, কই যাবো চিন্তা করে দুই হাত দিয়ে মাথা-টাথা ঢেকে চিৎকার দিতে থাকলাম। ওইটা বোধহয় ওই জায়গায় একটু উড়াউড়ি করে আবার দোকানের ভেতরের ডিকে চলে গেলো। আমি মোটামুটি ব্যাগ-ট্যাগ সব রেখেই দৌড়ে বের হয়ে আসলাম … দোকানের লোকজনের মাথার উপর দিয়ে গেলো পূরা ব্যাপারটাই … কাশফিয়া আপুরা শুনলাম বের হতে হতে দোকানের লোকজনকে ব্যাখ্যা করতেসে যে ‘ ও আসলে এইটা ভয় পায় … ফোবিয়া আর কি! … এইটা একটা অসুখ … ও প্রজাপতি দেখলে এরকমই করে … ইত্যাদি ইত্যাদি … ‘ … ওই দোকানের লোকজন কি বুঝছে কে জানে! তবে আমি যে আর অদূর ভবিষ্যতে ওই দোকানে যাবো না, এই ব্যাপারে আমি শিওর!

এইবার জেবু আপা সম্পর্কে একটু বলি … আসার পথে যথারীতি জেবু আপা ফ্রি রাইড নিয়ে আমার সাথে ২ নাম্বার পর্যন্ত এসে তারপর রিকশায় করে ১০ মিনিটের দূরত্বে বাসায় চলে গেলো … আমি একবার ভাবতেসিলাম যে একটা কিছু বলে উনাকে কাটায় দিবো … বলবো যে এখন তো বাসায় যাবো না, আরেক জায়গায় যাবো … এইসব বলে টলে রিকশা নিয়ে কিছুদূর গিয়ে কিংবা উনি বাসের জন্য চলে গেলে পরে ওইখান থেকেই সিএনজি করে চলে আসবো … কিন্তু সেটা আর করলাম না … স্কুলে এম্নিতেই উনার কাজকর্ম আমার খুব একটা পছন্দ না, তারমধ্যে উনার সাথে আমার কিছু ক্যাচালও হয়েছে … সবকিছুই হয়তো আমি স্বাভাবিকভাবে মাথা থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারি, কিন্তু মাঝখানে উনি এমন একটা কাজ করেছে আমার সাথে যে উনার ব্যাপারে যাবতীয় পজিটিভ ইম্প্রেশন আমার উঠে গেছে! জেবু আপাকে যারা আগে থেকে চেনে তাঁরা খুব জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে যে উনি বেসিক্যালি বোকা-সোকা মহিলা, তাই যা খুশি তাই করে ফেলে বা বলে ফেলে … কিন্তু আমি এই যুক্তিতে খুশি থাকার মানুষ না … আমি নিজেও মানি যে উনার চিন্তাভাবনা, ধ্যান-ধারণা, শিক্ষাদীক্ষা সবকিছুতেই প্রচণ্ড রকমের টিপিক্যালিটি আছে, এবং ঠিক সেই টাইপের টিপিক্যালিটি যেইটা নাকি আমি একদমই সবসময় অ্যাভয়েড করে আসছি। তো এই গত মার্চ মাসেই, স্কুলের জুনিয়র ক্লাসের ইনচার্জ ফৌজিয়া হক আপার জন্মদিন পালন করা হবে, তো জেবু আপা ওইটার আরেঞ্জমেন্ট করতেসে। ফুল আনানোর কাউকে পায় না, শেষে আমি এক শর্তে রাজি হলাম যে উনার বাসা থেকে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে যে একটা ফুলের দোকান আছে, সেখান থেকে আমি ফুলের অর্ডার দেবো, কিন্তু আসার সময় তাইলে উনাকেও সাথে আসতে হবে। কারণ একজন একা সিএনজি-তে ফুলের তোড়া নিয়ে আসাটা খুব সহজ না … তো উনি রাজি হইলো, প্ল্যান হইলো যে আমি বের হবার সময় উনাকে ফোন দিবো, উনি ওইখানে ফুলের দোকানে চলে আসবে, আমি তারপর উনাকে ‘ফ্রি রাইড’ দিয়ে নিয়ে আসবো … তো যেদিন ফুল আনবো, ওইদিন সকাল থেকে উনাকে ফোন দিয়েই গেলাম, উনি ফোন তো ধরলোই না, পরে আর কলব্যাকও করলো না! … তো আমার আবার এইসব ‘কথা দিয়ে কথা না রাখা’ বিষয়গুলো একদমই নেয়ার ক্ষমতা নাই! … আমার চিন্তাধারা খুব সিম্পল। আমি যদি একবার মুখ দিয়ে বের করি যে ‘ওকে, আমি এইটা করবো’, আমার যত কষ্টই হোক, আমি সেটা করবো। আর একান্তই না পারলে সেটাও নিজেই গরজ করে জানায় দিবো … সেক্ষেত্রে এভাবে ফোন না ধরা, বা ফোন ব্যাক না করাটা তো পুরাই ইগ্নোর করে যাওয়ার শামিল! … উনার ওপর এম্নিতেই তো জিদ উঠতেসিলো, তারমধ্যে উনি স্কুলে যাওয়ার পর উনার ফোন না ধরা বা আমাকে কল ব্যাক না করার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র স্যরি তো বললেনই না, বরং যখন দেখলেন যে আমি ক্ষেপে আছি তখন আমার সাথে আজাইরা ফাইজলামি করতে শুরু করলেন। এম্নিতেই মেজাজ গরম, তারমধ্যে ওইসব আচরণ দেখে আরও মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো… উনি এক পর্যায়ে খুব ফাজলামি মুডে, ‘আহারে! বাচ্চাটা রাগ কর্ষে! আসো আদর করে দেই’ বলে আমাকে হাগ দিতে গেলো, আর আমি ‘সরেন! যত্তসব!’ বলে চিৎকার দিয়ে উনাকে ঝটকা মেরে সরায় দিলাম। চিৎকারের ইন্টেন্সিটিটা ‘সরেন … আরে! সরেন তো! … সরেন! ‘… এভাবে ক্রমেই বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে এত জোরে দিলাম যে পাশের টিচার্স রুম, মাদলেন আপার রুম, পাশের ক্লাস রুম পর্যন্তও মনে হয় শোনা গেলো … তাতে নাকি জেবূ আপা খুব অফেন্ডেড হইসিলো! কাশফিয়া আপু আবার আমাকে কি কি সব বুঝাইলো যে ওয়ার্ক প্লেসে অনেক কিছু মাথায় রেখে চলতে হয়, এই সেই!…

আমি হয়তো জেবু আপার ওপর এত বিরক্ত হইতাম না, যদি না উনার পাস্ট হিস্ট্রি ক্লিয়ার থাকতো! উনি স্কুলে খাওয়াবে, সেই খাবারের ডেকচি নিয়ে যেতে হবে দেখে উনি আমার সাথে ‘ফ্রি রাইড’ নিলো ওই ঘটনার কয়েকদিন আগে…বাসা থেকে বের হবার টাইমে উনাকে ফোন দিবো বলার পরেও ভোর থেকে মোটামুটি ৩/৪ বার ফোন করে কনফার্ম হইসে আমি আদৌ উনাকে ফেলে চলে যাই কি না! … শিল্পকলায় নাটক দেখতে যাবে, তাতেও যাওয়াআসার পথে আমার ওপর দিয়েই গেলো! নিজের স্বার্থ যখন থাকে, তখন ঠিকই সেখানে ষোলো আনা ! এইসব স্বার্থপরতাই আমি নিতে পারি না! একেবারেই জিরো টলারেন্স!

তো, ওই ঘটনার পরে জেবু আপার নিজেরই লজ্জা হবার কথা আমার কাছে লিফট নেয়ার কথা ভাবতে! সেই লজ্জা অবশ্য উনার একদমই নাই! ওই ঘটনার এক সপ্তাহের মাথাতেই উনি বাসায় যাওয়ার পথে আমার সাথে যেতে চাইসে! কি অদ্ভুত মেন্টালিটি মানুষের! আমি হইলে তো জীবনেও পারতাম না! … তো যাই হোক, উনার এইসব কাহিনী-কীর্তি আর আচার-আচরণের কারণে উনাকে আমার আর ভাল্লাগে না এখন। যতই উনি বোকা-সোকা হোক, আর ‘টু টিপিক্যাল টু ইগ্নোর’ হোক … জিরো টলারেন্স মানে জিরো টলারেন্স! … এইবার পরীক্ষার আগেও ফাইনাল প্রিন্ট বের করা নিয়ে উনার সাথে আমার গ্যাঞ্জাম হইসে উনার আচরণের সূত্র ধরেই … তারপরেও উনি আবার খুব হাসি হাসি, অ্যাজ ইফ কিছুই হয় নাই! কি জানি! আসলেই কি উনি এতই বোকা যে যখন যা মাথায় আসে তাই বলে ফেলে, নাকি ইচ্ছা করে এতটা বোকা থাকার ভান করে বুঝি না আমি! … এগুলা আমার মাথার উপর দিয়েই যায়! … মানুষ যত রিয়েল হয়, তত আমার জন্য বোঝা সহজ! … মানুষের এইসব জটিল মানসিকতা বুঝি না আমি! …

আজকে একটা গিফট পেয়েছি, একটা ড্রিমক্যাচার। আমার এক স্টুডেন্ট, গুনগুন, ও নেপাল গিয়েছিলো একটা টেনিস টুর্নামেন্টে পারটিসিপেট করতে, তো আসার সময় আমার জন্য সে একটা ড্রিমক্যাচার নিয়ে এসেছে। এত কিছু থাকতে যে ও আমার জন্য একটা ড্রিমক্যাচার এনেছে, মজাটা এখানেই। আমার ড্রিমক্যাচার প্রীতির ব্যাপারে আমার স্টুডেন্টরা অনেকেই বেশ ভালোই অবগত। একবার এই গুনগুনরাই ক্লাসে একটা প্রজেক্ট-এর কাজ করেছিলো, ওইখানে একটা ড্রিমক্যাচার বানিয়ে লাগিয়েছিল ওরা। আমি মাঝেমাঝেই বলতাম যে কোনদিন দেখবা ড্রিমক্যাচারটা নাই! তারপর খুঁজতে খুঁজতে আমার বাসায় গিয়ে পাবা! … তো গুনগুনের হয়তো ওইটাই মাথায় ছিলো যে আমার ড্রিমক্যাচার অনেক পছন্দ, আর সেকারণে নেপালে গিয়ে ড্রিমক্যাচার দেখে মনে হইসে যে মিসের জন্য এইটা নিয়ে যাওয়া যেতে পারে! … এইরকম একটা গিফট পেয়ে আমি যারপরনাই খুশি! … সাধারণত আমি স্টুডেন্টদের কাছ থেকে গিফট না নেয়ারই চেষ্টা করি, কিন্তু কিছু কিছু সময় স্টুডেন্টরা যখন এরকম কিছু নিয়ে আসে সেটা নেয়াই যায়! …

আচ্ছা, আজকে এই পর্যন্তই … এখন একটু গায়ে পানি দিয়ে ঠাণ্ডা হবো … তারপর শুয়ে পড়বো … কালকে তো সকালে উঠেই স্কুল …   

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s