দিনযাপন । ২৫০৫২০১৭

গতকালকে একটা চরম বাজে দিন কাটানোর পর আজকের দিনটাকে তুলনামূলকভাবে ভালোই বলা যায়। কালকেই ভেবেছিলাম যে শরীরের যেটুকু শক্তি আছে তাই দিয়েই কালকের গরম গরম দিনযাপন লিখে ঘুমাবো। কিন্তু যা ভেবেছি তা মোটেই করতে পারিনি। বাসায় ফিরেছি এমনই হাত-পা ফোলা আর ব্যথা নিয়ে যে কোনোভাবেই আর শুয়ে থাকা ছাড়া অন্যথা করার কোনো তাগিদ পেলাম না! অবশ্য শুয়ে থেকে যে ঘুমিয়েছি এমনও না! পা ফোলার কারণে কেমন চিনচিন করে ব্যথা করছিলো, আর সারা গা-হাত-পা চুল্কাচ্ছিলো … সারারাত খালি অস্বস্তিতে এপাশ-ওপাশ করেছি আর গা-হাত-পা চুলকিয়েছি! … ফলাফল আজকে সারাদিন মাথাব্যথা!

যাই হোক, কালকে মোটামুটি সারাদিনই যত রকমের বিরক্তিকর অনুভূতি নিয়ে পার করলাম। কালকে থেকে স্কুলের টাইমিং পাল্টেছে। যেহেতু পরীক্ষা শেষ এখন টিচারদের ৯টায় গেলেই হবে। এদিকে আমি যেই সিএনজি-তে যাই, সেই লোক আমার সাড়ে সাতটা/ আটটায় বের হবার জন্য অপেক্ষা করলে তার লস। ফলে সে ওই সাড়ে ৬টা সময় যখন সিএনজি বের করে, তখনই যেই ট্রিপ পায় সেটা নিয়ে নেয়। এখন তাকে তো আর আমি বলতে পারবো না যে আমি যেদিন দেরি করে বের হবো, আপনিও সেদিন দেরি করেই ট্রিপ শুরু করবেন! ফলে, আমার দেরি করে বের হবার দিনগুলোতে এই স্যাক্রিফাইসটুকু আমাকেই করতে হয়। যাই হোক, কালকে শাড়ি পরেছিলাম, স্কুলের ক্লাস পার্টি আছে দেখে। বিল্লাল ভাই-কে যেহেতু পাওয়া যাবে না, ভাবলাম যে উবার ডাকি, একটু আরাম করে যাই। কিসের কি! পিক আওয়ার দেখে ওইসময় ক্রমাগতই দেখাতে থাকলো ‘অল কারস ইন ইউজ’ … তো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তারপর উবারের ভরসায় না থেকে বের হয়ে গেলাম। সিএনজি স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি পরিচিত সিএনজিওয়ালারা কেউ নাই। একটা সিএনজি পাইলাম, সে কতক্ষণ গাই-গুই করে তারপর রাজি হইলো। প্রচণ্ড গরমে শাড়ি পরে প্রায় আধাসেদ্ধ হয়ে স্কুলে পৌঁছালাম।

এদিকে ক্লাস পার্টি মানেই বাচ্চাকাচ্চাদের হাউ-কাউ … আমি অবশ্য খুব বেশি অ্যাটেন্ড করারই চেষ্টা করলাম না… একদিনই তো ! করুক একটু হাউকাউ! … একবার খালি ক্লাস টিচার হিসেবে যেটুকু চেহারা দেখায় আসা যায়, দেখায় এসে বসে থাকলাম টিচার্স রুমে। টিচার্স রুমের হাউকাউগুলোই বরং ভালো লাগছিলো না। কে কি শাড়ি পরে এসেছে, কাকে কেমন লাগছে এই নিয়ে আজাইরা তেলানি, মন্তব্য, হাহা-হিহি এইগুলা ভালো লাগে না শুনতে। আর স্কুলে তো শাড়ি পরা মানেই কিছু টিচারের একেবারে নিজেদের ওয়্যারড্রবের এক্সিবিশন শুরু হয়ে যায়! তো যাই হোক, এই সবকিছুর মধ্যে একটাই ভাল লাগার ব্যাপার ঘটলো। ক্লাস এইটের দুই-তিনজন স্টুডেন্ট এসে আমাদের তিন টিচারকে ডেকে নিয়ে গেলো, কি একটা সারপ্রাইজ আছে বলে। তো লাকি আপা, ফারাহাত আপা আর আমি গেলাম ওদের সাথে। অরিফিন স্যারকেও খুঁজছিল ওরা, কিন্তু স্যার কালকে যায়ই নাই স্কুলে। তো যাই হোক, আমরা ওদের সাথে হলরুমে গিয়ে দেখি ওরা আমাদের চারজনের নাম করে চার কেক নিয়ে এসেছে! আমরা যেহেতু ক্লাস নাইনে আর ওদের ক্লাস নিচ্ছি না, ফলে ওরা আমাদের জন্য এভাবে একটা ছোটোখাটো ট্রিবিউট দেবার প্ল্যান করেছে! কেক-টেক কেটে আমি আমার কেক বগলদাবা করে নিচে নেমে গেলাম। ভাবলাম যে আমার জন্য কেক, এইটা অর্ধেকটা টিচার্স রুমে দিয়ে বাকিটা আমি বাক্সে করে বাসায় নিয়ে যাবো। কিসের কি! ফারাহাত আপা এসে বলে উনি নাকি উনার আর লাকি আপার কেক বাচ্চাদের দিয়ে আসছে ওরা নিজেরা মিলে খাওয়ার জন্য, আর আমি যেহেতু আমারটা নিয়ে এসেছি তাইলে এইটাই টিচার্সরুমে সবাই মিলে ভাগাভাগি করে খাবো! আমার নাম করে আনা কেক-এর একটা টুকরাও আমি নিজেই আর ভালোমতো খেতে পারলাম না! চুপচাপ ব্যাপারটা হজম করে গেলাম। কারণ নইলে আবার সবাই জ্ঞান দেয়া শুরু করতো যে এইসব বাচ্চামি করা ঠিক না, স্কুলে কাজ করতে হলে অনেক কিছু বাদ দিয়েই থাকতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি! …

ক্লাস পার্টি শেষ হলো ১১টার দিকে। ১২টার দিকেই কালকে টিচারদের ছুটি হয়ে গেলো। আমি এক উবার ডাকলাম। সেই ড্রাইভার টাইম দেখালো ২০ মিনিট লাগবে পৌঁছাতে, কারণ সে একটা ট্রিপ শেষ করে আসছে। ২০ মিনিট পর যখন ফোন দিয়ে খোঁজ নিলাম সে কই, বলে যে মিরপুর ১২ নাম্বারে গ্যাস নেয়! আমি ধান্মন্ডি থেকে মিরপুর যাবো, আর তাইলে উবারের ড্রাইভার কেন মিরপুরে থাকা অবস্থায় কল নিবে আমার মাথাতেই ঢুকলো না! সে বলতে থাকলো যে আমার লোকেশন নাকি মিরপুর দেখিয়েছে সেজন্য সে কল নিয়েছে! মেজাজটা এমন খারাপ হলো! ২০ মিনিট হুদাই নষ্ট হইলো আমার, তারমধ্যে উবারের ট্রিপ ক্যান্সেল করার কারণে ৫০টাকাও কাটলো! আরেকটা উবার কল করলাম, সেই ড্রাইভারও প্রায় মিনিট ১৫ বসিয়ে রেখে তারপর পৌঁছালো।

বাসায় ফিরে গোসল করে, খাওয়া দাওয়া করে উঠতে উঠতেই সাড়ে ৩টা বেজে গেলো। এদিকে আবারো বের হবো। স্কুলে গতকাল প্লেগ্রুপের বাচ্চাদের পারফরমেন্স ছিলো, সন্ধ্যা ৭টায়। তো এই গরমে স্কুল থেকে বের হয়ে কার বাসায় যাবো, ওইখানে আবার শাড়ি পরবো এইসব চিন্তা করে নিজের বাসাতেই চলে এসেছি। তাসলিমা আপা আগের দিনই প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিলেন যে আমি চাইলে উনার বাসাতেও যেতে পারি। আমি একবার ভেবেছিলামও যে শাড়ি- কাপড় নিয়ে উনার বাসায় চলে যাবো। কিন্তু পরে মনে হলো যে শাড়ি পরলে নিজের বাসাতেই পরতে আরাম! তো বের হবার সময় এক উবার ডাকলাম। সেইটাও আসলো প্রায় ২০মিনিট বসায় রেখে। ফলে যেখানে প্ল্যান ছিলো পৌনে পাঁচটার দিকে রওয়ানা দিয়ে দেবো, সেখানে বেরই হলাম সোয়া ৫টার কাছাকাছি সময়। ৬টার মধ্যে পৌঁছে যাবো ভেবেছিলাম, সেটা তো হলোই না, বরং জ্যামে বসে বসে আরও মাথাই ব্যথা হয়ে গেলো। স্কুলে যখন পৌছালাম, তখন অলরেডি ৭টা বাজে। তাও ভালো যে প্রোগ্রাম আর মিনিট ১০/১৫ দেরি করে শুরু হলো।

এদিকে বাসায় ফেরার সময় আরেক হুজ্জত! উবারে কল দিলাম পৌনে ৯টার দিকে। এক ড্রাইভার কল নিলো। দেখলাম যে টাইম দেখাচ্ছে ১৫ মিনিট। তো ১৫ মিনিট পরে যখন ফোন দিলাম তখন সেই ড্রাইভার বলে যে সে স্কয়ার হসপিটালের সামনে আছে, কলাবাগান না কোথায় একটা ট্রিপ নামাবে, তারপর তার গাড়ির ইঞ্জিনের কি সমস্যা হয়েছে সেটা ঠিক করবে, তারপর আসবে … এর মধ্যে স্কুলের প্রায় সবাই-ই চলে গেছে, খালি দারোয়ান ভাই আর খালারা কাজ সব গুছাচ্ছে আর লিভা মিস তার সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছে। তো আমি রেগেমেগে ট্রিপ ক্যান্সেল করে দিয়ে আরেকবার উবারে কল দিলাম। এইবার আরেক ড্রাউভার কল নিলো, তার সাথে তখনই কথা বললাম, সে বললো যে বসুন্ধরা সিটির সামনে আসছে, ৮ নাম্বারে একটা ট্রিপ নামাবে। তো সেই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে করতে প্রায় ১০টা বেজে গলো। এদিকে স্কুলে আমি একা দেখে খালারাও কেউ বের হয় না, দারোয়ান ভাই-ও যায় না! … আমি খালাদেরকে বারবার রিকোয়েস্ট করছিলাম যে উনারা যেন চলে যায়, কারণ এম্নিতেই জ্যামের রাস্তা, তার মধ্যে রাত সাড়ে ৯টা পার হয়ে গেছে, উনারা যাবে সেই রায়েরবাজার! … কিন্তু উনারা কেউ আমি না যাওয়া পর্যন্ত যাবে না। তো অবশেষে ১০টার দিকে সেই ড্রাইভার অবশেষে জানালো উনি মডার্ন হসপিটালের সামনে আছে। আমি তাকে ওখানেই থাকতে বলে হাঁটা দিলাম। স্কুলের সামনে আসবে, তারপর আবার ঘুরায় মিরপুর রোডে উঠবে, দরকার কি? …

কালকে রাস্তার এই জ্যামের দশা দেখে গত বছরের এই সময়টার কথা খুব মনে পড়তেসিলো। ইউনিভার্সিটি থেকে ক্লাস শেষ করে লিটেরেলি দুইদিন অর্ধেক পথ হেঁটে হেঁটে, অর্ধেক পথ রিকশা দিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম। কালকেও মনে হইলো ওইরকমই সাফারিং-এর মধ্য দিয়েই গেলাম। শুধুমাত্র জ্যামের কারণে যদি মানুষের এতগুলা সময় নষ্ট হয়ে যায়, তাইলে কিভাবে কি হবে? … কালকে বসে বসে ভাবছিলাম যে, এই যে আমি গতকাল সারাদিন খালি একটা গাড়ি আসার জন্যই ২০ মিনিট/ আধাঘণ্টা/ এক ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম, অথচ রাস্তায় বের হয়ে একটা সিএনজি নেয়ার কথা চিন্তা করলাম না, সেটা কেন? সারাদিনে উবারে যাওয়া আসার পেছনে কালকে আমার যে ১৫০০ টাকা খরচ হলো, এবং মাসের শেষে এসে এখন যে ১৫০ টাকা খরচ হলেও গায়ে লাগে, তাও এতগুলা টাকা খরচ করলাম, সেটাই বা কেন? … মনে মনে উত্তর গুছাবার চেষ্টা করলাম এভাবে যে, একটা কারণ অবশ্যই গত বছরের রোজার আগের এই সময়টায় বাসায় ফেরার যেই সাফারিং, সেইটার ট্রমা। আর দ্বিতীয়ত, এখন আসলে অনেক বেশিই আরামপ্রিয় হয়ে গেছি, যেটা শরীরে পোষায় না, মনে তাগিদ পাইনা সেইটা করিই  না! … কালকে স্কুল থেকে ওই সন্ধ্যার পরে বের হয়ে মডার্নের সামনে গিয়ে যদ সিএনজি খুঁজতাম, মোটামুটি ১৫/২০ মিনিট দাঁড়ায় একটা সিএনজি হয়তো পেতাম, কিন্তু তারপর যে জ্যামে বসে গরমে সেদ্ধ হতাম, তারপর সেটার প্রভাবে মেজাজ প্রচণ্ড তিরিক্ষি হয়ে থাকতো, সেটার চাইতে এক ঘণ্টা বসে থাকার পরে উবারের গাড়িতে করে যে ডাবল ভাড়া দিয়ে, এসির বাতাস খেতে খেতে আসলাম, তাতে একটু হলেও এতদূরের পথের জার্নির সাফারিং-টা তো কমলো!

তারপরেও তো কালকে যেই শরীরের অবস্থা নিয়ে বাসায় ফিরছি, সিএনজিতে করে যাওয়া-আসা করতে গেলে মনে হয় আজকে আর স্কুলেও যেতে পারতাম না! সকালে তো আজকে একবার মনেও হচ্ছিলো যে আদৌ যদি আজকে স্কুলে না যাই তাহলে কি হবে? যেহেতু ৯টা টাইমিং, বের হলাম একটু দেরি করে, ৮টার দিকে। যদি ইউজুয়াল টাইমে বের হতে হতো, তাহলে হয়তো সিদ্ধান্ত নিয়েই নিতাম যে স্কুলে যাবো না! আর গেলেও এরকম দেরি করেই যাবো! …

আজকে যেমন কিনু কাহারের থেটার-এর শো ছিলো শিল্পকলায়। কিন্তু গতকালকের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করে আজকে আর যাওয়ার সাহসই করলাম না। স্কুলের পরে না হয় তাসলিমা আপার বাসায় গিয়ে গোসল করে, খেয়েদেয়ে ধীরে-সুস্থে বিকালে ওইদিকে যেতে পারতাম, কিন্তু ফেরার পথে কি হবে, আদৌ উবার পাবো কি না এইসব চিন্তা করলাম, তারমধ্যে ভাবলাম যে গতকালকে রাতে তো একদমই ঘুম হয় নাই, আর সারাদিন মাথাব্যথা নিয়ে এভাবে না ঘুরে বরং বাসায় যদি বিকাল-সন্ধ্যা সময়টা একটু ঘুমাই তাহলেও বোধহয় ভালো লাগবে। তো সেটাই করলাম আর কি!

আজকে আর লিখবো না। এখন আবার একটু গোসল করে ঠাণ্ডা হবো। দুপুরের গোসলের ইফেক্ট চলে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। আবার গা চুলকাচ্ছে এখন। আর কেমন জানি একটা জ্বর জ্বর ভাব। গরমের কারণে দুই/তিনদিন ধরে ক্রমাগত ঠাণ্ডা পানি, কোক, আইসক্রিম খাচ্ছি … আর সেই সাথে ঘামছিও। সব মিলায়ই মনে হয় জ্বর আসি আসি করছে! …

বাই দ্য ওয়ে, গতকালকে একটা বিশেষ ডেটলাইন ছিল। একটা হাইপোথেটিক্যাল ডেটলাইন, তবুও, ডেটলাইন তো! কিছু একটা তো হতে পারতো এই তারিখে, বা তার আগে পরের কোনো এক সময়! নিজের হাতেই তো সেই সম্ভাবনা শেষ করেছি! … গতকালকে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, ইডিডি ২৪ মে, ২০১৫ লিখে … আনিতা আবার ইডিডি’র অর্থসহ এক মন্তব্য করে বসেছে! পারসোনালি ইনবক্সে লিখলে হয়তো আমি একরকম উত্তর দিতাম। কিন্তু কমেন্ট বক্সে লেখায় আমিও আবার ‘এইটা একটা কোড’ লিখে ব্যাপারটা কাটিয়ে দিয়েছি। যে যা খুশি বুঝে নিক! …

যাই হোক, শেষ করি তাইলে আজকের মতো!             

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s