দিনযাপন। ১৫০৪২০১৮

অনেকদিন পর আবারো অসহ্য মাথাব্যথাটা ফিরে এলো … সেই সাথে মাথাটা কেমন ঝিম ধরে আছে … মনে হচ্ছে মাথার ভেতর ক্রমাগত কিছু ভাইব্রেট করছে … চোখ জ্বলছে … চোখ খুলেও রাখতে কষ্ট হচ্ছে … শরীর দিয়ে, বিশেষ করে মাথা দিয়ে মনে হচ্ছে যেন ভাপ বের হচ্ছে … এগুলো প্রেশার বাড়ার লক্ষণ কিনা জানি না … তবে মাস দেড়েক আগে যখন ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম, তখনও এরকম অবস্থাই ছিলো, আর এটা-সেটা টেস্ট দেয়ার সাথে প্রেশার মেপে দেখেছিলো ডাক্তার, তখন এসেছিলো ১১০/১৪০ … বাসায় প্রেশার মাপার যন্ত্র নাই … থাকলেও লাভ নাই … মা প্রেশার মাপতে পারে না … নিজের প্রেশার শেষে নিজেরই মাপতে হবে … আমিও যে খুব ভালো পারি তাও না …

গতকাল থেকে এই মাথা ব্যথা নিয়ে আছি … আজকে সারাদিন স্কুল করে, গরমে, রোদে আরও মনে হলো অবস্থা খারাপ হয়েছে … ৪টার দিকে বাসায় ঢুকে কোনোরকমে খালি ব্যাগটা রেখে বাইরের কাপড়েই বিছানায় শুয়ে পড়লাম … তারপর প্রায় ঘণ্টা দুই বেহুঁশের মতো ঘুমিয়েছি … ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি আর মাথা তুলতে পারি না … এমন ভারী ঠেকছিলো মাথাটা … অনেক কষ্ট করে শেষে উঠলাম … কোনোরকমে গোসল করার পর একটু ভালো লাগলো … কিন্তু তারপর ভাত খেয়ে বসতে না বসতে আবার মাথা ব্যথা ফিরে এলো … কি দিয়ে ভাত খেলাম? শুঁটকি ভর্তা, ইলিশ মাছ, রুই মাছ … ইলিশ মাছ প্রেশার বাড়ায় কি না জানি না … শুকনা মরিচ কচলে ঝাল ঝাল করে যখন তিন রকম মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছিলাম, ভালোই লাগছিলো …

গতকালকে দুপুর থেকে শুরু হয়েছে এই মাথা ব্যথা … আয়রন সাপ্লিমেন্টের যেই কোর্সটা চলছে, সেটায় অবশ্য গতপরশু রাতে আর গতকাল সকালে ভাটা পড়েছিলো … ওষুধ খেতে ভুলে গেছি …কিন্তু  দুইবেলা ওষুধ না খেতেই শরীর এভাবে কলাপ্স করবে সেটাকে লজিক্যাল ভাবতে পারছি না … গতপরশু রাতে খাওয়া-দাওয়ার একটা অনিয়ম হয়েছে … সন্ধ্যাবেলা থেকেই পেট চোঁচোঁ করা ক্ষুধা নিয়ে ঘুরলাম, বাসায় ফিরলাম রাত ১টার পরে, তারপর নামকাওয়াস্তে অল্প একটু ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম … গতকালকে আবার সকাল থেকে হয়েছে ঘুমের ডিস্টার্ব … ভোর সাড়ে ৬টা সময় সিএনজিওয়ালা নাসির মামা ফোন দিলো, ‘মামা, আজকে কোথাও বের হবেন?’ … ভাবলাম উনি ফোন দিয়েছে ভালোই হয়েছে … মা সকালে কলেজে যাবে বলেছিল … বললাম ৮টার দিকে আসতে পারলে মা’কে নিয়ে যেতে পারবে … ৮টা সময় মা বের হবার আগে আবার ঘুম থেকে উঠে উনাকে ফোন করে আসতে বললাম … এরপর আবার দশটা পর্যন্ত একটা হাল্কা-পাতলা ঘুম দিয়ে উঠলাম …  এদিকে সকালে উঠে নাস্তা-টাস্তা খেয়ে বসলাম যে একটু কোয়েশ্চেন পেপারের কিংবা রিভিশন ওয়ার্কশিটের কাজ করি … এর মধ্যেই কি মনে করে একজনকে নক করলাম তার খবর জানতে চেয়ে … কিছুক্ষণ পর উত্তর আসলো ‘ঘুমাই। বিরক্ত কোরোনা’ … এরকম উত্তর পেয়ে আমার কেমন জানি প্রথমে মেজাজ খারাপ তারপর খুব মন খারাপ হয়ে গেলো … ভাবতে চেষ্টা করলাম যে উনার সাথে কি এমন কিছু হয়েছে বা আমি এমন কিছু করেছি যে উনি আগেরদিন রাতেও আমাকে একটু অ্যাভয়েড করে গেছেন, আবার সকালে এরকম উত্তর দিলেন … আগের দিন দুপুরেও তো দেখা হলো, ভালোই কথাবার্তা হলো … তখন ধরে নিলাম উনার ব্যক্তিগত কোনো বিরক্তির অনুভূতি আমার ওপর রিফ্লেক্ট করেছেন উনি … তাতে আরও খারাপ লাগলো আমার … উনি তো এভাবেও বলতে পারতেন যে ‘ভালো নেই। পরে কথা বলবো’ … নক করলে সেরকম উত্তর উনি প্রায়ই দেন … আমিও সেটা সহজভাবেই নেই … কিন্তু কালকের ওই ‘বিরক্ত করোনা’ কথাটাই কেমন গায়ে লেগে গেলো … তো ওই কথা হজম করতে না পেরে আমার যাবতীয় কাজ করার মুড চলে গেলো … খুব কান্না পেয়ে গেলো … কাঁদতেও শুরু করলাম হঠাৎ করেই … আমার আবার এই এক জ্বালা! একটা কারণে মন খারাপ হলে সেখান থেকে ডালপালা গজায় দুনিয়ার তাবৎ মন খারাপের অনুভূতিগুলো ফিরে আসে … মনে হয় যে এই যে ঘটনাটা ঘটলো, এইটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না … আসলে যা যা মন খারাপ করার মতো ঘটনা ঘটে সেগুলা সবই কোনো না কোনো একটা শাস্তির অংশ … ব্যাপারটা এমন যে আমি কখনোই কোনোকিছু নিয়ে ভালো অনুভব করতে পারবো না … তাহলেই সাথে সাথে সবকিছু বিগড়ে যাবে … মনে হলো যে মাঝখানে কয়েকটা দিন বেশ সন্তুষ্ট মন নিয়ে ছিলাম … আর সেজন্যই বোধহয় শেষ ৩/৪টা দিন ধরে সবই বিগড়ে যাচ্ছে … স্কুলের কাজ … অন্যান্য কাজ … টাকা-পয়সা… শরীর … মন … এটা … সেটা … সব …

মন-মেজাজ খুব খারাপ হয়ে যাওয়ার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে চোখ ফেটে কান্না আসা … তো কাঁদলাম … কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেলাম কখন … দুপুরে একবার হঠাৎ ঘুম পাতলা হলো, দেখলাম মা ফিরেছে … ইতিমধ্যে টের পেলাম প্রচণ্ড ভারী হয়ে গেছে মাথা … মাথা ব্যথা টের পেয়ে আবার ঘুমিয়ে গেলাম … দ্বিতীয়বার যখন ঘুম পাতলা হলো তখন টের পেলাম প্রমা আর লালাম এসেছে … প্রমা আমাকে ডাকলোও মনে হয় এক-দুইবার … আমি আরেকটু ঘুমাবো চিন্তা করে উঠলাম না … কিছুক্ষণ পর উঠে গোসল করলাম … তখন মাথা ব্যথা কিছুটা কমলো … শরীরের ঝিম মারা ভাবটাও একটু কমলো … লালাম আমার জন্য আলু ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা করে এনেছিলো … ওই দিয়েই ভাত খেলাম … আর কিছু খেতে ইচ্ছা করলো না … খেয়ে-দেয়ে এসে বসতে বসতে কিছুক্ষণ পর মনে হলো আবার মাথা ভার হয়ে যাচ্ছে ব্যথায় … চোখ ঝাপ্সা হয়ে আসছে … কেমন ঘামছি … মনে হলো প্রেশার-টেশার বেড়েছে বোধহয় … কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম … প্রমা পাশে বসে বই পড়ছিলো … মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘দীপু নাম্বার টু’ … ওকে বলছিলাম উঠে রেডি হবার জন্য, তাহলে ছাদে যাবো, ছবি-টবি তুলবো … এদিকে আমরা রেডি হয়ে সারতে না সারতেই আকাশ কালো করে এলো … টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিলো কিছুক্ষণ … তখন বারান্দায় দাঁড়িয়েই কিছু ছবি-টবি তুললাম দুইজন মিলে … এরপর শুরু হয়ে গেলো কালবৈশাখী … গতকাল আমার ভিজতে ইচ্ছা করছিলো খুব… যদি ছাদে থাকতাম, আর সেসময় বৃষ্টি আসতো, তাহলে ঠিক ভিজতাম … ভিজতে ভিজতে আবার কাঁদতাম …

গেলো আর কি একটা যেমন তেমন বৈশাখ … আমার একটা মৃদু ইচ্ছা ছিলো যে ভোরবেলা এবার বুয়েটে যাবো … ওখানের আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট-এর বৈশাখের আয়োজন, আলপনা এসব দেখে বাসায় চলে আসবো … কিন্তু গতপরশু রাতে বাসায় ফেরাটা একটু হেক্টিক হয়ে গেলো … ফলে সকাল সকাল বের হবার ইচ্ছা, এনার্জি দুইটাই চলে গেলো … পরশু সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম যাত্রা বিরতিতে, সর্বনামের পারফরমেন্স ছিলো, সেখানে। তো রাত ১১টা পর্যন্ত ওদের পারফরমেন্স চলার কথা ছিলো … কিন্তু সাড়ে ৯টাতেই প্রোগ্রাম শেষ করে দিতে হলো … ঘণ্টাখানেক যেতেই … ইলেক্ট্রিসিটি চলে গিয়েছিলো, এর মধ্যেই গান হচ্ছিলো … পরে জানা গেলো যে পাওয়ার ট্রান্সমিটার বার্স্ট করেছে বাইরে বা এমন একটা কিছু … ওই বিল্ডিং-এরই কোন অংশে নাকি একটু আগুনও লেগেছে … সম্ভবত পাওয়ার জেনারেটর যেখানে ছিলো ওখানে … উপরে মেলা হচ্ছিলো, সেখানকার সবাই নাকি নেমে গেছে … ভেতরে গানের প্রোগ্রামে যারা ছিলাম, আমরা কেউই সেই হুড়াহুড়ি টেরই পাইনাই … তো একজন এসে জানানোর পর প্রোগ্রাম শেষ করে দেয়া হলো … তখন বাজে রাত সাড়ে ৯টা … হঠাৎ প্ল্যান হয়ে গেলো মানিক মিয়া এভিন্যু যাবে সবাই … ওখানে আল্পনা আঁকা হয় প্রতি ১৩ এপ্রিল রাতে … যেহেতু সাথে ইন্সট্রুমেন্ট আছেই, ঠিক হলো যে সেখানে গিয়ে একটু গান-বাজনাও করা হবে … দলে দলে ভাগ হয়ে রওনা দেয়া হলো … সুমন ভাই, ফারহিন, সন্ধি আর আমি একদলে পড়লাম … ফারহিন একটা উবারের গাড়ি ডেকেছিলো, সেটাতে করে রওনা দিলাম … কিছুটা রাস্তা যাবার পরেই বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা টায়ার পোড়া গন্ধ নাকে আসছিলো … প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে আসতে না আসতে সেই গন্ধ তীব্রতর হয়ে গেলো। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে চেক করে জানালো যে ডান দিকের পেছনের চাকা পাংচার হয়ে গেছে! … এই গাড়ি যার যাবে না … উনার কাছেও স্পেয়ার চাকা নাই যে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে সেটা লাগিয়ে নেবে… প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের রাস্তাটা এমনিতে নির্জন, তারমধ্যে ওইখানে সিএনজি পাওয়া খুব টাফ … তো আরেকটা উবারের গাড়ি ডাকা হলো … এমনিতেও তো আমরা চারজন, সুমন ভাইয়ের মেয়ে সহ পাঁচজন … একটা সিএনজি করে তো এমনিতেও সবার যাওয়া সম্ভব না … এদিকে উবারের দ্বিতীয় গাড়ি আসতে আসতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের দুই গার্ড আমাদের সাথে হম্বিতম্বি শুরু করলো যে এখানে দাঁড়ানো যাবে না … সামনে যান …ওইদিকে যান … এইদিকে দাঁড়ান এইসব … তো যাই হোক, গাড়ি আসলো … এসব করে মানিক মিয়া এভিন্যু যখন পৌঁছালাম আমরা, তখন অলরেডিই প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে … গান-টান গাওয়ার উৎসাহে এমনিতেই সবার ভাঁটা পড়েছে … মানিক মিয়া এভিন্যুর রাস্তার খামারবাড়ি প্রান্ত থেকে লালমাটিয়া প্রান্ত হেঁটে হেঁটে যেতে যেতে যা এক-দুইটা গানবাজনা হলো … এদিকে রাত বারোটা পার হয়ে গেছে … এত রাতে আমি একা সিএনজি-তে করে বাসায় ফেরার সাহস পাই না … আবার আমার ফোনে এখন উবারও কাজ করে না … আমি পড়লাম ফাঁপরে … সুমন ভাইরা তাড়াহুড়া করেই চলে গেলো … ওরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে হয়তো ফারহিনের ফোন থেকে একটা উবারের গাড়ি ডাকা যেতো … কিন্তু ওদের নিজেদেরই বাসা সেই যাত্রাবাড়ি … আমার জন্য অপেক্ষা করার মানে হয় না … শেষে রুপু বললো ওর ফোনে উবার আছে, কিন্তু নেট-এর ডাটা কম … তাও চেষ্টা করছে … তো ওর ফোনেই একটা গাড়ি পাওয়া গেলো … তবে সেই গাড়ি লালমাটিয়া আড়ং-এর পাশে … আমার হয়তো খামার বাড়ি সাইড থেকে গাড়ি পেলে সুবিধা হতো, কারণ ওই লালমাটিয়ার মাথায় দাঁড়িয়েই আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম যে মিরপুর ১ নাম্বারের দিকের রাস্তাটা পুরাই প্যাকড … যেহেতু একটা গাড়ি পাওয়াই গেছে, এটাকেই যক্ষের ধন মনে করে রাইড কনফার্ম করলাম … আমরা যেখানে ছিলাম, সেখান থেকে গাড়ি একটু পেছনের দিকে ছিলো … আমি গাড়িতে না ওঠা পর্যন্ত রেজা আর রুপুকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এটাও কেমন লাগছিলো … তো আমি রুপুর কাছ থেকে শোফার-এর নাম্বার নিয়ে নিজেই গাড়ির দিকে চলে গেলাম … গাড়ি না নড়ুক, অন্তত গাড়িতে উঠে বসতে পারলে তো শান্তি! … তো যাই হোক, এমনিতেই তো মানিক মিয়া এভিন্যুর রাস্তা বন্ধ বলে সব গাড়িকে মিরপুর রোডটা দিয়েই যেতে হচ্ছে, তারমধ্যে গণভবনের সামনের রাস্তা অনেকটাই বন্ধ … ফলে টেকনিক্যাল মোড়-এর দিক থেকে যেসব গাড়ি আসছে সেগুলোও যাওয়ার রাস্তাতেই একটা লেন করে আসতে হচ্ছে … ফলাফল হচ্ছে বিশাল পরিমাণ জ্যাম … বাসায় যখন ঢুকলাম তখন অলরেডি সোয়া ১টা কি দেড়টা বাজে … এদিকে সেই সন্ধ্যাবেলা থেকেই প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগে ছিলো … বাসায় যখন ঢুকলাম তখন ঘুমে আর ক্ষুধায় খুব খারাপ অবস্থা …

গতকালকেও সর্বনাম-এর একটা শো ছিলো … শাহিন কলেজ-এ … সকালে ১১টার দিকে নাকি শো হবার কথা … তো, ভোরবেলা বুয়েটে যাবার প্ল্যান যেহেতু মাথা থেকে বাদই দিয়েছিলাম, আমার মনে মনে ইচ্ছা ছিলো সকালে উঠে নোবেল ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করবো, তারপর ওদের শো-তে যাবো, তারপর না হয় সেখান থেকে সবার সাথে মিলে চারুকলা বা বুয়েটের দিকে ঢুঁ মেরে আসবো … অন্তত অমিত তো কালকে সর্বনামের সাথে বাজিয়েছে … ওর সাথেই বুয়েটে চলে যেতে পারতাম … এবার আর্কিটেকচারের বৈশাখী আয়োজনের থিমটা দেখে খুব উৎসাহী হয়েছিলাম যাবার জন্য … রূপকথার থিমে এবার নাকি ওরা কাজ করেছে … দেখতে ইচ্ছা করছিলো কেমন হয় সেটা … চাঁদের বুড়ি … হাউ মাউ খাউ রাক্ষস … রাজপুত্র … রাজকন্যা … ছবি দেখেও খুব ভালো লাগলো … কিন্তু সকালবেলা মেজাজ খারাপের ফলাফল হলো এই যে সবকিছুরই আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম …  

গতপরশু’র এই ধকল, সকালবেলার ঘুমের ব্যাঘাত, অসহ্য মাথা ব্যথা আর মন খারাপের মন সবকিছুরই বারোটা বাজিয়ে দিলো … না স্কুলের একটা খাতা দেখলাম, না ওয়ার্কশিট বানালাম, না কোয়েশ্চেন পেপার রেডি করলাম … পুরাই জগাখিচুড়ি অবস্থা … আজকে স্কুলে গিয়ে প্রথম হাফে তিন সেট খাতা দেখলাম … আর লাস্ট হাফে তো টানা ক্লাসই নিলাম … এদিকে আমি গত সপ্তাহের শেষে লেসন প্ল্যানের খাতা, বই কিছুই নিয়ে আসি নাই বাসায় … শুক্রবার ক্লাস থেকে ফেরার পথে নিয়ে আসবো ভাবছিলাম … ধানমন্ডি ৭ নাম্বার গেলাম পর্যন্ত … ভাবলাম অর্চার্ড পয়েন্টে দর্জির দোকানে কাজ শেষ করে স্কুল থেকে বই-খাতাগুলো নিয়ে নিবো … ইচ্ছাই করলো না … অর্চার্ড পয়েন্টে কাজ শেষ করে সোজা সিএনজি নিয়ে বাসায় চলে আসলাম … বই থাকলে অন্তত বাসায় বসে হাতে লিখে কিছুটা রাফ করে রাখা যেতো রিভিশন ওয়ার্কশিটগুলোর … খুব স্লো হয়ে যাচ্ছি ইদানীং স্কুলের কাজগুলাতে … খালি মনে হচ্ছে আর কতদিন ক্লাস করাতে হবে? … পরীক্ষাটা শুরু হয়ে যাক, অন্তত কিছুদিনের জন্য ক্লাস নেয়া থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে … ক্লাস নেয়ার ব্যাপারটা কেমন মনোটোনাস হয়ে যাচ্ছে …

আজকে শাড়ি পরবো বলে ভেবেছিলাম … এমনকি শাড়ি-ব্লাউজ সব রেডি করেও রেখেছিলাম … কালকে স্কুলের বৈশাখী মেলায় সবাই একরকম শাড়ি পরবে, স্কুল থেকেই করা হয়েছে সেই শাড়ি। একেবারেই সিম্পল ব্লকের শাড়ি, তাও আবার আহামরি কোনো ডিজাইন না … সবাই মিলে পড়বে, আমাকেও পরতে হবে … ফলে আজকে নিজের ইচ্ছামতো শাড়ি পরে যাবার প্ল্যান ছিলো … এবার একদিন আড়ং-এ গিয়ে একটা শাড়ি খুব পছন্দ হয়ে গেলো … সেটা কিনেও ফেললাম … আবার সেটার জন্য আলাদা করে ব্লাউজও বানালাম … সেই ব্লাউজের হাতটা সামান্য টাইট করে ফেলেছিলো, সেটাও কালকে আবার দর্জির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ঠিকও করিয়ে আনলাম … কিন্তু আজকে আর আমার শাড়িই পরতে ইচ্ছা করলো না … এদিকে কালকে স্কুলে খাওয়া-দাওয়া হবে … বৈশাখের খাওয়া-দাওয়া, সেটা সবসময় ভাত-ভর্তা-ভাজি এসবই হয় … এবার নাকি পোলাও হবে … পোলাও শুনেই খাওয়ার আগ্রহও চলে গেলো … পোলাও-বিরিয়ানি জাতীয় খাবারগুলো কেন জানি আমার খুব একটা ভালোই লাগে না … আজকে পোলাও-এর কথা শুনে আমার ‘যাবো না! যাবো না’ রিঅ্যাকশন দেখে ময়না আপা মজা করে জিজ্ঞেস করছিলো, ‘তাহলে বিয়েতে কি  করবি?’ … আমি আবার বলছিলাম যে ‘ভুল করে যদি কোনোদিন বিয়েটা করেই ফেলি, তাহলে ভাতের আয়োজনই থাকবে …’ … ময়না আপা আবার যোগ করলো, ‘ ছেলে থাকবে তো নাকি এসব দেখে পালাবে?’ … তো আমি আবার মজা করছিলাম যে ‘আরেহ, বিয়েতে ভাতের আয়োজন করতে চায় এইরকম ছেলে পাইনা দেখেই তো বিয়েটা করতে পারছি না …’ … তো এইসব হাসিঠাট্টা করতে করতে মনে হলো যে আসলেই আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি বলতে তো ভাত আর নানা পদের তরকারির আয়োজনটাই বোঝায় … অথচ ইদানীং কাচ্চি বিরিয়ানি না হলে বিয়ের খাবারের আয়োজনই নাকি জমে না! … আমার ভালো লাগেনা পোলাও-বিরিয়ানি খেতে …

অনেকদিন পর দিনযাপন লিখতে বসলে হঠাৎ খুব খেই হারিয়ে ফেলি … মাঝখানে অনেককিছু ঘটে যায়, সেগুলোর তো আর আপডেট হয় না … অনেক অনেক কথা, অনেক অনেক ঘটনা কখনো কখনো হারিয়েও যায় … যখন দিনযাপন লিখতে বসি, তখন আর সেগুলো মেনশনই করা হয় না …

একটা অফটপিক প্রসঙ্গ যোগ করে দেই … এবার ফরাসি ভাষার ক্লাসে আমরা টিউটর হিসেবে পেয়েছি মসিঁয়ু আকবর-কে। উনি মজার মানুষ। যদিও ক্লাসে রাজনীতি নিয়ে একটু বেশিই কথা বলেন আর মাঝে মাঝেই রাজনীতির প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত মতামত বেশ ঢালাওভাবে দিয়ে দেন, সেটুকু বাদ দিলে উনি যেভাবে পড়াচ্ছেন তা ভালোই লাগছে … উনি মনে হয় না বই-টই খুব একটা ফলো করেন … নিজের মতো করেই এটা-ওটা প্রসঙ্গ ধরে গ্রামার বোঝান, ভোকাবুলারি যোগ করেন … অন্তত গত সেশনের মসিঁয়ু ইফতখারের ক্লাসে মতো বোরিং না মোটেই … এবার আমাদের রেজাল্ট নিয়ে এতই অনিশ্চয়তা ছিলো যে কেউই রেজাল্ট দেয়ার আগে ভর্তি হইনাই … এদিকে এবার রেজাল্টও দিলো খুব দেরিতে … ৩১ তারিখ জরিমানা ছাড়া ভর্তির শেষ দিন ছিলো, রেজাল্টও দিলো সেদিন দুপুরেই … পরে রেজাল্ট পেয়ে সবাই আলিয়ঁসে গিয়ে ভর্তি হয়ে আসলাম … এদিকে আমি এবার টাকা দেয়ার ডেডলাইনও মিস করলাম … মানে, ভর্তি হবার পরের তিন ওয়ার্কিং ডে’র মধ্যে টাকা দিতে হয় … আমি রিসিড নিতে ভুলে গেলাম পর পর দুইদিন, পরে সময় পাড় হয়ে গেলো … আবার আলিয়ঁসে গিয়ে নতুন করে রিসিডে সিল দেওয়ায় একেবারে ক্লাস শুরু হবার আগের দিন গিয়ে টাকা দিলাম … অলরেডি তখন আমার কাছে মেসেজ চলে এসেছে যে আমার টাকা ডিউ আছে, সময়মতো না দিলে ভর্তির রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যাবে! … কি সব যন্ত্রণা! …

এদিকে আমার মনে হয় আর বেশিদিন নাই যে আমি শুনবো বা দেখবো আমার আশেপাশের সব অবিবাহিতরা বিয়ে করে ফেলেছে আর সব বিবাহিতদের বাচ্চা-কাচ্চা হয়ে গেছে … আর আমি মনে হয় তখনও এরকমই থাকবো … মনে মনে ভাববো কখনো কেউ একজন নিজের গরজে আমার সাথে মিশতে চাইবে, তখন আমি তার সাথে মিশবো … কিংবা কেউ নিজে থেকে আমাকে বিয়ে করতে চাইবে, তখন আমি বিয়ে করার কথা ভাববো … এইসব ভাবতে ভাবতেই বোধহয় আমার বছরের পর বছর চলে যাবে … খুব একা লাগে ইদানীং … চারপাশে এত মানুষ … সারাদিন এত এত মানুষের সাথে থাকি … কত মানুষের সাথে কথা বলি … তবু একাই লাগে … এই একাকীত্ব দূর হবার ওষুধ কি কে জানে! … মরে যাওয়া একটা উপায় হতেই পারে … কিন্তু আমার মনে হয় না আমি এত সহজে মরবো! … আমি খুব চাই যে আমি বেশিদিন বাঁচবো না … মনে হয় যে এখন জীবন যেভাবে চলছে এভাবে আর দুই/চার বছরের বেশি বাঁচার মানে হয় না … খুব মনোটনাস জীবন … এত মনোটনি ভালো লাগে না …

ধুর! এই মুহুর্তে দিনযাপন লিখতেও মনোটনাস লাগছে … মাথা ব্যথাও চরমে … গরম দুধ খাচ্ছি, ওভালটিন দিয়ে … এর রিঅ্যাকশন কি হয় দেখা যায় …

প্রেশার বেড়ে-টেড়ে স্ট্রোক করে ঘুমের মধ্যে মরে-টরে গেলে ভালোই হইতো মনে হয় … কেন যে মরি না! … দুনিয়াতে প্রতিদিন কত মানুষ মরে যায় … আমারই কিছু হয় না! …  

    

Advertisements

দিনযাপন । ২৩০৩২০১৮

বসেছিলাম স্কুলের সামনের তিন সপ্তাহের লেসন প্ল্যান করতে … একটা ক্লাসে দেখলাম এক্সট্রা ক্লাস নিলেও একেবারে নাকে-মুখে সিলেবাস শেষ হবে … আরেকটা ক্লাসে দেখলাম সিলেবাস অন্তত দুই সপ্তাহ আগে তো শেষ হবেই, প্রজেক্ট করিয়ে, মুভি-টুভি দেখিয়েও হাতে একটা বাড়তি সপ্তাহ থেকে যাবে! … দুই ক্লাসের এই আকাশ-পাতাল তফাৎ দেখে পরের ক্লাসগুলার লেসন প্ল্যান করার ইচ্ছা আজকের মতো চলে গেলো … এমনিতেও গত ৩/৪ দিন ধরেই দিনযাপন লিখতে বসবার ফুরসৎ খুঁজছিলাম … তো আজকে একটু সময়-সুযোগ পেয়ে গেলাম …

গত একমাসের মধ্যে এত এত ছোটবড় ব্যাপার-স্যাপার ঘটেছে যে নিজের ব্যাপারে আপডেট দেয়ার অনেককিছু জমেছে … কিন্তু একদিনের এক দিনযাপনে সবকিছুর প্রসঙ্গ আনা হবে না ফর শিওর … তারপর আবার কবে দিনযাপন লিখবো কে জানে! … ফলে অনেককিছু হয়তো কালের গর্ভে হারিয়েই যাবে! … যাই হোক, যা যা বক্তব্য, সেগুলো একটুআধটু শুরু করি … ধরা যাক আজ-কাল-পরশু ঠাস্‌ করে মরে-টরে গেলাম … তো আজকের দিনযাপনটা যেন অন্তত বিগত একমাসের হাইলাইট হিসেবে থাকে! …

তবে, দিনযাপন লিখতে তো শুরু করলাম ঠিকই, কতক্ষণ শরীরে কুলায় সেটাও হচ্ছে কথা … ও হ্যাঁ, শারীরিক অবস্থা নিয়ে আপডেট দেয়াটা জরুরি … মরে গেলে এটাও একটা কারণ হতে পারে যে বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়েও আমি গতানুগতিকভাবে কাজ-কর্ম এবং পরিশ্রম করেই গেছি … যেখানে নাকি আমার অন্তত এক সপ্তাহ হলেও সবকিছু থেকে কমপ্লিট ছুটি নিয়ে বাসায় শুয়ে-বসে রেস্ট নিয়ে নিজেকে একটু হলেও শারীরিক এবং মানসিকভাবে চাঙ্গা করে তোলার চেষ্টা করার কথা … গতমাসের শেষের দিকে নাকি মাঝামাঝি খেয়াল নাই, সারা গায়ে হঠাৎ র‍্যাশ উঠে গেলো … একরাতের মধ্যেই লাল হয়ে জায়গায় জায়গায় ফুলে, চুলকিয়ে-টুলকিয়ে শেষ … অ্যালাট্রল খেয়ে তাও কিছুটা অবস্থার উন্নতি হলো … কিন্তু বাম হাতের এক জায়গায় ফুসকুড়ির মতো উঠে কেমন অনেকটা জায়গা জুড়ে সেগুলো ছড়িয়ে যেতে থাকলো … এদিকে সেইসময় স্কুলে সায়েন্স ফেয়ারের কাজের ধুন্ধুমার ব্যস্ততা … মরারও সময় নাই তখন … তো হাতের ওই অবস্থা নিয়েই ঘুরলাম … বুঝতে পারছিলাম যে এইটা হয়তো সাধারণ অ্যালার্জি না, কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাবারও সময়-সুযোগ পাওয়া যাচ্ছিলো না … তো এই মাসের ৪ তারিখে সায়েন্স ফেয়ার হলো, পরদিন রবিবারে বিশ্রামের জন্য একদিন ছুটি পাওয়া গেলো … ওইদিন গেলাম ডাক্তারের কাছে … প্রথমে প্রেশার মেপে দেখা গেলো ৯০/১৩০ … আমার প্রেশার এ যাবৎকাল পর্যন্ত লো-ই ছিলো, এই প্রথম হাই প্রেশার পাওয়া গেলো … তো ডাক্তার অবস্থা দেখে-শুনে কিছু ব্লাড টেস্ট দিলেন … সেগুলোর রিপোর্ট নিয়ে যাবার পর ইএসআর পাওয়া গেলো ৪৩, হিমোগ্লোবিন ৯, প্লাটিলেট ৭৬, আর অ্যালার্জির জন্য যেই টেস্ট দিলো, সেটাতেও যেই এলিমেন্টটা বেশি থাকলে অ্যালার্জি বলে ধরা হয় সেটাও অনেকটাই হাই পাওয়া গেলো … এসজিই টেস্ট না কি যেন, সেখানে কি একটা জিনিস সাধারণত ১৫০ এর মতো থাকার কথা, আমার আছে ৩৩০ … তো হিমোগ্লোবিন অনেক কম, প্লাটিলেট হাই এসব দেখে ডাক্তার আরও কতগুলা টেস্ট দিয়ে দিলেন … সেগুলো করার পর পাওয়া গেলো সাধারণত যেখানে একজন সুস্থ মানুষের রক্তে আয়রন লেভেল থাকার কথা ৮ (মেয়েদের ক্ষেত্রে ১১), সেখানে আমার রক্তে আয়রন লেভেল ৩! … ডাক্তার বলেই দিলেন, ‘আপনার শরীরে তো আয়রনই নাই!’ … এদিকে, মজার ব্যাপার হলো, লিপিড প্রোফাইলের টেস্ট দিয়েছিলেন ডাক্তার … দেখা গেলো কোলেস্টেরল লেভেল মার্জিনের চেয়ে যথেষ্টই কম, এদিকে রক্তে যেটুকু পরিমাণ ফ্যাট থাকার কথা সেটাও কম! …

তো শরীরের ব্যাপারে কিছু কিছু জিনিস এবার আমার একটু পরিষ্কার হলো … এই যে কিছুক্ষণ বসে কাজ করলেই আমার সারা শরীরের কোণায় কোণায় ব্যথা করতে থাকে, পিঠ-কোমর শক্ত হয়ে যায়, সেটার অন্যতম কারণ এই সিভিয়ার আয়রন ডেফিসিয়েন্সি … এই যে আমি প্রতিদিন বেশ ফোলা ফোলা হাত-পা-মুখ নিয়ে বাসায় ফিরি আর তারপর কোনোমতে একবার বিছানায় গড়ায় পড়তে পারলে আর উঠতে পারি না, এইটাও এই আয়রন ডেফিসিয়েন্সির কারণে … এই যে মাঝে মাঝেই আমার খুব অদ্ভুত একটা ট্র্যান্স-মোডে চলে যাওয়া টাইপের মাথা ব্যথা হয়, এইটাও ঘুরে ফিরে একই শারীরিক কারণে … শরীরের ইমিউন সিস্টেমের যা-তা অবস্থা হয়ে যাচ্ছে দিন দিন … সম্ভবত সেটার সাথেও এই একই কারণ জড়িত … মোট কথা, এখন আমার অবস্থা হচ্ছে এই যে আমার শরীরের শক্তি বলতে কিছু নাই, অল্প একটু হাঁটলেও হাঁপিয়ে যাই, টানা কিছুক্ষণ কথা বললেও হাঁপিয়ে উঠি, একটানা কাজ করলে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে, হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় মাথা ঘুরে পড়েই যাবো … এমনিতে এইসব সিম্পটম খুব চোখে পড়ার মতো ছিলো না, কিন্তু থ্যাংকস টু সায়েন্স ফেয়ার যে শরীরের কলাপ্স করার যাবতীয় ব্যবস্থা ওই সময়কার শেষ ১০/১৫ দিনের পরিশ্রম করে দিয়েছে …

যদিও আমাকে দেখে অনেকেই এই মন্তব্যও করেছে যে ‘কই, তোমাকে দেখে তো মনেই হয় না অসুস্থ!’ ‘আয়রন লেভেল এত কম হলে তো তোমার দাঁড়িয়েই থাকতে পারার কথা না!’ … আমি এইসব কথার আর উত্তর খুঁজে পাই না!

সায়েন্স ফেয়ারটা অনেকদিক থেকেই সিগ্নিফিকেন্ট … এখন হঠাৎ হঠাৎ মনে হচ্ছে এটা না হলেই বোধহয় ভালো হতো! সায়েন্স ফেয়ারের সময় এত স্ট্রেস নিয়েছি যে তার বদৌলতে দুইটা ব্যাপার ঘটেছে । এক, শরীরের এই যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়েছে … দুই, স্কুলের যাবতীয় কাজকর্মের প্রতিই একটা বীতশ্রদ্ধভাব এসে গেছে! … এখন একমাত্র ক্লাস নেয়া ছাড়া আর কিছু করতে হবে ভাবলেই বিরক্তি চলে আসে … এমনকি সায়েন্স ফেয়ারটাও শেষ হয়েছে, তারপর থেকেই সেটার সাথে আমার সকলরকমের অ্যাটাচমেন্ট আমি বাদ দিয়ে দিয়েছি … এমনকি ওইদিন সায়েন্স ফেয়ারে যারা বিজয়ী হয়েছে তাদের মেডেল-টেডেল দিলো, সায়েন্স আর জিওগ্রাফি টিচারদের ডাকলো বাচ্চাদের সাথে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য, আমি গেলাম না … যেতেই ইচ্ছা করলো না … এই যে আজকে প্যারেন্টস টিচার্স মিটিং ছিলো, সেটার অ্যাসেসমেন্ট শিট লিখতে হচ্ছে এটাও মনে হলো যে কেন লিখছি? ক্লাসের বোর্ড সাজানোর কাজ করতে এবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাই করলো না আমার … এমনিতেও এবার সায়েন্স ফেয়ারের কাজেই যেহেতু অনেকটা সময় বাচ্চাদের ইনভলভমেন্ট ছিলো, আর সেখানে সায়েন্স আর জিওগ্রাফি নিয়েই কাজ ছিলো, তাই আলাদা করে এসব সাবজেক্টের কাজ হয়নাই … অন্য সাবজেক্টের টিচাররাও কেন জানি ক্লাস টিচাররা না বললে কখনো নিজেরা গরজ করে এটা-সেটা কাজ করায় না … আবার আমি যেই ক্লাসের ক্লাস টিচার সেই ক্লাসের বাচ্চারাও কেমন জানি! … এরা নিজেরা এবং এদের বাবা-মায়েরা ‘পরীক্ষা ওরিয়েন্টেড’ পড়ালেখা নিয়ে এতই সিরিয়াস যে বাচ্চা নিজের উৎসাহে ছবি আঁকে সেটাও অনেকে সময় নষ্ট মনে করে! … তো আমি এমনিতে গত টার্মে মাঝে মাঝেই এটা-সেটা প্রসঙ্গে বাচ্চাদের বলতাম যে তোমরা নিজেরা কিছু এঁকে বা লিখে আমাকে যখন-তখন দিয়ে রাখবা, আমি বোর্ডে লাগিয়ে দেবো … দেখলাম এরা খুব একটা গরজ করে না … তো এই টার্মে আর বললাম না … ইদানীং অনেক কিছুতেই আর আগের মতো ‘দায়’ বোধ করি না … এই যেমন আজকে আমার ক্লাসের বোর্ডে বাচ্চাদের কাজ বলতে ওদের আর্ট ক্লাসের কিছু ছবি ছাড়া আর তেমন কিছুই যায়নি … আমি এটা বদারই করলাম না … কাজ না থাকলে নাই, আমার কি, ক্লাস টিচার হয়েছি বলে কি সব আমার ঠ্যাকা নাকি টাইপ একটা ভাব নিয়ে বসে থাকলাম … অথচ আমার মনে আছে যে গত বছর অক্টোবরে যখন প্রথম কোয়ার্টারের অ্যাসেসমেন্ট হলো, তখন নিজে রাত ৯টা পর্যন্ত থেকে এটা-সেটা লাগিয়ে বোর্ড ভরিয়েছি … এবার ইচ্ছাই করলো না …

অবশ্য ইচ্ছা না করার পেছনে আমার রিসেন্ট বীতশ্রদ্ধভাবও দায়ী …

আমার এই টার্মটার ওপর থেকে মনই উঠে গেছে … খালি মনে হচ্ছে এইটা শেষ হয়ে যাক … আর ভালো লাগছে না … এবার এই ফাইনাল টার্মটার শুরু থেকেই সবকিছু এমন হচপচ হচপচ অবস্থায় যাচ্ছে যে এখন মনে হচ্ছে গা ছাড়া দিয়ে বসে থাকি … বেশি অগোছালো হয়ে গেছে সবকিছু … আর অগোছালো কোনোকিছু নিয়ে আমি কাজ করতেই পারি না … এবার যেটা হচ্ছে, একটা কিছু পড়াচ্ছি, একটা/দুইটা সপ্তাহ পাড় হয়ে ফ্লো-টা আসছে, আর তারপরেই কোনো না কোনো ইভেন্টের কারণে কয়েকদিন ক্লাস-টাস হ্যাম্পার হয়ে যাচ্ছে … আবার আস্তে আস্তে গিয়ার আপ করতে করতেই হঠাৎ সিগন্যালে গাড়ি থামিয়ে দেবার মতো আরেকটা ইভেন্ট … এই চলছে … এইদিকে সিলেবাসও যা দিয়েছি তাই-ই পড়াতে হবে, কিছুই কমানো যাবে না … সো ক্লাস হ্যাম্পার হলে সিলেবাস ঠিক রাখার জন্য ক্লাসগুলোও মেকআপ করে নিতে হচ্ছে … আর এই সবকিছুর মাঝখানে সায়েন্স ফেয়ারটা তো মোটামুটি ইতিবাচক উত্তেজনা থেকে আস্তে আস্তে গলার কাঁটায় রূপ নিলো … টিচার্স রুমের পরিবেশটাও এখন কেমন দমবন্ধ করা লাগে … আর সেই দমবন্ধ অবস্থার প্রকাশনাটা হয় বিরক্তি আর অসহিষ্ণুতায় … মনে হয় যে সবাই-ই কেমন কমপ্লিকেটেড হয়ে গেছে … কেউ কাউকে তার নিজের মতো থাকতে দিতে চায় না … খালি ‘এই নিয়ম’ ‘ওই নিয়ম’ ‘এইটা’ না ‘ওইটা’ … অথচ দিনশেষে দেখা যায় সব জগাখিচুড়ি! … এখন খালি মনে হচ্ছে চোখের পলকে এই টার্মটা কোনোমতে শেষ হয়ে যাক, নেক্সট সেশন থেকে আবার ‘শুরু থেকে শুরু’ করা যাবে …

তবে, কোনো কিছু নিয়ে বেশি বীতশ্রদ্ধভাব তৈরি হলে যা হয় আমার, খুব সামান্য একটা কিছুও তখন খুব গায়ে লেগে যেতে থাকে, আর তারপর আমার সেটা থেকে পুরোপুরিই মন উঠে যায় … এখানেও যদি সেরকম হয় তাহলে হয়তো চাকরি-বাকরি ছেড়ে দিয়েই বসে থাকবো … এমনিতেই এখন চারপাশে চাকরি ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারেই মোটিভেশন বেশি … শরীরের এই অবস্থা নিয়েও বিরতিহীন কাজ করে যাচ্ছি, বাসাতেও মোটামুটি এরকম একটা অ্যাটিচুড যে এই চাকরি করতেই হবে কেন … এদিকে বন্ধু-বান্ধবও যেই শুনছে তাদেরও একই কথা … সেদিন মসিঁয়ু সুমাদ্রিও খুব বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে শরীরের প্রায়োরিটি আগে … সাতদিন/দশদিন ছুটি নাও … নয়তো জব ছেড়ে দাও … তুমি অ্যাডাল্ট মানুষ, তোমার তো নিজেই এটা বোঝা উচিৎ … এভাবে কাজ করতে করতে শরীর আরও খারাপ হলে, আর কাজ করতে না পারলে সেই দায় তো আর স্কুল নেবে না, উল্টা তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আরেকজন রিপ্লেসমেন্ট নেবে … এত যে দায়িত্ববোধ দেখাচ্ছো, কে সেটার মূল্য দিচ্ছে? … আমিও খুব বলার চেষ্টা করছিলাম যে ছুটি নেয়া তো সম্ভব না, আমার পড়ানোটা তো আর কেউ পড়িয়ে দিতে পারবে না … আর স্কুলের চাকরি থেকে কি আর চাইলেই ছুটি নেয়া যায় … নিজেই অনেককিছু বলে চাকরি ছেড়ে দেয়ার সাজেশনগুলো ডিফেন্ড করি বটে … কিন্তু ইদানীং স্কুলে সময়ে সময়ে এমন সব সিচুয়েশন তৈরি হয়ে যায় যে মনে হয় আসলেই চাকরিটা ছেড়েই দেয়া উচিৎ আমার … প্রতিদিন ভাবি যে এক-দুই দিন বসে এমনভাবে সব ওয়ার্কশিট আর প্রশ্ন-টশ্ন রেডি করে ফেলবো যে কোনোদিন যদি খুব মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, মনে হয় যে ‘ধুর বাল, কাজের খ্যাতা পুড়ি’ , আর তারপর যদি সব ছেড়ে-ছুড়ে চলেও আসি, তাও যেন কেউ অকূল পাথারে না পড়ে যে কীভাবে কি করবে! … অথচ আমার শরীরের এখন এমনই অবস্থা যে একদিন পরে কোন ওয়ার্কশিটটা লাগবে সেটাই করার এনার্জি পাই না, আর আগামী তিন সপ্তাহের হ্যান্ডআউট আর ওয়ার্কশিট ! কোন কাজ রেডি না করে দিয়ে চলে আসবো, ভাবলেই তো মনে হয় তাহলে আমার ইম্প্রেশনটা কি হবে? … আবার এটাও ভাবি যে না হয় আমি বাকি সবকিছু থোরাই কেয়ার করে চলে আসলাম, কিন্তু বাচ্চাগুলা? ওদের কেন আমি ডিপ্রাইভড করবো? … আমার সাথে ওদের যেই ফ্রেন্ডলিনেস, যেই সম্পর্ক সেটাকে কীভাবে থোরাই কেয়ার করি? … বাচ্চাগুলোর সাথেই তো আমার কাজ … পড়াই তো ওদেরকেই … ওদের প্রতি আমার একটা অব্লিগেশন আছে না? শালার এই ‘অবলিগেশন’ ফিল করার টেনডেন্সিটা আমার না থাকলে জীবনে মনে হয় অনেক শান্তিতে থাকতাম!

মাঝখান দিয়ে এই অসুস্থতার বদৌলতে যেটা হলো যে দুরন্ত টিভি’র অনুবাদের কাজ যেটা করছিলাম, সেটার সাবমিশন নিয়ে একটু গোলমাল হলো, পরপর দুই/তিনটা এপিসোড খুব দেরি করে দিলাম … ১৩টা এপিসোড করার কথা, প্রথমটা বাদ দিয়ে ৯টা করলাম…শেষে আমার আরও তিনটা বা চারটা এপিসোড করার কথা ছিলো, সেগুলো আমার জন্য অপেক্ষা না করে অন্য একজনকে দিয়ে দিলো … আমি সেটা নিয়ে আসলে কিছু মনে করতে পারলাম না, কারণ এক অর্থে আমিই তো নিজেকে উপর্যুপরি ডিফল্টার হিসেবে প্রমাণ করে যাচ্ছি … আর পুরো ৫২ পর্বের সিরিজের প্রথম ১৩টা এপিসোড আমার করার কথা … ফলে আমার ওপর প্রেশারটাও বেশিই ছিলো … আর আমিও সেই কমিটমেন্টটা রাখতে পারি নাই … আমি নিজেই আবার পরে ‘ভালো হয়েছে এপিসোডগুলো আরেকজনকে দিয়ে দিয়েছেন’ বলে-টলে ভদ্রতা করে রেসপন্স করলাম … বললাম যে আপাতত তাহলে আমি একটা ব্রেক নেই, আমার শরীরের এই এই অবস্থা … তো তরুণ ভাই পরে উত্তর দিলো যে কবে থেকে কাজ শুরু করতে পারবেন আপনিই জানিয়েন … পড়ে গেলাম আরেক অবলিগেশনে! … যাই হোক, এপ্রিলের সেকন্ড উইক নাগাদ আমরা প্রশ্ন-টশ্ন জমা দিয়ে দেবো, রিভিশন ওয়ার্কের কাজ শুরু হয়ে যাবে … ফলে ওইসময় থেকে আবার কাজ দেয়ার জন্য নক দেয়া যেতে পারে …

এদিকে সেদিন মুনির ভাই-ও উনার বইটার জন্য তাগাদা দিলেন … এখন বোধহয় উনি একটু বিরক্তই হয়ে যাচ্ছেন … নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে আমার সাথে সেই বিরক্তিটা প্রকাশ করেন না … আমারও আসলে লজ্জাই লাগে … তিন বছর হয়ে গেলো একটা ১৫০ পৃষ্ঠার বইয়ের অনুবাদ শেষ করতে পারলাম না! … উনি আগামী বছরের ছবিমেলায় বইটা বের করতে চান … আর উনি যেহেতু অনেক সময় নিয়ে বইয়ের কাজ করেন, উনাকে আমার এই বছরের মে মাস নাগাদ আসলে বইটা দিয়ে দেয়া উচিৎ! … তাহলে পরের ৬ মাস উনি উনার মতো সময় নিয়ে বইটার প্রিন্টিং-এর যাবতীয় কাজ করতে পারবেন …

এরকম সময়গুলোতে আরও বেশি করে মনে হয়, চাকরি-বাকরি না করে সারাদিন এসব কাজ করতে পারলেই তো কত ভালো লাগতো!

এদিকে কালকে বাসায় ফিরতে ফিরতে দেখি ডান হাতে আর শরীরের আরও কয়েক জায়গায় চাকা চাকা হয়ে গিয়েছে … সকাল হতে হতে সেগুলো র‍্যাশ-এর রূপ নিয়ে নিয়েছে … প্রতিদিন অ্যালার্জির জন্য ওষুধ খাচ্ছি, তারপরও কেন আবার সেই একই র‍্যাশ ফিরে ফিরে আসলো বুঝলাম না! … আজকে রাতে অ্যালাট্রল খেয়ে দেখবো কি না ভাবছি … না হলে তো আবার ডাক্তারের কাছে যেতে হবে এটার জন্য যে ওষুধেও কাজ হচ্ছে না …

মরেই যাবো মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি … শরীর মনে হয় আস্তে আস্তে ম্যালফাংশন শুরু করেছে …

খুব দমবন্ধ লাগে সবকিছুতেই … মনে হয় কোথাও ঘুরে আসতে পারতাম সব ফেলে রেখে … প্রাচ্যনাট ‘কিনু কাহারের থেটার’ নাটকটা নিয়ে দিল্লি গেছে … আমি আলসেমি করে করে ইন্ডিয়ার ভিসাটা করালাম না ওদের সাথে … না হলে এখন হয়তো ওদের সাথে রওনা দিতাম … বাতাস বদলের জন্য … সামনের সপ্তাহে ল্যাটিচুড লঙ্গিচুড-এর সপ্তম আসর বসবে কক্সবাজারে … গতবার তো ভলান্টিয়ার হিসেবে শেহজাদ ভাইয়ের সাথে কাজ করেছিলাম … সেটা তো ঢাকাতেই হয়েছিল … আর এবার কক্সবাজার … মারমেইড বিচে … পেঁচার দ্বীপে … ক্যাম্পিং হবে … আর্ট হবে … গান-বাজনা হবে … খুব ইচ্ছা করছে যাই … কিন্তু ওখানে একা একা গিয়ে ভালো লাগবে না … যদিও ওখানে গেলে অনেককেই পাওয়া যাবে পরিচিত, তবুও ঢাকা থেকে নিজের একটা দল বা অন্তত একজন কাউকে সঙ্গী করে না নিয়ে গেলে এসব জায়গায় কিছুক্ষণের মধ্যেই বোরিং লাগতে থাকে, নয়তো একা একা লাগে …

এরকম একটা জায়গায় যেতে পারলে আর যাই হোক, বাতাস বদল হতো সেটা শতভাগ সত্যি …

ভুটান যেতে খুব ইচ্ছা করছে … ভুটান এত সুন্দর, এত নিরিবিলি একটা দেশ … ভুটান গেলেই মনে হয় আমার আয়রন লেভেল, হিমোগ্লোবিন সব ধাই ধাই করে বেড়ে গিয়ে ঠিকঠাক হয়ে যাবে! … ওখানে ধুলা নাই, বাতাসে দূষন নাই … ওখানে গেলে আমার সুস্থ হওয়া ঠেকায় কে?

এসব খালি ভেবেই যাবো … যাওয়া আর হবে না … না আছে টাকা … না আছে সঙ্গী …

ধুর, আর লিখবো না আজকে … এতক্ষণ ধরে লিখলাম, এখন হাত ব্যথা করছে … আর টেবিলের ওপরে হাতটা ঠিকঠাক রাখতেও পারছি না … র‍্যাশের জায়গাগুলো ঘষা লাগলেই তো চুলকাচ্ছে … আমি বরং ওষুধ খেয়ে ঘুম দেই … অ্যালাট্রল খেয়ে দেখি … যদি কিছু উন্নতি হয় অবস্থার … না হলে আগামী দুই/তিনদিন ভালোই যন্ত্রণা যাবে এইটা নিয়ে …

যাই হোক, অফ যাই আজকে …         

দিনযাপন । ১৬০২২০১৮

গতকালকে মা বোধহয় সন্ধ্যায় ৮টার দিকে এক মগ চা রেখে গিয়েছিলো টেবিলে … সেই চায়ে এক চুমুক দিয়ে রেখে দিলাম যে মিনিট পাঁচেক পরে খাবো … অনেক গরম … সাড়ে ৯টা বাজে হঠাৎ খেয়াল হলো … ততক্ষণে চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে … ইদানীং এটা খুব হয় … চা নিয়ে বসি … সেই চা জুড়িয়ে যায় … আমার খেয়াল থাকে না … স্কুলেও তাই করি … চা নিয়ে বসি, খাতা দেখতে দেখতে, কিংবা কোনো একটা কাজ করতে করতে আর মনেই থাকে না চায়ের কথা … অগত্যা ঠাণ্ডা চা-ই এক চুমুকে শেষ করি … কি বাজে একটা অভ্যাস বানিয়েছি!

অথচ একটা সময় ছিলো গরম চা ছাড়া খেতেই পারতাম না …

ধুর! … এটা নিয়ে ভাবতে গিয়েই কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো! …

সবকিছুতেই ইদানীং মন খারাপ হয়ে যায় খুব … সকালে উঠতে দেরি হয়ে গেলে … সিএনজিওয়ালা না আসলে … কোন কাপড়টা পরবো সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে … চোখে কাজল দিতে গিয়ে দুই চোখের কাজল সমান না হলে … স্কুলে যেতে দেরি হয়ে গেলে … এটা হলে … সেটা হলে … ছোটোখাটো সবকিছুতেই খুব মন খারাপ করে ফেলি …

মাঝে মাঝে ভাবি, কি করলে এই মনটার ভালো লাগবে? … ভেবে পাই না …

মাঝে মাঝে মনে হয় কোথাও দলবেঁধে খাওয়া-দাওয়া করতে গেলে বোধহয় মন ভালো হবে … কিন্তু সময়-সুযোগ-সাধ্য কি আর সবসময় সবার মিলে? তাই যাওয়া হয় না কারো সাথে …

কখনো মনে হয় সব কাজ বাদ দিয়ে একদিন খালি আড্ডাবাজি করলে হয়তো মন ভালো হবে … সেটাও কি আদৌ সম্ভব? … প্রত্যেকেরই নিজের একটা জগত থাকে, নিজের অনেক ব্যস্ততা থাকে … তাই স্কুলের কলিগ হোক, আলিয়ঁসের কেউ হোক আর গ্রুপের কেউই হোক, আর কেউ … বেহুদা আড্ডাবাজির কারো সময় হয় না …

কখনো কখনো মনে হয় সিনেমা দেখতে গেলে মন ভালো হয়ে যাবে … সিনেপ্লেক্সে কত ভালো ভালো সিনেমা আসে … আবার নেমেও যায় … কারো সময় হয় না তো কারো ইচ্ছা হয় না … আবার কেউ কেউ সিনেমা দেখতে যায়, আমাকে এখন আর বলেও না … তাই আমার আর সিনেমাও দেখতে যাওয়া হয় না … ফার্দিনান্দ দেখার খুব ইচ্ছা ছিলো … কাশফিয়া আপুর সাথে প্ল্যান করতে করতে সিনেমা নেমেই গেলো … জুমানজি দেখার ইচ্ছা ছিলো … যাকেই অ্যাপ্রোচ করলাম সে-ই বললো ‘ভালো হয় নাই নাকি … পয়সা নষ্ট করবো না’ … তাই জুমানজি দেখা হলো না … জাস্টিস লিগ এতদিন ধরে রইলো … সঙ্গি-সাথি নাই দেখে দেখাই হলো না … একটা একটা করে মুভি আসছে আর চলে যাচ্ছে … আমি ‘না-বোধক’ উত্তরটা শোনার ভয়ে কাউকে আর বলিও না … আর কেউ তো নিজে থেকে কখনো আমাকে অ্যাপ্রোচও করে না … মনে হয় আমি খুব বোরিং সঙ্গী … কিংবা খুব বিরক্তিকর … তাই কেউই আমাকে নিজে থেকে গরজ করে কখনো সাথে নিতে চায় না …

এই কেউ আমাকে কখনো নিজে থেকে বলে না যে ‘চলো, এখানে যাই’, এইটা নিয়ে খুব মন খারাপ করেছিলাম কয়েকদিন আগে … তখন আর্ট সামিট চলছিলো … কেবলমাত্র সঙ্গে যাবে এমন কাউকে পেলাম না বলে যাওয়া হলো না আমার আর্ট সামিটে … আর তখন খুব মন খারাপ করে ভাবছিলাম যে একদিনে নাকি প্রায় ৩০/৩৫ হাজার মানুষও ওখানে গিয়েছে … তা ওই ৩০/৩৫ হাজার মানুষের মধ্যেও একজনও নাই যে ভেবেছে যে প্রজ্ঞাকেও বলি যাবে কি না? … আমি নিজে থেকে দুই/তিন জনকে খুব ইতি-উতি করে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছিলাম … তারা বিভিন্ন কারণে ‘না’ করে দিলো … আর আমিও একটা বিশাল মন খারাপের মেঘ ফাটিয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে দুই/তিন নিজেকে খুব শাপ-শাপান্ত করে কাটিয়ে দিলাম …

কখনো কখনো মনে হয় কারো সাথে একনাগাড়ে অনেকটা সময় কথা বললে হয়তো মন ভালো হবে … একদম মন খুলে কথা বলা যাকে বলে … কিন্তু কার সাথে কথা বলবো তাও বুঝে পাই না … কাজ ছাড়া এমনিতে কারো সাথে কথা বলার ব্যাপারে আমি পটু নই, যদি না কেউ নিজে থেকে কিছু জানতে চায় … কিন্তু আমাকে কেউ কখনো খুব একটা হাই-হ্যালো বলেও নক করে না … আমিই উল্টা যেচে পড়ে কখনো কখনো কারো কারো সাথে কথা বলতে যাই … কখনো তারা কথার উত্তর-টুত্তর দেয় … আবার কখনো পাত্তাই দেয় না … আবার আমারই মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যে যেচে পড়ে কারো কারো সাথে ‘কি খবর’ ‘কেমন আছেন’ করি, তারা না আবার ভাবে যে আমি খুব গায়ে পড়ে যাচ্ছি! তখন আমিও কথা বলা কমিয়ে দেই … ৩২ বছর বয়সের একটা মানুষের চিহ্নিত করার মতো কোনো বন্ধু নেই, সব জায়গাতেই কমন থাকবে এমন কোনো সঙ্গী নেই, এমনকি ফেসবুকে, ম্যাসেঞ্জারে কথা বলার মতোও কেউ নেই … এটাকে নিশ্চয়ই কোনো এক ধরণের মানসিক বৈকল্যই বলা যায় … 

এই কয়েকদিন আগেও মাঝে মাঝে মসিঁয়ু সুমাদ্রি অন্তত খুব এনকারেজ করার চেষ্টা করতেন, যখন ফেসবুকে, ইন্সটাগ্রামে কিংবা দিনযাপনে একটু মন খারাপ করা কথা লিখতাম … আলিয়ঁসে দেখা হলেই জিজ্ঞেস করতেন, ‘কি? মন ভালো? এত মন খারাপ করে থেকো না… ইত্যাদি ইত্যাদি’ …  তো, আমিও একটু লাই পেয়ে গেলাম … আর আমার একটু কুকুরের স্বভাব আছে … কুকুরকে যেমন একটু আদর করে দিলে পায়ে পায়ে ঘুরতে থাকে, আমিও তেমন কারো কাছে একটু পাত্তা পেলেই আরও পাবার জন্য লোভী হয়ে যাই… তো, মসিঁয়ু মাঝে মাঝে খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলেন … খুব ইন্সপায়ারিং লাগে … সেইসব কথা শোনার লোভেই আমার যাবতীয় মন খারাপের কথা উনাকে ঢেলে বলতে থাকলাম … তাতে হিতে বিপরীতই হলো … এত ভাল্লাগে না, ভাল্লাগে না বলে ঘ্যান ঘ্যান করলে কারোরই হয়তো ভালো লাগার কথা না! … আর সেখানে কেউ যদি সম্পর্কে এমনকি বন্ধুও না হন, কেবল একটু সহানুভূতির জায়গা থেকে কিছু ভালো ভালো কথা বলেন, তাতেই আমার আশা করা উচিৎ না যে সবসময়ই উনি তাই-ই করবেন, একটুও ধৈর্য হারাবেন না,বলবেন না যে আমার সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং দরকার …

তবে হ্যাঁ, একজন হতাশ মানুষ যখন আরেকজন হতাশ মানুষের সাথে কথা বলে, তখন বোধহয় নেতিবাচক প্রভাবটাই বেশি পড়ে … আর এর চেয়ে ভয়াবহ বোধহয় আর কিছু হয়না! … মাঝে মাঝে মসিঁয়ু সুমাদ্রির সাথে কথা বলতে গিয়ে এটা খুব টের পাই … আমি যেমন উনাকে খুব হতাশার কথা বলি, উনিও মাঝে মাঝে আমাকে বুঝ দিতে গিয়ে নিজেই আমার চেয়ে বেশি হতাশার কথা বলেন … একসময় দেখা যায় কেউই আসলে কারো হতাশাকে প্যাম্পারিং করার চেষ্টা করছি না, বরং নিজের কথাগুলোই এমনভাবে বলছি যে পরস্পরের হতাশাই কেবল বাড়ছে … তখন আবার নিজেরই নিজের ওপর খুব রাগ উঠে … মনে হয় যে কি দরকার আমার উনার সাথে এত হতাশার কথা বলার? … ক্যাজুয়াল হাই-হ্যালো, কেমন আছেন তাই-ই তো ভালো ছিলো … কারো সাথে সরাসরি নিজেকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই তো একটা এক্সপেকটেশন তৈরি হয় যে শ্রোতা পক্ষ থেকে কিছু সহানুভূতিমূলক উত্তর আসবে, কিছু এনকারেজমেন্ট আসবে … সেটা না হয়ে উল্টা কেউ যখন নিজেকেই বেশি হতাশ প্রতিপন্ন করতে চায়, তখন কেউ না পারে তার জন্য সহানুভূতিশীল হতে, না নিজের হতাশাকে এড়াতে … আর যখনি আমার এরকম হয়, তখনি নিজের ওপর নিজেরই কেমন আরও রাগ উঠতে থাকে … মনে হয় যে সবসময়ই সবকিছু নিয়ে একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলি … আমার আসলে কারো সাথে কথা বলাই ঠিক না … এমনকি হাই-হ্যালোও না …  

কখনো মনে হয় কেউ স্রেফ মাথায় হাত রেখে ‘মন খারাপ করে থেকো না’ বললেই মন ভালো হয়ে যাবে … কিন্তু আসলে সেটা হয় না … উল্টা খুব কান্না পায় … আর আমি গলায় ঠেকে আসা কান্নাকে আটকে রাখার জন্য আপ্রাণ যুদ্ধে নামি …গতকাল অ্যাসেম্বলির সময় শম্পা আপা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন … কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘এত ফ্রাস্ট্রেটেড কেন তুই? … তোর লেখাগুলো পড়লে আমারই মন খারাপ লাগে! ‘ … চারদিকে সব বাচ্চাকাচ্চা দাঁড়িয়ে … কীভাবে কাঁদি? …

আবার কখনো কখনো মনে হয় এইসব স্বল্পমেয়াদী কিছুতে আমার মন ভালো হবে না … কারণ এই মনটাই হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে … একেবারে আউট অভ্‌ অর্ডার হবার সময় এসেছে বোধহয় … তখন মনে হয় এমন কিছু যদি হতো যা একটা দীর্ঘমেয়াদি ইমপ্যাক্ট রাখবে, তাহলে হয়তো মন ভালো হয়ে যেতো! … আর মন ভালো হবার মহৌষধ হিসেবে যা যা ভাবি, সেগুলো সবই জাস্ট ‘উইশফুল থিংকিং’ … ‘আই উইশ আই কুড … ইত্যাদি ইত্যাদি … যেমন ভাবি, কেউ এসে হাত ধরে বলতো, ‘কি হবে এই বাল-ছাল জীবন নিয়ে মন খারাপ করে? চলো, নিরুদ্দেশ হই!’ … আমিও সাথে সাথে নিরুদ্দেশের উদ্দেশে যাত্রা করতাম, আর আমার মন ভালো হয়ে যেতো! … কিংবা, কেউ এসে খুব গম্ভীর গলায় বলতো, ‘ধুর বাল! তোমার যাবতীয় মানসিক শারীরিক ডিস-অ্যাবিলিটির খ্যাতা পুড়ি! চলো উড়ি!’ … আমিও তখন অদৃশ্য পাখা মেলে উড়াল দিতাম! আর কে পেতো আমাকে?  … কিংবা, বলা নাই কওয়া নাই, আমি কোনো একটা স্বপ্নের দেশে চলে যাবার প্রস্তাব পেতাম … ইউরোপের কোথাও! … এই মরার দেশে আর থাকতে হবে না ভেবেই বোধহয় মন ভালো হয়ে যেতো … এইসব ভাবি আর নিজেই মনে মনে হাসি! … অ্যাজ ইফ, চাইলেই এইসব খুব হয়! …

তারপর আবার এটাও ভাবি, কিছুই যখন হয় না, তখন মরে টরে গেলেও হয়তো হইতো! ধরা যাক একদি সকালে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলাম আমি আসলে আমি না, মরে টরে গেছি … মরে গেলে নিশ্চয়ই আর মন ভালো কি খারাপ এইসবের অনুভূতি কাজ করতো না! …

কি করলে, কি হলে মন ভালো থাকতো এইটা ভাবতে গিয়েই আরও যেন মন খারাপ হয়ে যায়! …

আজকে ফ্রেঞ্চ ক্লাসের শুরুতে মসিঁয়ু ইফতেখার-এর সাথে কথা হচ্ছিলো পহেলা ফাল্গুন কেমন কাটলো, ভালবাসা দিবসে কে কি করলো এসব নিয়ে … তো আমি বললাম ‘কিছুই করি নাই … স্কুলে গেছি, কাজ করেছি’ … আর পহেলা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবস দুইদিনই আমি খুব স্যাড ছিলাম … তো মসিঁয়ু জিজ্ঞেস করলেন, ‘পু কোয়া?’ … তো আমি উত্তর দিলাম যে  ‘জ্য সুই ত্রিস্ত তুজুখ্‌’ … তো মসিঁয়ু খুব অবাক হবার এক্সপ্রেশন দিয়ে উল্টা বললেন, ‘কই, আপনাকে দেখে তো এমনিতে তা মনে হয় না’ … তো তখন একটু আলোচনা হলো যে আসলে ক্লাসে অ্যাকটিভিটির মধ্যে যখন থাকি, অন্য কিছু চিন্তা করার অবকাশ থাকে না … তাই হয়তো মন খারাপের ব্যাপারটা বোঝা  যায় না … তো ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকেই আজকে মনে মনে ভাবছিলাম যে আসলেই সারাদিন যদি খুব ব্যস্ততার মধ্যে কাটে, তখন অনেককিছুই ভুলে থাকা যায় … যেহেতু ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজের কোর্সটা এখনও পর্যন্ত ভালো লাগছে, তাই যখন ক্লাসে থাকি, পূর্ণ মনোযোগ পড়ালেখাতেই থাকে … যেকোনো পড়ালেখাই অবশ্য আমার পছন্দ … নতুন নতুন কিছু শেখা যায় বলেই হয়তো সারাক্ষণ পড়ালেখা নিয়েই থাকতে পারলে ভালো লাগে … তো যাই হোক, বাসায় ফেরার পথে ভাবছিলাম যে স্কুলেও তো অনেক কাজের ব্যস্ততা, তাহলে সেখানে আমার ভালো লাগে না কেন? … চিন্তা করে দেখলাম, যখন ক্লাসে যাই, তখন তো বাচ্চাদের সাথে ইন্টার‌্যাকশন ছাপিয়ে নিজের মন খারাপের কথা মন পড়েনা … টিচার্স রুমে যখন আসি, তখন খুব হাঁসফাঁস লাগে … চারপাশে এত রকমের কথা, এত রকমের হতাশা … অন্যদের হতাশার গল্প শুনতে শুনতেই যেন নিজেই আরও বেশি হতাশ হয়ে যাই …

মাঝে মাঝে মনে হয় বাসার বাইরে যতক্ষণ থাকি, যতক্ষণ মানুষজনের মধ্যে থাকি ততক্ষণ অন্তত প্রচণ্ড মন খারাপ করা চেহারা নিয়ে থাকি না … হাসির কথায় হাসি … আড্ডাবাজি করি … কথাবার্তা বলি … যেই সময়গুলোতে একা হয়ে যাই সেই সময়গুলোতে খুব অসহায় লাগে … মন খারাপের সব অনুভূতিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে … প্রতিদিনের একটা লম্বা সময় আমার রাস্তায় কাটে … সেসময়টা খুব কষ্টদায়ক হয়ে যায় মাঝে মাঝে, কারণ একা একাই সিএন জি-তে হোক আর গাড়িতে হোক, বসে বসে এটা সেটা ভাবি … আর তখন খুব মন খারাপ লাগতে থাকে … তখন মনে হয়, কথা বলার মতোও কেউ নাই আমার ! যার সাথে অন্তত কথা বলতে বলতে ১২ কিলোমিটার জার্নির বোরডমটা কাটিয়ে দেয়া যেতো! … বাসায়ও একা একাই থাকি … চুপচাপ … আব্বুর সাথে তো কথাই হয় না … মা’র সাথেও প্রয়োজন ছাড়া কথাই বলি না … কারণ সব কথার শেষেই তখন মা তার যাবতীয় আক্ষেপ টেনে আনা শুরু করবে … অমিত কিছু করে না … আমি বিয়ে করি না … জীবনে তাইলে সে কি পেলো না পেলো … এসব শুনলে তখন আমার বাসা থেকে বের হয়ে যেতে ইচ্ছা করে … তাই সবচেয়ে ভালো বাসায় কোন কথাই না বলা … কথা শুরু করলেই বিপদ …

আজকে মা, টিয়াম, লালাম, কামতারা সবাই মিলে ফ্যামিলি পিকনিক-এ গেছে … গাজিপুর সাফারি পার্ক-এ … আমার যাওয়ার আগ্রহই হলো না … একে তো সাফারি পার্ক … ওইখানে বাঘ-ভাল্লুক দেখার সাথে সাথে প্রজাপতি উড়তে দেখলেই তো পালানোরও জায়গা খুঁজে পাবো না … তারওপর দেখা যাবে একদিকে কামতা, একদিকে কটু মামা আর একদিকে টিয়াম মিলে এমন পরিকল্পনা শুরু করবে যে মাঝখান দিয়ে সব জট পাকাবে, আর আমার তখন মেজাজ খারাপ হতে থাকবে … কক্সবাজারের ট্যুরের পর থেকেই তো কানে ধরেছিলাম যে পারিবারিক গ্যাদারিং-এ আর নাহ! … কয়েকদিন আগে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করতে গিয়ে আরও একবার বিরক্ত হলাম … এবার আগেই ‘না’ …

আজকে প্রাচ্যনাটের গ্রুপমেট জুঁই-এর বিয়ে … জুঁই ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের শেষে একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট করে … গলার ওড়না পেঁচিয়ে গিয়েছিলো ইজি বাইকে করে আসার সময় … সেই অ্যাক্সিডেন্টে ওর ঘাড় আর গলার নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয় … ওর কথা বলাই বন্ধ হয়ে যায় … এতদিন পরেও ও বোধহয় পুরোপুরি সুস্থও হয়নি … এর মধ্যেই বিয়ে হচ্ছে মেয়েটার … ওর বিয়েতে যাওয়াটা হয়তো গ্রুপমেট হিসেবে আমার একটা কর্তব্য ছিলো … কিন্তু ওই প্রোগ্রামেও যেতে ইচ্ছা করলো না … গ্রুপেই যাই না কতদিন … লাস্ট যে স্কুলের নাটকের শো হলো, ওইটার ছবি রেডি করে রেখেছি, কিন্তু দেবো দেবো করে আর আলসেমির চোটে দেয়া হয়না … মনেই থাকে না … মাঝখানে মিতুল ভাই ফেসবুকে কয়েকবার নক করেছিলো, উত্তরও দেই নাই … নিশ্চয়ই বিরক্ত হয়েছে … [ আমি নিশ্চিত এরপর থেকে আর স্কুলের শো হলে আমাকে ছবি তুলতে বলবে না … তাতে ভালোই হবে … আমার ‘ফটোগ্রাফার’ পরিচয়টা যেন সবাই ভুলে যায়, সেটাই চাই … কেউ আর না-ই জানুক যে আমি কখনো ছবি-টবি তোলা নিয়ে খুব প্যাশনেট ছিলাম ] … তো গ্রুপের অনেকেই যাবে … আর তাদের সামনে পড়তে চাই না দেখেই যাবো না … তবে আমার নিশ্চয়ই এটা ভেবে খুশি হওয়া উচিৎ যে নোবেল ভাই অন্তত আমাকে নক করে জিজ্ঞেস করেছে জুঁই এর বিয়েতে যাবো কি না! খুশি হওয়া উচিৎ এটা ভেবেই যে কেউ তো আমাকে মনে করলো! …

আমার উবারের অ্যাকাউন্ট -টার এখনও কিছু করতে পারলাম না … উবার-এর হেল্পলাইনে জানালাম, তারা বিভিন্ন দায়সারা অটোমেটেড মেসেজ পাঠিয়ে গেলো … জিদের চোটে ওই অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিতে চাইলাম … বলে ওই ক্যান্সেলেশন ফি না দেয়া পর্যন্ত অ্যাকাউন্টও ডিলিট হবে না! … কিসের মধ্যে পড়লাম এইটা? … এখন একটাই উপায় আছে, সেটা হলো ফোনে আরেকটা সিম-এর যে স্লট আছে, সেখানে নতুন একটা সিম ভরে, ওই নাম্বার থেকে আরেকটা অ্যাকাউন্ট খোলা … সম্ভবত আমার উইন্ডোজ ফোন হবার কারণে অনেক ফিচার আমি দেখতে পাচ্ছি না উবারের … কিংবা হয়তো কপালে খারাপি যাচ্ছে বলে উবারেও গিট্টু লেগেছে … গত ৩/৪ দিন ধরে সিএনজি-তে ফিরতে হচ্ছে বলে দুপুর থাকতেই বাসায় চলে আসছি … আর সেটা করতে গিয়ে দুপুরের বাতাসে উড়তে থাকা ধুলাও খাচ্ছি … ফলে ঠাণ্ডা আর ভালো হচ্ছে না … মা কি একটা কফ সিরাপ আর একটা ট্যাবলেট নিয়ে এসেছে … সেগুলো নিয়মিত খাচ্ছি … তাতে একটু উন্নতি হয়েছে, কিন্তু ধুলাবালির কারণে পুরোপুরি সুস্থ হচ্ছি না …

আজকে আর লিখতে ভালো লাগছে না … অনেক তো মন খারাপের ফিরিস্তি দিলাম … আজকাল ফেসবুকেও খুব হতাশামূলক পোস্ট দেই … ইন্সটাগ্রামেও তাই … আর দিনযাপন যখন লিখতে বসি, তা তো আগাগোড়াই হতাশার কথা! … যে বা যারাই দিনযাপন পড়ে তারা নিশ্চয়ই বিরক্ত হয় … আমি অবশ্য কারো পড়ার জন্য দিনযাপন লিখি না … নিজের আর্কাইভের জন্যই লিখি … কেউ পড়ে বলে ‘বিরক্তিকর’ … কেউ খুব শ্লেষের সুরে জিজ্ঞেস করে,’ তুমি যে দিনযাপন লেখো, কেউ পড়ে?’ … আবার কেউ দিনযাপন পড়ে আমাকে কাছে এসে জড়িয়ে ধরে বলে যায়, ;কি হয়েছে আপনার? এত মন খারাপ কেন? এরকম দেখতে ভালো লাগে না’ … আবার কেউ কেউ দিনযাপনের প্রথম যেই অংশটুকু ফেসবুকে শেয়ার হয়, ওইটুকু পড়েই ছবি-টবিগুলোতে বেশ লাইক-টাইক দেয় … হয়তো বোঝেই না যে লিঙ্কটাতে গেলে পুরো একটা লেখা পাওয়া যাবে … একেকজনের একেক প্রতিক্রিয়া … আমার তো ঢালাওভাবে শত শত মানুষকে পড়ানোর উদ্দেশ্য নাই … এই যে আশেপাশের নিত্যদিনের দেখা হওয়া মানুষদের মধ্যে ৪/৫ জন্য পড়ে, এরাই আমার কাছে অনেককিছু! …

যাই হোক, শেষ করি … খুব মাথা ধরেছে … সন্ধ্যায় চা খাওয়া হয়নি আজকে … অবশ্য তাতেও কিছু করার নেই … এখন আমাকে হয় স্কুলের কাজ, নয়তো অনুবাদের কাজ, যেকোনো একটা নিয়ে বসতেই হবে …

দিনযাপন । ১৩০২২০১৮

হাতে অনেকগুলা কাজ … কিন্তু একটাও করার মতো শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা নাই … বেশ কিছুক্ষণ গুঁতাগুঁতি করলাম কাজগুলো নিয়ে … কিন্তু একটাও করতে ইচ্ছা হলো না … না ওয়ার্কশিট চেক করার কাজ, না ওয়ার্কশিট বানানোর কাজ, না সায়েন্স ফেয়ারের প্রজেক্টের কাজ, না অনুবাদের কাজ, না এটা, না ওটা … মাথা কেমন জ্যাম হয়ে আছে … মনে হলো, সব বাদ দিয়ে দিনযাপন লিখি … তাও যদি একটা কিছু করা হয়! …

আমার মোটামুটি সব দিনই কমবেশি বাজে যায় … মাঝে মাঝে কিছু কিছু দিন এমন যায় যে নিজেকে অসহায় লাগারও অবস্থাটা থাকে না … আজকে এরকম একটা দিন কাটালাম … একেবারে মর্নিং শোজ দ্য ডে’র মতো শুরু হলো সিএনজি না আসা দিয়ে … রিসেন্টলি একজন সিএনজিওয়ালাকে পেয়েছি, যিনি সকালবেলা আমাকে স্কুলে নিয়ে যায় … তো উনি আবার মাঝে মাঝেই লাপাত্তা হয়ে যান … নইলে সিএনজি-ই বের করেন না … আজকেও সেরকম হলো … এম্নিতেই আজকে সকালে আমি ঘুম থেকে উঠেছি একটু দেরিতে … বেশ তাড়াহুড়া অবস্থা … কালকে সারারাত কাশতে কাশতে একটা ফোঁটা ঘুম হয়নাই … সকাল থেকে রেডি হবার সময় খুব মন-মেজাজ খারাপ লাগছিলো এই ভেবে যে সবাই আজকে শারি-টাড়ি পড়বে, বসন্তের প্রথম দিন বলে … আর আমি পিরিয়ড হয়েছে বলে সালোয়ার কামিজ পরে যাচ্ছি … ভাবলাম সালোয়ার কামিজটা অন্তত বসন্তের রঙের সাথে মিলিয়ে পরা যাক! … দেখলাম কোনটার কামিজ পাচ্ছি তো সালোয়ার মিলছে না, আবার সালোয়ার আর কামিজ আছে তো ওড়না মিলছে না … এতদিন তো শীতের জন্য জিন্স, নয়তো ভারী প্যান্ট-ই পরেছি, গত দুই/তিন দিন যাবৎ আবার সালোয়ার পরতে শুরু করেছি, যেহেতু একটু গরম পড়েছে … দেখা যাচ্ছে যে রিসেন্ট যেই জামাগুলো বানিয়েছি, সেগুলোর একটার সাথেও ম্যাচিং সালোয়ার নাই আমার! … ইন ফ্যাক্ট, লাল, সাদা আর কালো ছাড়া আর কোনো সালোয়ারই নাই এখন পড়ার মতো! … আবার কিছু সালোয়ার-কামিজ সেট আছে, যেগুলো পরলে নিজেরই নিজেকে দেখতে বিশ্রী লাগে … এক বছর আগে বানানো জামাগুলো একটাও এখন আর পরার উপায় নেই! … পেটটা কি এক বছরে এত বড় হয়ে গেছে? তাই ভেবে ভেবে আরও মনে মনে তেঁতে ছিলাম … তো এর মধ্যেই দেখি যে সিএনজিওয়ালা নাসির মামাও আজকে লাপাত্তা! … তো যাই হোক, ৭টার দিকে সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে অন্য এক সিএনজি নিয়ে রওনা দিলাম … বাকিটা ইতিহাস! …

স্কুলে গিয়ে যখন পৌঁছালাম, তখন পৌনে দশটা পাড়! … এত জ্যাম রাস্তায়! … একদিকে টেনশন করছি যে ক্লাসের টাইম পার হয়ে যাচ্ছে … ৮:৪০ এ ক্লাস ছিলো, সেটা তো ধরতে পারলামই না, ৯:২০-এর টাও মিস … রাস্তায় বসে বসেই ভাবছিলাম যে একেকটা ক্লাস শাফল হচ্ছে, আর না জানি কতগুলা বিরক্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে স্কুলে … এই সপ্তাহে স্ট্রিক্টলি বলে দেয়া হয়েছে কেউ যেন অ্যাবসেন্ট না থাকে, কয়েকজন টিচার থাকবে না, সো অন্যদের রুটিনে যেন হ্যাম্পার না হয় … অথচ আজকে মোটামুটি তিন-চারজনের সাথে রুটিন এদিক সেদিক হয়ে গেলো আমার! … স্কুলে গিয়ে আজকে শিওর বকা খাবো, এরকম একটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিচ্ছিলাম … এদিকে আরেক টেনশন পিরিয়ড নিয়ে … আজকে পিরিয়ডের সেকন্ড দিন … মোটামুটি ঘড়ি ধরে প্রতি এক থেকে দেড় ঘণ্টায় আমার প্যাড চেঞ্জ করতে হয় … সেখানে দেড় ঘণ্টা পাড় হয়ে দুই ঘণ্টার বেশি হয়ে যাচ্ছে, আমি তখনও স্কুলেই পৌছাইনাই … মনে মনে ভাবছি আজকে না জানি কি অবস্থা হয় … দাগ-টাগ লেগে মনে হয় যা-তা অবস্থা হয়ে যাবে … স্কুলে যখন পৌছালাম, ততক্ষণে সবকিছু মিলিয়ে রাগে-দুঃখে আমার প্রায় গলায় এসে কান্না ঠেকে রইলো … আরেকটু হলে বোধহয় সিএনজিতে বসেই কান্না শুরু করতাম … স্কুলে ঢুকে কোনোরকমে খালি ব্যাগটা রেখে বাথরুমে ঢুকলাম … তারপরে পুরা বার্স্ট আউট হলো কান্নার … কিছুক্ষণ কেঁদেকেটে লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে একটু ঠাণ্ডা হয়ে তারপর বের হলাম … অল্পের জন্য আজকে বেঁচে গেছি যে প্যাড স্মাজ করে সালোয়ারে দাগ-টাগ লাগেনাই … আর আধাঘণ্টা -পনেরো মিনিট দেরি হলে খবর হয়ে যেতো আমার! …

এদিকে ১০টার দিকে বসে এটা-ওটা গুছাতে গুছাতেই টিফিনের বেল দিয়ে দিলো … টিফিনের ব্রেক-এর সময় যে উঠলাম, তারপর মোটামুটি ওই ১০টা ৪০ মিনিট থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত আমি ঠায় দাঁড়ানো … পরপর ৪টা ক্লাস নিলাম, ছুটির পরে আবার সায়েন্স ফেয়ারের প্রজেক্ট-এ আমি যেই গ্রুপগুলো নিয়ে কাজ করছি তাদের সাথে বসলাম … এদিকে সকালে অর্ধেকটা মিষ্টি আর দুই টুকরা পাউরুটি খেয়েছিলাম বের হবার আগে, তাও সকাল ৬টা/সোয়া ৬টা বাজে, সেই খাবার তো হজম হয়ে গেছে অনেক আগেই … শেষের দুইটা ক্লাস নিতে গিয়ে টের পেলাম যে প্রচণ্ড ক্ষুধায় প্রেশার লো যাচ্ছে, মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেছে, পা দুইটা কেমন ঝিম মেরে আছে, আমি ইভেন হাঁটতেও পারছি না, কানও ভোঁ ভোঁ করছে! … কিন্তু ক্লাসের মাঝখানে তো আর খাওয়ার কোনো উপায় নাই … আর মন-মেজাজ এত খারাপ হয়ে ছিলো যে খাওয়ার রুচিটাও পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো মনে হয় … আড়াইটা সময় আজকে সবাই চলে গেলো … সবারই কোথাও না কোথাও কারো সাথে, কিংবা স্কুলেরই এ-ও মিলে কোথাও খেতে-টেতে যাবার প্ল্যান ছিলো… তাই সবাইই আজকে যত দ্রুত সম্ভব বের হয়ে গেছে … আজকে এমন একটা অবস্থা গেছে কারো সাথে একটা হাই-হ্যালোও পর্যন্ত হয়নাই আমার … আর কথা বলতেও ভালো লাগছিলো না কারো সাথে… আমার মন-মেজাজ খারাপ দেখেই হয়তো কেউ আমাকে খুব একটা ঘাঁটায়ও নাই … হয়তো এতদিনে বুঝে নিয়েছে যে মেজাজ খারাপ থাকা অবস্থায় আমার সাথে কথা না বলতে আসাটাই ভালো … অন্যদিন কিছু খেয়েছি কি না, এটাও পর্যন্ত কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, আজকে তাও জিজ্ঞেস করে নাই … এটা নিয়েও আমার একটু অভিমান জমতে শুরু করছিলো, কিন্তু পরে সে নিজে নিজেই আবার মিইয়ে গেলো … ফৌজিয়া আপা আজকে সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালো … আমি খেলাম না … এম্নিতেই উনার কিছু আচরণে ব্যথিত হয়েছি বলে উনার সাথে এখন প্রয়োজনীয় কথাটাও বলি না, তাই মিষ্টিটাও খাওয়ার জন্য মনের ভেতর যুক্তি পেলাম না… উনি না খাইয়ে আজকে আর কেউ কিছু খাওয়ালে হয়তো পেটে অন্তত ওইটুকু খাবার পড়তো! …

যাই হোক, স্কুল থেকে বের হয়েছি ৩টার দিকে … বাসায় পৌঁছালাম বোধহয় সোয়া ৪টার দিকে … এত মাথা ব্যথা করছিলো, সিএনজি-তে বসে ঘুমিয়েই যাচ্ছিলাম প্রায় … বাসায় এসে আর কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা শুয়ে পড়লাম … মনে হলো যে এখন যদি আমি একটু না ঘুমাই তাহলে মারাই যাবো … এদিকে প্রচণ্ড ক্ষুধা, মাথা ঝিমঝিম করছে, পেট ব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছে ক্ষুধায় … কিন্তু তারপরও মনে হলো এখন ঘুমাতে হবে … ঘুমিয়েও গেলাম … ৫টার দিকে মা আসলো যখন তখন বেল বাজার শব্দে ঘুম ভাঙলো … তখন উঠে হাতমুখ ধুয়ে ভাত খেলাম …

এদিকে, প্রচণ্ড কাশি হয়েছে আমার … শুকনা কাশি … সারাদিনে খুব যন্ত্রণা হয় না … ক্লাসে টানা কথা বললে একটু কাশি আসে … কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে অবস্থা খারাপ হয়ে যায় … আর রাতে ঘুমই হয় না … সারারাত কাশতে থাকি … কাশতে কাশতে বমি করে দেবার অবস্থা হয় মাঝে মাঝে … শুয়ে থাকলে মনে হয় আরও কাশি আসে …গভীর রাতে উঠে বসে থাকি … লেবু-মধু দিয়ে গরম পানি খেয়েও কাজ হচ্ছে না … অ্যালাট্রল খেয়ে ঘুমালাম কয়েকদিন, ঘুমও হলো না, কাশিও কমলো না … শুধু শুধু সারাদিন ঝিমালাম … এত ধুলা চারদিকে … যতই যাই করি না কেন, এই ধুলা খেতে খেতেই যেন আরও অবস্থা খারাপ হয়ে যায় …

উবারের অ্যাপ্লিকেশনটাতেও একটা গিট্টু লেগে আছে … ধুলা থেকে বাঁচার জন্য যে উবারের গাড়িতে করে যাতায়াত করবো তারও উপায় নাই … গত রবিবারে একটা গাড়ি ডাকলাম স্কুল থেকে ফেরার সময় … তো ড্রাইভার দেখি পিক-আপ পয়েন্টে আসতে সময় নিচ্ছে, আবার যাচ্ছেও উল্টা দিকে … এদিকে আমি আসলে উবার এক্স-এর গাড়ি ডাকতাম, ডেকেছি প্রিমিয়ার … তো আমি সবকিছু মিলিয়ে বিরক্ত হয়ে ক্যান্সেল করে দিলাম … ভাবলাম যে এবার উবার এক্স-এর একটা গাড়ি ডাকি, তাতে ভাড়া কম আসবে … আর আগের কল-এর ৩০টাকা ক্যান্সেলেশন ফি-টাও তো সাথে যোগ হবে … কিন্তু কি জানি কি হলো, গাড়ি ডাকতে যাই, আর বলে যে ওই ৩০টাকা ক্রেডিট কার্ড থেকে পেমেন্ট ক্লিয়ার হয়নাই, ইত্যাদি ইত্যাদি … অথচ আমি ক্রেডিট কার্ড-ই ব্যবহার করি না … ক্যাশ-এ পেমেন্ট করি! … এই মেসেজ কেন আসছে বুঝলাম না … উবারের অ্যাপ ক্লোজ করে, নেট বন্ধ করে, ফোন বন্ধ করে আবার চালায়ও দেখলাম যে কাজ হয় না … আজকে পর্যন্তও একই অবস্থা … উবারের গাড়ি আর ডাকতে পারছি না … উবারের ফেসবুক গ্রুপে সলিউশন জানতে চেয়ে পোস্ট দিলাম, উবারের হেল্পলাইনে কমপ্লেইন করলাম, কিন্তু এখনও এটার সুরাহা হয় নাই …

তো, এই উবারের ঘটনাটা নিয়েই আমি আরেকটা জিনিস ভাবছিলাম … মাঝে মাঝেই এমন ঘটনাও ঘটে যেটার কাকতালীয়তায় খুব অবাক লাগে … অথচ দুটো ঘটনার মধ্যে আসলে হয়তো কোন সম্পর্কই নাই! … যেমন, শুক্রবারেই একজন একটা জিনিস বোঝাতে গিয়ে কথা প্রসঙ্গে এরকম উদাহরণ দিলো যে, ‘ধরো, তুমি যে উবারে চলাফেরা করো সেটা আমার পছন্দ না, এখন তুমি সাইকেল চালাও সেটাতে আমি খুশি হয়েছি … তাহলে সেটা কীভাবে বলবো … ইত্যাদি ইত্যাদি …’ … তো এই উবারে চড়া পছন্দ না করার ব্যাপারটা আমাকে বেশ নাড়া দিলো … এতকিছু থাকতে এভাবে কেন একজন উদাহরণস্বরূপ হলেও এই কথা বলবে, তাই ভাবলাম … চিন্তা করলাম যে তাহলে কি উনি  ইন্ডিরেক্টলি আমাকে উনার এই মতামত জানালেন? … নাকি এটা জাস্ট কথার কথা? … আর আমি প্রায় নিয়মিতই উবারে যাতায়াত করি, এইটা উনি পছন্দ করেন কি না সেটা আমাকে বলবার মতোও তো উনার সাথে আমার সম্পর্ক না … আর যদি উনি বলেও থাকেন, তাহলে আমার কি এটা নিয়ে ভাবা উচিৎ? … মানে, কোনোভাবে কি এই কথাটা আমার ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করা উচিৎ? … তো এইসব ভাবতে ভাবতে আমারও মনে হলো যে ইদানীং হয়তো আসলেই একটু বেশি বেশিই উবারের ওপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে যাচ্ছি … দুপুরবেলায় স্কুল থেকে বের হই যেদিন, সেদিন তো সিএনজি-তে গেলেও পারি … আর উবার তো আছেই, চিন্তা করে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্কুলে থাকিই বয়া কেন? … সিএনজি-তে যেতে হবে এই ছুতায় তো তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাবার একটু তাগিদ পাওয়া যেতে পারে … আর টাকাও তো বেশি বেশিই খরচ হয়ে যাচ্ছে ইদানীং … হাতে কিছুই থাকে না মাসের শেসে … বরং মা’র কাছ থেকে আরও টাকা নেই … তো এইরকম অনেকরকমের ভাবনা মনের মধ্যে দুইদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিলো … আর রবিবারেই উবারের অ্যাপ্লিকেশনে এই গিট্টু … এটাও মনের মধ্যে কেমন স্ট্রাইক করলো … এরকম কাকতালীয় ঘটনার ব্যাখ্যা কি?

আজকে আর লিখতে ভালো লাগছে না … খুব ক্লান্ত বোধ করছি … ঘুমিয়ে পড়বো এখন … আর এতক্ষণ ধরে বসে আছি, কোমরও ব্যথা করছে কেমন … আজকে না হয় এখানেই শেষ করি … আরও একটা দুইটা জিনিস লেখার কথা মাথায় ছিলো … কিন্তু মাথা ভার হয়ে কেমন … ঘুমিয়েই যাই বরং …  

দিনযাপন । ২৩০১২০১৮

মেট্রোরেল-এর কাজের জন্য কি ফাইবার কাটা পড়েছে, গত শুক্রবার রাত থেকেই বাসায় ইন্টারনেট-এর কানেকশন নেই। মোবাইলের ডাটা দিয়ে একটুআধটু ফেসবুকের নোটিফিকেশন, ইন্সটাগ্রামের নোটিফিকেশন দেখতে পারি … যেহেতু মোবাইলে ম্যাসেঞ্জার নাই, তাই কারো সাথে সেভাবে যোগাযোগও হয় না, আবার কেউ মেসেজ পাঠালেও দেখতে পারি না … এদিকে আমার উইন্ডোজ মোবাইলের ব্রাউজার হচ্ছে বিং, যেটা তথ্য খোঁজার জন্য খুব একটা আরামদায়ক না … ফলে স্কুলের হ্যান্ডআউট বানানোর জন্য পড়াশোনার কাজটাও করতে পারছি না … স্কুলে গেলে সেখানকার ইন্টারনেট ব্যবহার করে কিছুটা দিন-দুনিয়ার খোঁজখবর পাওয়া যায়… কিন্তু কারো সাথে সময় নিয়ে কথাবার্তা বলা, কিংবা হ্যান্ডআউটগুলো বানানোর জন্য যথেষ্ট পড়ালেখা করার কাজের কোনটাই হয়না … ক্লাসটাইমে তো ক্লাসই থাকে, আর ছুটির পরে তো খাতাই দেখি …

মন-মেজাজ কেমন যেন খিঁচে আছে দুই-তিনদিন যাবৎ … প্রচণ্ড সেনসিটিভ হয়ে আছি অনেককিছু নিয়ে … নিজের ওপর, এর ওপর, তার ওপর, দুনিয়াদারীর ওপর প্রচণ্ড রাগ-ক্ষোভ-অভিমানের বস্তা নাড়া দিয়ে বসেছি …  মনের ভেতর একসাথে অনেকধরণের চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু কোনটাতেই মন থিতু হচ্ছে না … একবার এভাবে ভাবছি, তো পরের মুহুর্তেই ওভাবে ভাবছি, তার পরের মুহুর্তেই ভাবছি আরও অন্যরকমভাবে … একটা বিষয় নিয়েই অনেকরকমের চিন্তা খেলেই যাচ্ছে মাথার ভেতর, আর আমি প্রচণ্ড অস্থির হয়ে, খুব অসহ্য বোধ করে, প্রচণ্ড আবেগের মুহুর্মুহ বাণে  আক্রান্ত হয়ে খুব মন খারাপ করে, কেঁদেকেটে দিন কাটাচ্ছি …

অনেকরকমের বিষয়ের মধ্যে একটা বিষয় নিয়ে যদি উদাহরণ দেই … তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এমন যে … ধরা যাক, কারো সাথে ইদানীং আমার কারনে-অকারনে কথাবার্তা বলতে ভালো লাগে … তো একদিন-দুইদিন খুব র‍্যান্ডমলিই তার সাথে এদিক-সেদিক ঘুরে আড্ডাও দেয়া হলো … সেই আড্ডা দেয়ার ব্যাপারটা আমাকে আরেকটু বেশি আড্ডা দেয়ার ব্যাপারে লোভী করে তুললো … আমি ভাবতে থাকলাম, ইশ! এরকম মুহুর্ত আরও আসুক! ভালো লাগবে আমার! … তো নিজে থেকে এমন মুহুর্ত আবার কবে আসে সেই ব্যাপারে ধৈর্যশীল না হয়ে একদিন আমি নিজেই এরকম সময় কাটানোর জন্য অ্যাপ্রোচ করলাম … তখন আবার না-বোধক উত্তর আসলো … আর তখন আমি একটু অফেন্ডেড হয়ে গেলাম যে ‘ধুর! কি দরকার ছিলো নিজে থেকে এভাবে বলার? এখন মনে হবে না যে আমি আসলে আলগা ইন্টেরেস্ট দেখাচ্ছি?’ আমার ব্যাপারে এখন সেই ব্যক্তিটি কি ভাবলো এই চিন্তা করতে করতে আমি নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে গেলাম … এদিকে আরেকদিন হয়তো এমন হলো যে কোথাও গেলাম, একবার ভাবলাম যে তাকেও জিজ্ঞেস করি সেখানে যাবে কি না, কিন্তু জিজ্ঞেস করলাম না … ভাবলাম যে আবারো নিজে যেচে পড়ে এরকম প্রশ্ন করে নিজেকে হাল্কা করে ফেলবো কেন? … আলটিমেটলি যথাস্থানে গিয়ে আমি ঠিকই তাকে মেসেজ পাঠিয়ে জানতে চাইলাম সেও যাবে কি না, আইরনি হলো যে মেসেজটাই গেলো না … আমিও ভাবলাম যে ভালোই হলো … নইলে হয়তো ভাবতো এই মেয়ের সমস্যা কি? এত আগ্রহ দেখাচ্ছে কেন? … তো আমিও অনেক বিষয়ের সাথে ‘মেসেজটা গেলো না’, ‘তাতে কি কিছু মিস হয়ে গেলো?’, ‘ব্যাপারটা ভালো হলো না খারাপ হলো’ এইসবও ভাবতে ভাবতে বাড়ি চলে গেলাম … পরের দিন জানতে পারলাম উনি ঠিক ঠিক সেখানে গিয়েছিলেন … তখন একই সাথে এই ভেবে খারাপ থাকা মন আরও খারাপ হলো যে, ‘ধুর শালা! এইটা কিছু হইলো? যদি কালকে তার কাছে মেসেজটা যেতো তাহলে তো জানতে পারতাম যে উনিও ওখানে আছে, আর তাহলে দেখাও হয়ে যেতো, হয়তো আড্ডাও হতো…আমি তো সঙ্গি-সাথির অভাবে ওখানে ঘুরতেই পারলাম না … উনাকে পেয়ে গেলে তো অন্তত একজন সঙ্গীও পেতাম, মনের মতো করে ঘুরতেও পারতাম … তো সাথে সাথেই আবার এইটাও ভাবনা এলো যে উনি তো জানতো আমি সেখানে আছি, কিন্তু উনি নিজে থেকে তো জানালেন না যে উনিও গিয়েছেন … তাহলে উনি নিশ্চয়ই চাননি যে আমার সাথে দেখা হোক … আমি বোধহয় আসলেই একটু বেশিই আগ্রহ দেখাচ্ছি … হয়তো আমার সাথে ভদ্রতা করেই উনি কথাবার্তার উত্তর দেন … তাই তো! সবসময় তো দেখা যায় আমিই ‘কি খবর’ ‘কেমন আছেন’ টাইপের যোগাযোগ করি, এটা সেটা জানতে চাই, নিজের সব কথা ঢালাও করে বলতে থাকি … আসলে সমস্যা তো আমারই … নিশ্চয়ই আমাকে উনার বেশি গায়ে পড়া মনে হয় … আবার সাথে সাথেই এইটাও ভাবনা আসে যে, আসলেই তো! কেন আমি এসব করছি? কেনই বা উনার সাথে কথা বললে, সময় কাটালে ভালো লাগছে, কিংবা ভালো লাগে বলে ভাবছি? … এটা কি এজন্য যে উনার অনেক চিন্তা, অনেক ভাবনা, অনেক কথার মধ্যে আমি অনিক-এর ছায়া দেখতে পাই? অনিক-এর প্রতি আমার প্রবল ফ্যাসিনেশন ছিলো … সেইটারই কি প্রতিফলন উনার সাথে কথায়, আচরণে চলে আসছে আমার মধ্যে? … অনিক-এর সাথেও কি এরকমই করতাম না মাঝে মাঝে? অনিক-এর ব্যাপারেও কি এভাবেই ভাবতাম না? … আবার ভাবি, এইসব অনুভূতিকে কেনই বা প্রশ্রয় দেবার কথা ভাবছি? যেটুকু প্রশ্রয় দিলাম সেটাই বা কেন দিয়েছি?… এসব থেকে তো দূরে থাকার কথা আমার! … অনিক-এর সাথে যা যা হয়েছে, এখানেও তো একই ব্যাপার ঘটতে পারে! … হ্যাঁ মিলে যায়! অনেক কিছুই মিলে যায়! একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়! … তবে তো আমার এই পথ থেকে ছিটকে সরে যাবার কথা! … যেচে পড়ে আবারো একই পথে হাঁটছি নাকি আমি? … এই পথ তো নিজের জন্য খুলে দেবার কথা না আমার! … তাই তো! আমি নিজেই তো একটু একটু করে কথা বলে, সেই কথার রেসপন্সে আরও কথা বলে বলে এখন নিজের মধ্যে কিঞ্চিৎ লোভ তৈরি হবার জায়গা করে দিয়েছি! … সমস্যা তো আমারই! …

ব্যাস, এই ভাবতে ভাবতে আর কি মনকে ভালো রাখা যায়? … এই ভাবনা থেকে ডালপালা গজিয়ে সোহেলের কথা মাথায় আসে, সোহেলের সাথে যাবতীয় অভিজ্ঞতাগুলো মাথার ভেতর রিক্যাপ হয়ে যায় মুহুর্তে … সাথে সাথে আরেক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয় … নিজেকে নিজে যতরকমের শাপ-শাপান্ত করি … আমার নির্বুদ্ধিতার জন্যই তো তখন সেইসব কিছু হয়েছে … আমার নির্বুদ্ধিতার জন্যই তো আজকে আমার এই অবস্থা … এমনকি আজকে আমার কিছু ভালো লাগার অধিকারটা পর্যন্ত নেই … ভালো লাগার অনুভূতি এখন আমার জন্য মরীচিকাস্বরূপ … এইটাই বোধহয় শাস্তি আমার … যে কোনো কিছু আমাকে ভালো লাগার অনুভূতি দেবে তো পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যাবে! … এ এক দারুণ খেলা! … কিছু ভালো লাগা যাবে না … যেকোনো অসতর্ক মুহুর্তে একবার মন স্টেটমেন্ট দিয়ে দিলো ‘ভালো লাগছে’ তো শেষ! …  সবকিছু চোখের সামনে পালতে যাবে … যেই কাজে অ্যাপ্রেশিয়েশন পাচ্ছিলাম সেখানে প্রতি পদে পদে জবাবদিহি করতে হবে, যেই জিনিসটা খুব ভালো কাজে দিচ্ছিলো সেটাতে কোনো একটা গড়বড় দেখা দেবে … যেই ব্যক্তির সাথে বেশ ভালো টার্ম চলছিলো তার সাথে ক্ষেত্রবিশেষে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে যাবে …

মরে গেলে ভালো লাগবে ভাবি বলেই বোধহয় মরণ আর আসে না! … এটাও নিশ্চয়ই শাস্তিরই অংশ … প্রতি মুহুর্তে চিন্তা করবো মরে যাই না কেন, কিন্তু এত সহজে মৃত্যু আসবে না …

ইদানীং নিজের দিকে তাকাতে ভালো লাগে না … একদমই ভালো লাগে না … দিন দিন ফিগারের ডিসটরশন বেড়েই চলছে … পেটটা যেন গত ২/৩ মাসে আরও বড় হয়েছে! … টিউমারটার সাইজ নিশ্চয়ই বেড়েই চলেছে … টিউমারটা নিয়ে আমি ভ্রুক্ষেপ করি না … নিজেকে নিজেই শাস্তি দিচ্ছি … কৃতকর্মের জন্য … মিন্নি একদিন খুব শ্লেষের সুরে বলেছিলো, ‘টিউমারটা ফেলবি না তাইলে আর কি! বাচ্চার মতো করে পেটের মধ্যে পালতে থাক!’ … আমিও মাঝে মাঝে নিজের পেটের দিকে তাকাই আর ভাবি, এটা টিউমার না হয়ে বাচ্চাও হতে পারতো! …  আশেপাশে গত ৩/৪ মাস যাবৎ খালি মানুষের প্রেগন্যান্ট হবার খবর পাচ্ছি …  স্কুলেই এক কলিগের পুরো প্রেগ্নেন্সি পিরিয়ডটাই চোখের সামনে দেখছি … ‘বাচ্চা হবে’ এই অনুভূতি একটা মানুষকে কীভাবে পাল্টে দেয় সেটা দেখি … দেখি আর ভাবি… ভাবি যে এই অনুভূতিগুলো পরিচিত! …  মাঝে মাঝে নিজেও অজান্তে পেটে হাত দিয়ে ফেলি, তারপরেই মনে হয় ‘এ কি করছি! পেটে কি আর বাচ্চা আছে, এইটা তো টিউমার!’ …  আবার পুরানো সব স্মৃতিদের রিক্যাপ হয় মাথায় … আবারো পুরো পৃথিবী, আসমান, জমিন সব ভেঙে খান খান হয়ে পড়ে … ভাঙ্গা কাঁচের শত টুকরায় নিজের ভাঙ্গাচোরা জীবনের প্রতিবিম্ব দেখি …

এখন তবু শীতকাল বলে অনেক কাপড়-চোপড় পরে নিজের বেঢপ থেকে বেঢপতর হওয়া পেটটাকে ঢেকে চলতে পারি … গরমকাল আসলে কি করবো জানি না! …  নিজেকে এখন দেখতে একটু বেশিরকমেরই বিশ্রী লাগে নিজের কাছে … অন্যদের কাছে না জানি আরও কত খারাপ লাগে! …  নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে হাসতে ভোলে না অনেকেই … মোটাসোটা মানুষদের নিয়ে সবসময়ই অনেক সস্তা জোকস চলে, আর আমার মতো বেঢপ সাইজ হলে তো কথাই নাই! … আমাদের স্কুলে ধর্ম স্যারের বিশাল ভুঁড়ি ছিলো বলে তাকে দুষ্টুমি করে ডাকা হতো  ‘এটিপি’, মানে ‘অল টাইম প্রেগন্যান্ট’ … আমাকে নিয়েও নিশ্চয়ই এইরকমের বিভিন্ন নাম-টাম দেয় মানুষজন! …

অনেকে আমাকে মাঝে মাঝেই খুব বলে ‘খাওয়া-দাওয়া’ কন্ট্রোল করো … এটা খাও, ওটা খাও … আমি কখনো হাসি … কখনো চুপ করে থাকি …  তাদের যদি মনে হয় আমি খাওয়া-দাওয়ার কারণে খুব মোটাসোটা তো তাই-ই সই …  স্কুলে মাঝে মাঝে এক-দুইজন টিচার এভাবে বলতে আসে, আমি ‘হ্যাঁ, আচ্ছা, দেখি’ বলে কাটায় দেই … কখনো কখনো কাশফিয়া আপু সামনে থাকলে আমাকে ডিফেন্ড করে … বলে যে ‘ওর তো হরমোনাল প্রবলেম, সে কারণে এত মোটা … খাওয়া-দাওয়ার জন্য না’ … আমি মনে মনে বলি, কি দরকার এত ব্যাখ্যা করার? …  থাক না! …

হঠাৎ হঠাৎ ক্ষণিকের জন্য ভাবনা আসে, অপারেশনটা করিয়েই ফেলি … টিউমারটা অপারেশন হবার সাথে সাথেই আমি নিশ্চিত আমার ওজন কমে আবার আগের মতো ৫০-৫৫ কেজির ঘরে চলে আসবে … আবার নিজের আগের রূপ ফিরে পাবো …  এদিক-সেদিকের মানুষজনেরা দেখে বলবে, ‘ওয়াও, প্রজ্ঞা, তুমি/তুই এত সেক্সি!’ …  মাঝখানে ২০১৪ সালের শেষের দিকে যখন টানা তিনমাস ব্লিডিং-এর ধাক্কায় ওজন ৬৫-৭০ কেজিতে নেমে গিয়েছিলো তখনও আশেপাশের তথাকথিত বড়ভাইরা বলেছে, ‘তুই হঠাৎ এত সেক্সি হয়ে গেলি কীভাবে?’ ‘ খালি আছি, প্রেম করবা?’ … আর যদি ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে থাকার সময়কার অবস্থায় ফিরে যাই, তখন না জানি কি হবে! …

মোট কথা, নিজেকে দেখতে এখন আর ভালো লাগে না …  বড় আয়নাটায় নিজেকে দেখা অনেকদিন আগেই বাদ দিয়েছি …  কিন্তু লিফটে উঠতে-নামতে নিজের পুরো অবয়বটা দেখতেই হয় প্রতিদিন … কত কত দীর্ঘশ্বাস লিফটের ভেতর জমাট বেঁধে থাকে দিনের পর দিন …

সপ্তাহটা কেমন গেলো সেই সম্পর্কে আর কি-ই বা লিখবো? … শেষ দিনযাপন লিখেছিলাম যেন কবে? …  জানুয়ারির ১৫ তারিখ বোধহয় … তারমানে গত সপ্তাহের সোমবারে …  এরপরে বেশ ইভেন্টফুল সপ্তাহ গিয়েছে … ওই সপ্তাহটা বেশ মুভি দেখে কেটেছে … ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের বিভিন্ন সিনেমা … দুইদিন আলিয়ঁস ফ্রসেঁস-এ  মুভি দেখলাম … একদিন ‘খাঁচা’ দেখতে গেলাম পাবলিক লাইব্রেরিতে … পাভেল ভাইয়ের অভিনয় দেখতেই যাওয়া মূলত … সন্ধি আর আমি … পরে ওখানে গিয়ে আবার গ্রুপের অনেকের সাথেই দেখা হলো … মাঝখানে আবার স্কুলের সমাপনী প্রযোজনার শো ছিলো, ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ির শো ছিলো … গতকালকে আবার স্বরসতী পূজা ছিলো … জগন্নাথ হলে গেলাম সন্ধ্যায় … একা একাই … ওখানে গিয়ে শুভ’র সাথে যোগাযোগ করে ওকে পেলাম … কিন্তু ও আবার গ্রুপে যাবে, তো একা একা মানুষের ভিড়ে কই ঘুরবো চিন্তা করে আমিও গ্রুপেই চলে গেলাম … ভাবলাম পরে গ্রুপ থেকে বের হয়ে আবার যাবো … কিন্তু কারো খুব একটা আগ্রহ দেখলাম না … আবার যখন চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে উবারের গাড়ি ডেকে ফেলেছি, তখন দেখি হঠাৎ একটা কথাবার্তা চলছে জগন্নাথ হলে যাবার … যাই হোক, খুব ইচ্ছা ছিলো যে কালকে জগন্নাথ হলে গিয়ে একটু ঘুরে ফিরে আড্ডাবাজি করে সময় কাটাবো … শাড়ি পরে বের হয়েছিলাম সেই মুডেই … আলিমেটলি সেটা হলো না … পুরোটা সন্ধ্যা গ্রুপেই বসে রইলাম … র‍্যান্ডমলি ঘুরতে ঘুরতে কারো সাথে দেখা হলেও হতে পারতো, সেটাও হলো না … আজকে যখন জানলাম সেই ব্যক্তিটিও গতকাল জগন্নাথ হলে গিয়েছিলেন, তখন মন আরও বেশি খারাপ হয়ে গেলো এই ভেবে যে ‘এই হচ্ছে আমার কপাল! যা যা ভাবি যে এভাবে এভাবে হলে বেশ নাটকীয়ভাবে একটা ভালো লাগার পরিস্থিতি তৈরি হবে, তার সব নিয়ামকই উপস্থিত থাকে, খালি ওই ‘ভালো লাগার পরিস্থিতি’ টা তৈরি হয় না’ …

যাই হোক, কালকে সকাল থেকেই মন-মেজাজ একটু খারাপ হয়ে ছিলো, সারাদিনের বিভিন্ন ঘটনায় সব মিলিয়ে পরে তার ইন্টেন্সিটি এতই বেড়েছে যে সেই যে রাতে বাসায় ফেরার পথে উবারের গাড়িতে বসেই চোখ ফেটে কান্না আসলো, আর আমি খুব নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে খুব সাবধানে দুই/তিন ফোঁটা পানি গড়াতে দিলাম … তখন থেকে এই এখন অব্ধি আমার চোখের পানির সাপ্লাই বন্ধ হয়নি … আজকে স্কুলেও সারাদিন খুব ঝিম মেরে ছিলাম … এমনকি ক্লাসে যখন ঢুকেছি, আমার চেহারা এমনই গোমড়া ছিলো যে স্টুডেন্টরা সব নিজেরাই চুপ হয়ে গেছে … বাসায় ফিরে বাথরুমে গিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ চেপে বেশ একটা হাউমাউ টাইপের কান্না দিয়েছি … তখন আবার এটা মনে হয়েছে যে এটা তো তোয়ালে না হয়ে একটা রক্তমাংসের মানুষ হতে পারতো, যার বুকে মুখ লুকিয়ে আমি এভাবে কাঁদতাম! সেইরকম কেউ আমার জীবনে কখনো আসে নাই, হয়তো কখনো আর আসবে না এই আবেগ উথলে উঠলো … তাতে কান্নার মাত্রা আরও একটু বাড়লো …

ভালোই লাগছে না কিছু …  একদমই ভালো লাগছে না …

দেলফ আ-দো পরীক্ষার নাম্বার দিয়েছে … বিকালে মা’র মোবাইলে মেসেজ এসেছে … ফোনে নেট চালু থাকায় আমি অনেকক্ষণ ধরেই মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন পাচ্ছিলাম যে আমাদের ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সের ব্যাচমেট-রা সবাই কিছু একটা নিয়ে খুব আলাপ-আলোচনা করছে … কিন্তু যেহেতু ফোন থেকে আমি ম্যাসেঞ্জারে ঢুকতে পারি না, তাই বুঝতেও পারছিলাম না কি নিয়ে কথা হচ্ছে … পরে মা যখন রাতে বললো যে বিকালে আলিয়ঁস থেকে মেসেজ এসেছে দেলফ-এর রেজাল্টের ব্যাপারে, তখন বুঝলাম ….  যা হয় আর কি! কপালের ফের-এ  ৭৯.৫% নাম্বার পেয়েছি … ০.৫% এর গিট্টূটা থাকতেই হলো … এইরকম মন খারাপের অবস্থায় এই গিট্টু লাগা রেজাল্টটা আরেকটা লেয়ার হিসেবেই যুক্ত হলো … কিছুই বলার নাই আসলে …

আর কি-ই বা লিখবো আজকে? …  সাড়ে সাতটার দিকে বাসায় ঢুকেছি … তারপর গোসল করে-টরে ফ্রেশ হয়ে এসে সেই যে দিনযাপন লিখতে বসেছি, এতক্ষণ ধরে লিখে, মাঝখানে উঠে উঠে কয়েক দফা কান্নাকাটি করে এই এখন লেখার শেষ পর্যায়ে আসলাম … এখন বাজে রাত পৌনে ১২টা …  দুই সেট ওয়ার্কশিট দেখার আছে … সেগুলো নিয়ে এখন বসবো হয়তো …

দিনযাপন । ১৪০১২০১৮

স্কুল খোলা থাকলে যা হয় … স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে দেখি যে সময়ের সাপেক্ষে কাজের পরিমাণ বেশি হয়ে গেছে … তখন প্রায়োরিটি সেট করতে হয় যে কোনটা করবো আর কোনটা করবো না … বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে ওয়ার্কশিট, হ্যান্ডআউট ইত্যাদি তৈরি, খাতা দেখা কিংবা পরের দিনের এক্সপ্লেনেশন কাজের জন্য পড়ালেখা করতে গিয়ে দিনযাপন লেখাটাকেই তালিকার শেষে নিয়ে যেতে হয় … আর তারপর আগের কাজগুলো শেষ করতে করতেই রাত ১২টা/১টা পার করে ফেলি … আর তারপর ঘুমের রাজ্যে যখন পৃথিবী ‘হাই’ময় হয়ে যায়, তখন ঢুলুঢুলু চোখে বিছানা পর্যন্ত গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি … দিনযাপনের কিচ্ছা-কাহিনি তারপর আর লেখা হয়না …    

গত ৬ তারিখ স্কুল খোলার পর এই আজকে অব্ধি তাই-ই হলো … কিন্তু এর মধ্যে লেখার মতো টুকটাক গল্প ছিলো অনেক … আজকে দিনযাপন লিখতে বসে অনেককিছুই মনে করতে পারছি না … কিন্তু যখন সেগুলো ঘটেছে, কিংবা যেই চিন্তাটা মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে তখন মনে হয়েছে সেটাকে দিনযাপনে লিখে আর্কাইভ করে রাখাটা নিজের জন্যই জরুরি …

এই যেমন একদিন ভোরবেলা কি কি জানি স্বপ্ন দেখছিলাম … সবটুকু মনেও নাই … কিন্তু একপর্যায়ে দেখলাম সিএনজি করে কোথাও যাচ্ছি আর তখনই পেছন থেকে সিএনজি’র ঢাকনা কেটে কেউ আমার ব্যাগের দিকে হাত বাড়িয়েছে ল্যাপটপ নেবে বলে … আর ঠিক তখনই এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে ঘুম ভাঙলো … মনে হলো যেন কেউ আমার ঘাড়ে হাত রেখেছে … আমি সত্যি সত্যিই যেন ঘাড়ে একটা শক্ত হাতের অস্তিত্ব অনুভব করলাম … যেন কেউ ঘাড়ে চাপড়ে দিয়ে আমাকে ঘুম থেকে তুলে দিয়েছে … আমি খুব ভয়ের অনুভূতি নিয়ে প্রায় লাফ দিয়ে উঠে পাশে রাখা ল্যাপটপটা জায়গামতো আছে কি না সেটা দেখলাম … আমার মনে হচ্ছিলো সত্যি সত্যিই আবার চোর এসেছে কি না, আর ঘরে ঢুকেই ল্যাপটপ নিয়ে যাচ্ছে কি না … কিন্তু ওই অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে ঘুম ভাঙ্গার ফলে যেটা হলো যে কাজ থাকা সত্ত্বেও আমি গত সপ্তাহে ল্যাপটপ নিয়ে রাস্তায় বের হবার ভরসা পাইনি … এই যে আজকে যেমন উপায়ান্তর ছিলো না বলে ল্যাপটপ নিয়েই স্কুলে গিয়েছিলাম … কারণ অনেকগুলো ওয়ার্কশিট তৈরি করার দরকার ছিলো আজকেই … সকালে আবার স্কুলে গিয়েছিও অপরিচিত সিএনজিতে করে … স্কুল পর্যন্ত পৌঁছানো নাগাদ খুব অস্বস্তি কাজ করছিলো মনে … আর ভাবছিলাম, কি অদ্ভুত অবচেতন মন আমাদের!

ইদানীং খুব ভুলোমনা থাকি এম্নিতেই … এখানে পানির বোতল ফেলে আসি, তো ওখানে চশমা … এইটা নিতে ভুলে যাই, তো ওটা দিতে ভুলে যাই … এই কথা মনে থাকে তো ওই কথা মনে থাকে না … খুব চোখে পড়ার মতো বেখেয়ালি থাকি ইদানীং … এমনকি স্কুলে এক-দুইজন জিজ্ঞেস করেই ফেলেছে, ‘কিরে,তুই কি খুব টেনশনে আছিস কিছু নিয়ে? নাকি কিছু নিয়ে ডিস্টার্ড? খুব ভুলে যাচ্ছিস এটা-ওটা ইদানীং’ … আমি উত্তরই বা কি দিবো? নিজেই তো ভেবে পাইনা এইটা কেন হচ্ছে? কিসের আলামত? … ল্যাপটপ হারানো নিয়ে ওই অস্বস্তিকর অনুভূতির স্বপ্নটা দেখার পর থেকে মনের মধ্যে কেবল এই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে যে বড় কিছু হারানোর সংকেত না তো?

আবার আরেকদিন স্কুলের একটা ছোট্ট ঘটনা নিয়ে লিখতে চাইছিলাম … ঘটনাটা ছোটো হলেও সেটার ইমপ্যাক্ট আমার জন্য অনেক প্রবল ছিলো … সমাজ, সামাজিকতা, আধুনিকতা অনেককিছু নিয়ে অনেক ভাবনা মনে ঘুরপাক খাচ্ছিলো … যেটা হলো যে স্কুলে এক ছাত্র আমাকে খুব ক্যাজুয়াল টোনে বলে উঠলো যে ‘ মিস, সিএনজি-তে বসে এত কি কথা বলেন? স্কুলের সামনে সিএনজি থামিয়ে আপনি এত সময় নিয়ে নামলেন, সিএনজিওয়ালার সাথে কথা বললেন, আর আমার গাড়ি আপনার সিএনজি’র পেছনে অতক্ষণ দাঁড়ায় থাকতে হলো!’ … আমি ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে অনেকই বন্ধুসুলভ, কিন্তু তাই বলে তাদের কাছ থেকে এধরনের আচরণ পাবার জন্য বা কথা শুনবার জন্য কখনোই প্রস্তুত নই! … আমি মনে মনে খুব আহত হলেও রিঅ্যাকশনটা খুব ঠাট্টাচ্ছলেই দিলাম যে ‘ আমি সিএনজিতেই থাকি, রিকশাতেই থাকি আর গাড়িতেই থাকি, আমার যতক্ষণ খুশি ততক্ষণ সময় নিয়ে নামবো … পেছনে তুমিই থাকো আর হম্বিতম্বিমার্কা কেউই থাকুক, আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না’ … কিন্তু সারাদিন আমাকে ওই ছাত্রের কথাটা, ওর কথা বলার টোনটা ভাবালো … ১৩/১৪ বছরের একটা ছেলের মধ্যে শিশুসুলভতা পাওয়া যায় না কেন? সেই ছেলেটা এখনই এই বয়সেই কেন এত বৈষয়িক ভাবনা ভাবে? টিচারদের প্রতি সম্মানের জায়গাটা এখনকার বাচ্চাদের মধ্যে পাওয়া যায় না কেন? তাদের কাছে শিক্ষকের সংজ্ঞা কি? … এইসব অনেককিছুই ভেবেছি … সেদিন দিনযাপন লিখলে হয়তো এই ভাবনাগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখতাম …

এর মধ্যে একদিন ‘বনমানুষ’ এর শো ছিলো … আবার ১২ তারিখে সর্বনামের শো ছিলো … তাও আবার ‘১৬তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ হচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন ভেন্যু জুড়ে, সেটার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে … জাদুঘরে শো শেষে আবার সেদিন গ্রুপেও গেলাম … গ্রুপে যেতে যেতে খুব মনে করার চেষ্টা করছিলাম এগজ্যাক্টলি শেষ কবে গ্রুপে গিয়েছিলাম … কিন্তু সেটা কিছুতেই দিন-তারিখের সাপেক্ষে মনে করতে পারলাম না … এমনকি শেষ কোন মাসে গিয়েছিলাম সেটাও দেখলাম কিছুতেই মাথায় আসছে না! … ১৬ তারিখে অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইন স্কুলের শো … ৩৪তম ব্যাচের সমাপনী প্রযোজনা … মনোজ মিত্রের ‘নৈশভোজ’ নাটকটা মঞ্চস্থ করবে ওরা … এবারের ব্যাচে আবার তিনজন খুব পরিচিত মানুষ আছে … জবাদি’র বোন ঝুমা’পু, পাঠশালার মিনহাজ মারজু, স্কুলের অরুণদ্যুতি আপুর বোন অদ্রি … প্রতিবারই ঘুরে ফিরে আর কিছু না হোক ছবিটা তোলার দায়িত্বটা আমার ঘাড়েই পড়ে … আমিও প্রতিবারই ‘আর এই দায়িত্ব নেবো না’ ভেবে ভেবে শেষমেশ শো-এর আগে যখন বলে ‘প্রজ্ঞাদি, ফটোগ্রাফি কি আপনি করবেন?’ তখন আর ‘না’ বলি না … থিয়েটারের ছবি তোলার নেশা আমাকে ‘আর ছবি তুলবো না’ প্রতিজ্ঞা রাখতে দেয় না …

ইদানীং অনেক জায়গাতেই আমি অবশ্য খুব কঠিন মুখে, শক্ত কণ্ঠে বলে ফেলি, ‘আমি আর ছবি-টবি তুলি না … ক্যামেরাও নাই’ … নিজের ‘ফটোগ্রাফার’ পরিচয়টাকে ঝেড়ে-মুছে ফেলে দিতে চেষ্টা করি … শখের বশে ছবি তুলি এইটুকু বলতেই ভালো লাগে … ছবি তোলা নিয়ে কি প্যাশন ছিলো, কি পড়ালেখা করেছি এইসব নিয়ে আর কথা বলতে ভালো লাগে না … পাঠশালা সার্কেলটা থেকেই তো এখন কত দূরে সরে গেছি, কিংবা নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি … আজকে অনেকদিন পড় অবশ্য আলিয়ঁস ফ্রসেঁস-এ গিয়ে মাওয়া আপাকে দেখে তার সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্পগুজব করলাম … নিজেই যেচে গিয়ে মাওয়া আপার সাথে হাই-হ্যালো করলাম … হঠাৎ কি মনে হলো কে জানে … বেশিরভাগ সময়ই তো দূর থেকে দেখে এড়িয়েই যাই পাঠশালার মানুষদের … আজকে একটু নিয়ম ভঙ্গ করলাম …

নিজের অনেক নিয়মই আজকাল এভাবে ভেঙ্গে ফেলি … ভেঙ্গে ফেলছি … হয়তো এটা নতুন কোনো রূপের সূচনা আমার … হয়তো বয়সের সাথে সাথে চিন্তার পরিবর্তন … কিংবা যেকোনো কিছু …

যাই হোক, আজকে সারাদিনে বেশ দুই-একটা প্ল্যান বানচালের ঘটনাও ঘটলো … যেমন আজকে শাকরাইন উৎসব হয়েছে পুরান ঢাকায় … এটা আসলে পৌষ সংক্রান্তি উৎসব, সেখানে ঘুড়ি ওড়ানো হয়, আতশবাজির খেলা হয় … এটাকে কেন শাকরাইন বলে সেটা আমি সঠিক জানি না … যেসব দৃশ্য দেখে আমি খুব সহজেই মুগ্ধ হই, তার মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে আতশবাজির খেলা একটা … তাই এই পৌষ সংক্রান্তি উৎসবও আমার বেশ ভালো লাগার একটা উৎসব … কিন্তু গত তিন বছর ধরে টানা যাইনা এই উৎসবে … তার একটা বড় কারণ পিরিয়ডের সাইকেল … কীভাবে কীভাবে ঘুরে-ফিরে আমার পিরিয়ডের সাইকেলটা এই ১৪-১৫ তারিখের দিকেই এসে বারবার থিতু হয় আর সেটাও ঠিক সেই মাসগুলোতেই, যেইসময়গুলোতে এই ১৪-১৫ তারিখের সময়টাতেই বিভিন্ন উৎসব-পার্বন থাকে … ডিসেম্বর মাসে যেমন বিজয় দিবসের প্রোগ্রামে যেতে পারলাম না, আজকে সেরকমভাবে শাকরাইনে যাওয়া মিস হলো … আগামী মাসে এইরকম সময়েই পহেলা ফাল্গুন আসবে … স্বরসতী পূজা আসবে … মার্চে হয়তো কানের পাশ দিয়ে গুলি যাওয়ার মতো বেঁচে যাবো … এপ্রিলে এই সময়টাতেই পহেলা বৈশাখ … আর এইসব উৎসব মানেই স্কুলে শারি-টাড়ি পরা … গ্রুপেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান থাকা … আর আমি? …

এই যে পরশুদিন প্রাচ্যনাট স্কুলের সমাপনী প্রযোজনার শো, সেখানে আমি শাড়ি পরবো, এমনকি কি শাড়ি পরবো সেটাও মনে মনে ঠিক করে রাখা … অথচ এখন শাড়ি পরার প্ল্যান বাদ কারণ পিরিয়ডের তৃতীয় দিনে আর যাই হোক শাড়ি পরে শিল্পকলা একাডেমিতে যাওয়ার বিলাসিতা আমাকে মানায় না … স্কুলে হলে তাও না হয় ঘণ্টায় ঘণ্টায় স্যানিটারি প্যাড চেঞ্জ করার ট্রাবলটা শাড়ি পরেই নিতে পারতাম, কারণ আর যাই হোক বাথরুমটা পরিষ্কার … শিল্পকলা একাডেমিতে তো আর তা না … ওইখানকার মোটামুটি চলনসই বাথরুমে প্যাড চেঞ্জ করা যায়, কিন্তু শাড়ি পরে সেই হুজ্জত নেয়ার মানে হয় না … অতএব, ওইদিনও শাড়ি পরার প্ল্যান বাদ …

খুব নাচছি যে এবার পহেলা ফাল্গুনে জারুল রঙ্গা পাড়ের সাদা শাড়ি, হলুদ গয়না পরে, মাথায় হলুদ ফুল গুঁজে খুব ‘জারুল থিম’এর ফাল্গুনের সাজ দেবো … দেখা যাবে ফেব্রুয়ারি মাসে ১৩ তারিখেই পিরিয়ডের প্রথম দিন বয়া দ্বিতীয় দিন থাকবে আর আমি বারবার বাথরুমে যাওয়ার প্যানায় কোনোমতে একটা সালোয়ার কামিজ পরে স্কুলে গিয়ে বসে থাকবো …

আজকে নিজে নিজেই আরেকটা প্ল্যান বানচাল করলাম … ওই যে ১২ তারিখে সর্বনাম যেই চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান গাইলো, সেটারই একটা ভেন্যু আলিয়ঁস ফ্রসেঁস … তো আমি মনে মনে একটা প্ল্যান করেছিলাম যে এই সপ্তাহে প্রতিদিন অন্তত বিকাল ৪টা আর সন্ধ্যা ৬টার শো দেখবো আলিয়ঁসে … আজকে বিকাল ৪টায় ছিলো ভারতীয় ম্যুভি ‘আ ডেথ ইন দ্য গুঞ্জ’ … আর ৬টায় ছিলো ফরাসী ম্যুভি ‘লার্ব’ (L’Arbre) … তো ‘লার্ব’  আজকে দেখবো বলে ঠিক করেছিলাম, কিন্তু কালকে আবার রাতের বেলা শৌণক-দের সাথে আমাদের গ্রুপ চ্যাট-টায় কথা বলতে বলতে ঠিক হলো যে শুক্রবার ২টায় এই ম্যুভিটা আবার দেখাবে, ওইদিন যেহেতু ক্লাস আছে, তাই ক্লাসের শেষে সবাই মিলে ওই ম্যুভিটা দেখবো … তাই আমিও আজকে সকাল থেকে ভাবলাম যে তাহলে আমি আর আজকে দেখে ফেলবো কেন? একবারে শুক্রবারেই না হয় সবার সাথে দেখবো … ‘আ ডেথ ইন গুঞ্জ’ দেখার ব্যাপারে একটু মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিলো … আবার এটাও ভাবছিলাম যে ম্যুভি দেখতে গেলে তো একা একাই দেখতে হবে, আর একা একা ম্যুভি দেখা ব্যাপারটা আমার কাছে খুব বোরিং একটা বিষয় মনে হয় … মানে, একটা ম্যুভি দেখছি, সেটা নিয়ে যদি পাশে কারো সাথে অনুভূতির শেয়ারই করতে না পারলাম, তাহলে মনে হয় যে ম্যুভিটা খালি দেখেই যাচ্ছি, কিন্তু কাহিনী কিছুই মাথায় নিচ্ছি না … বাসাতেও যখন একা একা সিনেমা দেখি, তখনও এমন হয় … মনে হয় যে কেবল চোখের সামনে ল্যাপটপ স্ক্রিনে দৃশ্যগুলো চলতেই থাকে, কিন্তু সিনেমা শেষে অনেককিছুই মনেই রাখতে পারি না … অথচ যেই সিনেমা দলে-বলে দেখি, অন্তত একজন সঙ্গী নিয়েও দেখি, সেই সিনেমার কাহিনীর পড় কাহিনী মনে রাখতে পারি … তো এই ‘একা একা সিনেমা দেখবো? না থাক?’ ভাবনার সাথে এই অস্বস্তিও যোগ হলো যে পিরিয়ড চলছে, আজকে প্রথম দিন বলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় না হলেও দের-দুই ঘণ্টায় একবার হলেও প্যাড চেঞ্জ করছি, এই অবস্থায় সিনেমা দেখতে যাওয়াটাও একটা যন্ত্রণা … তো এইসব চিন্তা করে ‘আ ডেথ ইন গুঞ্জ’ দেখার পরিকল্পনাও বাদ দিলাম … এদিকে আলিয়ঁস মনে মনে কনফিউশন ছিলো বলেই কি না জানি না, ঘুরে ফিরে ওই সিনেমা শুরু হবার কাছাকাছি সময়েই আলিয়ঁসে গেলাম ঠিকই … আবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে পরিচিত মুখও খুঁজলাম, কাউকে পাওয়া যায় কি না … ডিইউএফএস-এর কেউ, ম্যুভিয়ানার কেউ, জার্নাল ভাই, কিংবা প্রাচ্যনাটের আর কেউ … আলিয়ঁসের ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সের কেউ … ভাবলাম যে এদিক-ওদিক খুঁজলে কাউকে না কাউকে নিশ্চয়ই পাবো যে ম্যুভিটা দেখতে এসেছে … না হয় তার সাথেই জোট বাঁধবো … কিন্তু কাউকেই দেখলাম না আশেপাশে … তো আমিও তখন মনে মনে ‘নাহ! থাক! এত প্যানা নিয়ে একা একা ম্যুভি দেখবো না’ বলে আলিয়ঁসেই ব্যাগ-ট্যাগ রেখে পাশের মমতাজ প্লাজায় গিয়ে কালকের স্কুলের জন্য একটা ওয়ার্কশিট প্রিন্ট করায় ফটোকপি করানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম …

[ পরে অবশ্য জেনেছি যে মঁসিয়ু সুমাদ্রি ‘আ ডেথ ইন গুঞ্জ’ দেখেছেন … উনি আছেন জানলে উনার সাথেই বিনা দ্বিধায় জোট বাঁধা যেতো … গতকালকে রাতে অবশ্য উনার সাথে আজকের ম্যুভি দেখা নিয়েই কথা হচ্ছিলো … উনি যেহেতু নিশ্চিত কিছু বলেন নাই, আমিও তাই আজকে আলিয়ঁসে যাওয়ার আগে আর উনাকে ফের নক করিনাই যে উনি আজকে ম্যুভি দেখতে আসবেন কি না … ভেবেছি যে আজকে আবার উনাকে ম্যুভি দেখার ব্যাপারে প্রশ্ন করলে উনি না আবার ভাবে যে আমি বেশিই গায়ে পড়ে যাচ্ছি … মানে, এমনিতেও তো আমার সবসময়ই খুব ফ্রি অ্যান্ড ফ্র্যাঙ্ক সম্পর্কের কেউও কোনো পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ‘না বোধক’ রেসপন্স করলে আমার তাকে ফের ওই ব্যাপারে প্রশ্ন করতে অস্বস্তি লাগে, উনার সাথে এইসব ব্যাপারে অস্বস্তির মাত্রা আরও কয়েকগুণ হওয়াটাই স্বাভাবিক আর কি! … যাই হোক, যেহেতু এমনিতেও  ‘আ ডেথ ইন গুঞ্জ’ দেখার ব্যাপারে আমার খুব একটা আবেগ কাজ করছিলো না, তাই এইটা নিয়ে খুব একটা ‘আহা-উহু’ ফিলিংসও কাজ করেনাই… ]

কাজ শেষ করে আলিয়ঁসে ফিরতে ফিরতে ভাবলাম যে সকালে খুব ভয়ে ভয়ে সিএনজি-তে করে ল্যাপটপটা বহন করে নিয়ে এসেছি, এখন যাবার সময় অন্তত তা করবো না … এর মধ্যে খুব শীতও লাগছিলো, আবার শরীরও কেমন ম্যাজম্যাজ করছিলো … তো ভাবলাম যে একটা উবার ডাকি … এদিকে আজকে রবিবার, কিন্তু গ্যালারিতে প্রোগ্রাম হচ্ছিলো দেখে ক্যাফে খোলা … তো ইচ্ছা হলো এক কাপ কফি খেয়ে তারপরেই না হয় যাই … মানে, মনে মনে আসলে চিন্তা এমন যে এখনও যদি পরিচিত কারো সাথে দেখা হয়ে যায় আর সে যদি সন্ধ্যার ম্যুভিটা দেখে তাহলে আমিও লোভ সংবরণ না করে দেখে ফেলবো … প্রয়োজনে শুক্রবারে দ্বিতীয় দফা দেখবো … ফরাসী ভাষার সিনেমা তো আমার একবারের বেশি দুইবার দেখলে ক্ষতি নাই … তো সেরকম কারো দেখা পেলাম না … মাওয়া আপাকে দেখলাম বসে আছেন … উনার মেয়ে ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ শেখে, তো উনি মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন ক্যাফেতে… তো উনার সাথে কিছুক্ষণ বসে বসে গল্প করলাম … এর মধ্যে উবারের গাড়িও চলে আসলো … তো উবারের গাড়ি যেহেতু ডেকেই ফেললাম, আর সেটা চলেই আসলো, কারো সাথে আর দেখা হবে কি হবে না সেই তাড়নাকে আজকের মতো কপাট দিয়ে বাসায় চলে আসলাম …

এইসব চলচ্চিত্র উৎসব-টূৎসব আসলে আমার ছোটোবেলার একটা স্মৃতি খুব ফিরে ফিরে আসে … কত সালের কথা সেটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না … ১৯৯৭-৯৮ হবে হয়তো … কিংবা তারও কিছুটা আগে … সেবার ঢাকায় কান চলচ্চিত্র উৎসব হলো … জাদুঘর আর পাবলিক লাইব্রেরিতে দফায় দফায় বিভিন্ন সিনেমার শো থাকতো প্রতিদিন … আব্বু সেসময় আগে থেকেই প্রতিদিনের সিনেমার পাস/টিকিট সব জোগাড় করে ফেললো … যেই কয়েকদিন চলচ্চিত্র উৎসব চললো, আব্বু শিডিউল দেখে দেখে প্রায় প্রতিদিনই সকাল থেকে বিকাল অব্ধি ম্যুভি দেখতো … বাসার আমরা বাকি সবাই-ও এক-দুই দিন গিয়েছি ম্যুভি দেখতে … আমার তিনটা ম্যুভির কথা খুব মনে আছে … একটা ব্রিটিশ ম্যুভি, ‘দি ফুল মন্টি’… একটা জার্মান ম্যুভি, ‘আ উইন্টারস টেল’ … আরেকটা কোন দেশের ম্যুভি মনে নাই, তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য নিয়ে সেই ম্যুভিটা ছিলো তা বেশ মনে আছে … নাম, ‘আ ওয়ার্ল্ড অ্যাপার্ট’ … ‘শঙ্খনীল কারাগার’ও কি ওই উৎসবেই দেখেছিলাম কি না নিশ্চিত মনে পড়ছে না … ওই কান চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার আর কোনো স্মৃতি আমার মনে নাই … কীভাবে গেছি, কি করেছি … কিছুই না … খালি এই ম্যুভি তিনটা দেখার কথা মনে আছে … সেটাই সম্ভবত আমার জীবনে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক উৎসবে ম্যুভি দেখতে যাওয়া …

যাই হোক, আজকে আর লিখবো না … ঠাণ্ডায় আমার হাত-পা মনে হচ্ছে জমে যাচ্ছে … এবার ঢাকায়, ইনফ্যাক্ট সারা বাংলাদেশেই রেকর্ড ব্রেক করা ঠাণ্ডা পড়েছে … পুরো উত্তর গোলার্ধই অবশ্য এবার ঠাণ্ডায় কাবু … নর্থ পোলের কাছের দেশগুলাতে তো ওরা উইন্টার ডিজাস্টারই বলছে এই ঠাণ্ডাকে … নায়াগ্রা জলপ্রপাত জমে গেছে … ফ্লোরিডাতে প্রায় শ’খানেক বছর পরে তুষারপাত হয়েছে … বাংলাদেশেও ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ধরা পড়েছে তেঁতুলিয়ায়, ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস … ঢাকায় তো তাপমাত্রা ১০ থেকে ১৫’র মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে গত এক সপ্তাহ ধরে … কোনো কোনোদিন সকালবেলা ৮ ডিগ্রি পর্যন্তও নেমেছে! … এই ঠান্ডার মধ্যে মোটামুটি চার-পাঁচ লেয়ারের শীতের কাপড় পরে ভোরবেলা ৭টা সময় বের হয়ে স্কুলে গেছি … তাও সিএনজি-তে করে … এমনও হয়েছে স্কুলে পৌঁছে ১০/১৫ মিনিট খালি শীতে কেঁপেছি! … বাসায় তো মনে হয় আরও ঠাণ্ডা … হাড়গোড় শুদ্ধ যেন কুঁকড়ে যায় … গত তিন/চারদিন ধরে রুম হিটারের বদান্যতায় টিকে আছি … সন্ধ্যার পর থেকে রুম হিটারটা ছাড়া থাকে বলে ঘরের তাপমাত্রা তাও একটু কম মনে হয় …

আচ্ছা, শেষ করি আজকে …

তবে, একটা বিষয় নিয়ে একটু ক্যাচালে পড়লাম … প্রতিদিনের দিনযাপনের লিঙ্ক দিবো যে বলছিলাম, এখন তো পুরো এক সপ্তাহের লিঙ্ক এখানে দিতে হবে, তাও দুই বছরের লেখার! … নাকি শুধু ১৪ জানুয়ারি তারিখটা ধরেই লিঙ্ক দেবো? … বুঝতে পারছি না … ২০১৭ সালে অবশ্য ৮ তারিখের পরে জানুয়ারি মাসে আর দিনযাপনই লিখিনাই! …  

৮ জানুয়ারি ২০১৭

https://prajnatrubayyat.wordpress.com/2017/01/09/

১৪ জানুয়ারি ২০১৬

https://prajnatrubayyat.wordpress.com/2016/01/15/2286/

১২ জানুয়ারি ২০১৬

https://prajnatrubayyat.wordpress.com/2016/01/13/

৮ জানুয়ারি ২০১৬

https://prajnatrubayyat.wordpress.com/2016/01/09/

৭ জানুয়ারি ২০১৬

https://prajnatrubayyat.wordpress.com/2016/01/08/

     

দিনযাপন । ০৬০১২০১৮

মাঝে মাঝে এমন কিছু দিন যায় যখন মনে হয় দুনিয়ার সবকিছুই উঠেপড়ে লেগেছে কীভাবে আমাকে ত্যক্ত-বিরক্ত রাখা যায় … এই যেমন গতকালকে প্রায় তেমন একটা দিন গেলো … আজকে তেমন একটা দিন গেলো … পুরাই মেজাজ খারাপ আর মনে মনে যত বিশ্রী গালি জানি নিজেকে, একে, তাকে, পুরা দুনিয়াদারীকেই সেসব গালি দিতে দিতে দিন গেলো …

আমি খুব চিন্তা করে দেখলাম যে আজকে পর্যন্ত ২০১৮ সালের ৬টা দিন গেলো … ৬টা দিনই দিনের কোনো না কোনো ভাগে এমন একটা কিছু ঘটনা ঘটেছে বা এমন কোনো কথা শুনেছি যে মেজাজ তিরীক্ষি করেই দিনের বাকি অংশ কেটেছে …

এই যেমন গতকালকে … সারাদিনই যেমন-তেমনই যাক, দুপুরে একবার মা’র একটা কথা শুনে মেজাজ চড়ে গেলো … তারওপর সন্ধ্যায় এক মহাবিরক্তিকর ‘ফ্যামিলি টাইম’ পার করলাম … কামতার প্রমোশন হয়েছে এই আনন্দে টিয়াম, লালাম আর মা মিলে নাকি একটা ট্রিট দেবে, তো সেই ট্রিট-এর দাওয়াতে আমার যাওয়ার মোটেই ইচ্ছা ছিলো না, তবু টিয়াম, লালাম আর মা’র দলবদ্ধ ঘ্যানঘ্যানাতিতে শেষমেশ বের হওয়াই লাগলো সবার সাথে … দুই/তিনদিন আগে টিয়াম বলে রেখেছিলো যে প্রোগ্রামটা হবে বিজয় স্মরণিতে ‘থাই চি’ নামে এক রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানে হবে … তো আমি ভাবলাম যে সেখানে নিশ্চয়ই বুকিং-টুকিং দিয়ে ব্যবস্থা করবে টিয়াম … কালকে গাড়িতে ওঠার পর জানা গেলো আসলে কোথায় যাওয়া হবে তার কিছুই ঠিক হয় নাই … কটু মামা নাকি থাই চি গিয়ে দেখেছে যে সেখানে বিয়ের প্রোগ্রামের জন্য সব বুকড, তাই ওখানে বসা যাবে না … তো তারপর সিচুয়েশন এমন হলো যে আমরা একদল মিরপুর থেকে ধানমন্ডির দিকে এক নিরুদ্দেশ যাত্রা করছি, কামতারা পল্টন থেকে ধানমন্ডির দিকে এক নিরুদ্দেশ যাত্রা করছে আর মাঝখানে কটু মামা বিজয় স্মরণি থেকে ধানমন্ডি ২৭ নাম্বার পর্যন্ত লাইন ধরে একটা একটা করে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে খোঁজ নিয়ে বেড়াচ্ছে যে কোনটায় ১৪-১৫ মিলে বসে খাওয়া যাবে! … এইরকম পরিকল্পনাতে আমি সবসময়ই খুব বিরক্ত হই … কালকে যেহেতু স্কুলের অনেকগুলা পেন্ডিং কাজ রেখে বের হয়ে গেছি, আরও বেশি বিরক্ত লাগছিলো … এমনিতেও এইসব দেশি চাইনিজ খাবার দাবার আমার ভালো লাগে না … নিতান্তই বাধ্য হয়েই খেতে হবে চিন্তা করেই বের হয়েছি … তারওপর এইরকম প্ল্যান! … এদিকে যেই গাড়ি ভাড়া করেছে তার ড্রাইভার একে তো রাফ চালায়, তারওপর গোয়ার্তুমি করেই চললো … আমার খুব বিরক্ত লাগছিলো যখন উনি সরু গলির মধ্যেও প্রচণ্ড জোরে গাড়ি চালাচ্ছিলো আর সামনে কেউ চলে আসলেই তাকে উল্টা মুখ খারাপ করে গালি দিচ্ছিলো! … তো যাই হোক, শেষমেশ ধানমন্ডি ২৭ নাম্বারে ‘সিক্স সিজন্স’ নামে এক চাইনিজ রেস্টুরেন্টে জায়গা পাওয়া গেলো … আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছিলো আমি নেমে গিয়ে বেঙ্গল বইয়ে বসে থাকি, বাকিরা খাওয়া-দাওয়া সেরে আমাকে যাওয়ার সময় তুলে নিয়ে যাক … সিক্স সিজন্স-এ গিয়ে মুখ গোমড়া করেই বসে রইলাম … দুনিয়ার খাবার অর্ডার দিয়ে দিলো টিয়াম … খাওয়া-দাওয়া ব্যাপারটা মোটেই আরামদায়ক হলো না … তাও কোনোরকমে এটা-ওটা খেয়ে চুপচাপ বসে রইলাম … বাসায় ফিরতে ফিরতে বাজলো রাত পৌনে ১২টা … তো রাত ১২টা থেকে প্রায় সোয়া ৩টা অব্ধি আমি স্কুলের লেসন প্ল্যানের খাতায় ৫টা ক্লাসের লেসন প্ল্যান তুললাম, সিলেবাস ফাইনালাইজ করলাম, একটা হ্যান্ডআউট বানালাম … সোয়া ৩টায় শুয়ে ঘুম আসতে আসতে তো প্রায় ৪টাই বাজলো … আবার সাড়ে ৫টা সময় ঘুম থেকে উঠেও পড়লাম …

আজকে স্কুলে ফাইনাল টার্মের জয়েনিং ডে ছিলো … স্কুলে গিয়ে সাইন ইন করে, নিজের বসার জায়গা ঠিকঠাক করে, লেসন প্ল্যান, সিলেবাস সব গুছিয়ে সোয়া ১০টা সময় বের হয়ে আবার ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ-এর ক্লাসেও গেলাম … সেখানে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ক্লাস করে আবার স্কুলে আসলাম … স্কুল থেকে রওনা দিলাম বনানী … তৃষা, মিন্নি আর নিশাতের সাথে দেখা করতে …

তো বনানী যাবার পথেই আজকের চরম মেজাজ খারাপের কাহিনী ঘটলো … উবারের গাড়ি ডাকলাম একটা … তো সে ট্রিপ অন্য করার সাথে সাথেই তাকে বললাম মিরপুর রোড দিয়ে সংসদ ভবনের সামনের রাস্তা হয়ে বিজয় স্মরণি দিয়ে বনানী যাবার জন্য … সেই ড্রাইভার ভদ্রলোক, এডওয়ার্ড নাম, উনি পান্থপথ দিয়ে বের হয়ে ফার্মগেট হয়ে বিজয় স্মরণি দিয়ে যেতে চাইলেন … আমি প্রথমবার উনাকে না করলাম, কারণ আমার জানামতে পান্থপথ সিগন্যাল পর্যন্ত যেতেই উনি অনেকটা সময় জ্যামে আটকে থাকবেন … তাও উনি ওইদিকেই আগালেন … তো আমি দ্বিতীয়বার আর কিছু বললাম না … বারবার এককথা মানুষকে বোঝাতে আমার ভালো লাগে না … আমার যুক্তি হচ্ছে আমি যেহেতু একবার বলেছিই যে ওই রাস্তায় জ্যাম হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে, আমার কথাকে তো উনি আমল দেবেন যেহেতু উনি নিজেও শিওর না আর আমি বলেছি যে আমি রেগুলারই এই সময়ে এইসব এলাকা দিয়ে যাতায়াত করি … তো উনি গ্রিন রোড হয়ে পান্থপথে যাবার রাস্তায় বের হয়ে কম্ফোর্ট হাসপাতালের সামনেই প্রায় ৪৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেন … পান্থপথ সিগন্যাল পার হতে হতে সবমিলিয়ে ঘণ্টা, সোয়া ঘণ্টা পাড় হয়ে গেলো … তো এরপর আমি যখন বললাম যে ফার্মগেট দিয়ে না গিয়ে পান্থপথ সিগন্যাল থেকে বাঁয়ে গিয়ে মিরপুর রোডে উঠতে, উনি আর দ্বিমত করলেন না … এদিকে সংসদভবন পাড় হয়ে খামারবাড়ি মোড়টায় এসেই আরেক প্রস্থ জ্যামে পড়লাম … সেখানে কাটলো প্রায় আধাঘণ্টা কি ৪৫ মিনিট … আমি স্কুল থেকে রওয়ানা দিয়েছিলাম ১টা বেজে ২০ কি ২৫ মিনিটের দিকে, আর যখন আমি সংসদ ভবনের পূর্ব প্লাজার গেটের সামনে পর্যন্ত আসছি, তখন বাজে সোয়া ৩টা! … একদিকে আমার নিজের প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে, আবার তৃষা আর মিন্নিও বারবার ফোন দিয়ে আপডেট নিচ্ছে … আমার মনে হলো যে এভাবে নিজে ঝুলে থেকেও লাভ নাই, ওদের ঝুলায় রেখেও লাভ নাই … এরচেয়ে আর কোথাও না গিয়ে সোজা বাসায় চলে যাই … এভাবে চিন্তাও করে ফেললাম যে কাকলি পর্যন্ত পৌঁছে আর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ-তে ঢুকবো না, ড্রাইভারকে ডেসটিনেশন চেঞ্জ করতে বলে সোজা কালশি ব্রিজে উঠে বাসায় চলে আসবো … ক্ষুধার চোটে ততক্ষণে সবকিছুই অসহ্য লাগা শুরু হয়েছে … মিন্নিকে এসএমএস-ও করে দিলাম যে আমি নাও যেতে পারি … তো বিজয় স্মরণি সিগন্যাল পাড় হলাম যখন তখন সাড়ে ৩টা বাজে, আর কাকলি পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম পাঁচ মিনিটেই … তো বাসায় যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে মিন্নিরা কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ-তে ‘টাইম আউট’ নামে একটা খাবারের দোকানে বসেছে সেখানেই চলে গেলাম … এদিকে উবারের বিল আসার কথা ৩০০/৩২০ টাকার মতো, সেখানে ৬৯৫ টাকা আসলো … আমার কাছে একটাই ১০০০ টাকার নোট ছিলো সেটা উনাকে দিয়ে দিলাম … হাতে ফেরত আসলো ৩০০ টাকা … মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো … এক ধাক্কায় ৭০০ টাকা খালি ধানমন্ডি থেকে বনানী আসতেই খরচ হয়ে গেলো? তাও আবার ড্রাইভারের অতিরিক্ত পাকনামি বুদ্ধির কারণে! …

এদিকে প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ থাকলে আমি কিছু খেতেও পারি না … যাবতীয় ক্ষুধা-তৃষ্ণা সবই কেমন মরে যায় … আজকেও হলোও তাই … টাইম আউটে গিয়ে জিদের চোটে ঠাণ্ডা একটা মোকটেল নিয়ে বসে রইলাম … এম্নিতেই কালকে সিক্স সিজন্সেও দুই গ্লাস ঠাণ্ডা কোক খেয়ে গলার অবস্থা খারাপ করেছি … আজকে আবার বরফ ঠাণ্ডা মোকটেল … তৃষারা আমি যাওয়ার আগেই খেয়ে-দেয়ে নিয়েছে, আমি পৌঁছানোর জন্যই অপেক্ষা করছিলো বোধহয় … তো আমরা বের হয়ে গেলাম ৪টা কি সোয়া চারটার দিকে … তৃষার বাসায় বুয়া আসবে, ওর যাওয়ার তাড়া … তো বাসায় যাবে না অন্য কোথাও বসবে এই নিয়ে কথা হতে হতে শেষে বনানী ১১তে ক্রিমসন কাপে যাওয়া হলো … সেখানে বসার জায়গা নাই, বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হবে … তো সেখান থেকে বের হয়ে আবার রাস্তার উল্টাদিকে ক্রিম অ্যান্ড ফাজ-এ বসলাম … আমি মনে মনে ভাবছিলাম যে ওখানেও কিছু খাবো না … এমনকি কফি-ও না … তারওপর আমার কাছে ক্যাশ টাকাও তেমন নাই …. আবার কার্ডেও টাকা নাই যে তুলে নেবো … আজকে পর্যন্ত তো বেতনই পাইনি এইমাসের … আগামীকাল নাকি দেবে …

[ টাকা নিয়ে আসলে ক্রাইসিসটা হতো না … এমনিতে টাকা আমার কাছে অনেকটুকুই ছিলো … পরশুদিনই তো দুরন্ত টিভির একটা ৬০০০ টাকার বিল নিয়ে আসলাম … কিন্তু কাহিনী হচ্ছে এই যে নিশাতের বিয়ের সময়কার গেট ধরার টাকা আমার কাছে রয়ে গিয়েছিলো … এমনকি ওর বিয়ের বছরখানেক পাড় হয়ে গেছে, তাও টাকাটা ওর হাতে দেয়ার সুযোগ হয়নাই … মাঝখানে কয়েকবার আমাদের দেখা হবার প্ল্যান হয়েছে, কিন্তু ও সেগুলোতে আসে নাই, আমারও আর ওকে টাকাটা ফেরত দেয়া হয়নি … এর মধ্যে গতমাসেই ওই টাকা থেকে কিছু টাকা আমি একটু খরচও করে ফেলেছিলাম … পরে আর সেটা ভরে রাখা হয়নি … তো আজকে নিশাত শিওর যাবে বলেছে দেখে আমিও মনে মনে ঠিক করেছিলাম যে যেভাবেই হোক আজকেই টাকাটা ফেরত দেবো ওকে … তো ওইদিন দুরন্ত টিভি থেকে যে টাকা পেলাম সেটা পুরোটাই ওখানে ভরে বাকি আমার হাতে যা ক্যাশ ছিলো সব মিলায় ওর টাকাটা রেডি করেছি … কালকে বেতন তো পেয়েই যাবো, এই চিন্তা করেই নিজের জন্য খালি হাজারখানেক টাকা রেখেছিলাম যে সেটা দিয়ে আজকের খাওয়া-দাওয়ার খরচ হয়ে যাবে … কিন্তু উবারের ভাড়াই  ৭০০ টাকা এসে আমাকে পুরা ধরা খাওয়ায় দিলো … আর মেজাজ খারাপের কারণে, আবার নিজেই সবাইকে বসায় রেখে এত দেরি করে গিয়েছি সেই অস্বস্তিবোধ থেকে আর কাউকে এটা বলতে ইচ্ছা হয়নাই যে আজকে কেউ আমাকে টাকা ধার দে … মেজাজ খারাপ থাকলে কিছুই আসলে ভালো লাগে না … ভালো লাগা জিনিসও অসহ্য লাগতে থাকে … মাথাও ক্যামন হ্যাং হয়ে যায় ...]

যাই হোক, যেহেতু ক্ষুধা বিষয়টা অসহ্য লেভেলে চলে গেলে আর কিছু না হোক আমার প্রেশার লো হয়ে যায়, তো সেটুকু যাতে না হয় সেজন্য ক্রিম অ্যান্ড ফাজ-এ একটা ওয়াফল নিলাম … অন্তত সুগার ইনটেক হোক কিছুটা, এই চিন্তা করে … মনে হলো যে মেজাজ খারাপ হবার কারণে শুধু ক্ষুধা না, খাবারের রুচিও মরে গেছে … নিতান্তই অনাগ্রহের সাথে ওই ওয়াফল বস্তুটা খেলাম … আমার আসলে তখন এমন ক্ষুধাই লেগেছে যে চোখের সামনে থালা ভরা গরম ভাত ছাড়া আর কিছু দেখছিলাম না … খালি মনে হচ্ছিল যে কখন বাসায় আসবো আর ভাত খাবো … খালি মনে হচ্ছিলো ভাত না খেলে এই ক্ষুধা মিটবে না … তো বাসায় এসে করলামও তাই … যদিও তরকারি বলতে তখনও কিছুই রান্না শেষ হয়নাই … গরুর মাংস ছিলো, সেটা দিয়েই খেতে হলো … প্রচণ্ড ক্ষুধা পেটে গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে এখন ক্রমাগত অ্যাসিডিটির ঢেঁকুর তুলেই যাচ্ছি সন্ধ্যা থেকে …

সামনের দিনগুলি নিশ্চয়ই এর চেয়েও বাজে থেকে বাজেতর হতেই থাকবে … ২০১৮ সালটাই আমার মনে হচ্ছে বেশ খারাপ যাবে … মর্নিং শো-জ দ্য ডে’র মতো প্রথম ৬ দিন তো দেখিয়েই দিলো …

ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাসেও এবার কপাল পোড়া … আমাদের এবারের টিউটর মঁসিয়ু ইফতেখার … আর আমি বিগত দুই লেভেল যাবৎ কারো কাছেই মসিউ ইফতেখার সম্পর্কে পজিটিভ কোনো রিভিউ শুনিনাই … উনার ব্যাপারে নেগেটিভ কথা শুনতে শুনতে আমাদের এবারের একটা আতঙ্ক দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো যে এবার যদি আমাদের বে-আ-আ তে মঁসিয়ু ইফতেখার পড়ে তাহলে কি হবে? আমাদের ব্যাচের গ্রুপ চ্যাটে এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, হা-হুতাশও হয়েছে … এবং যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হবার মতো সেই মঁসিয়ু ইফতেখারই আগামী তিনমাসের জন্য আমাদের টিউটর হিসেবে অবতীর্ণ হলেন! … রিফাত তো আমাকে বলেই ফেললো, ‘আপু আপনার কি আজকাল দিনকাল খারাপ যাচ্ছে? আপনি বলছিলেন আর যেই হোক মঁসিয়ু ইফতেখার যেন না পড়ে, আর উনিই পড়লো’ … আমিও মনে মনে তাই-ই ভাবছিলাম … যা যা চাই না, যা যা চাইছিনা তাই-ই বোধহয় ঘটতে থাকবে এই বছর! … সব উল্টা উল্টা চাওয়া শুরু করবো কি না ভাবছি … তাহলে যদি পজিটিভ কিছু হয় …

তবে দুইদিনের প্রেক্ষিতে দেখলাম যে উনি যথেষ্টই ঠাণ্ডা থাকার চেষ্টা করছেন … প্রথম সপ্তাহ বলে হয়তো … উনার রুডনেস নিয়ে যেমনটা শুনে এসেছি সেই রূপ হয়তো সামনে দেখা যাবে … গত দুইদিনে উনার ব্যাপারে আমার একমাত্র পজিটিভ ইম্প্রেশন এটাই হয়েছে যে আমি গতকালকে ক্লাসে পানির বোতল ফেলে চলে আসছিলাম, সেটা আমার উনি নিয়ে উনার হেফাজতে রেখে দিয়েছেন। আজকে আমি যাওয়ার সাথে সাথে উনি নিজে থেকেই জানালেন যে আমার পানির বোতল উনার কাছে, সেটা আবার টিচার্স রুম থেকে নিজেই নিয়ে এসে আমাকে দিলেন … আমাকে শৌনক খুব মোটিভেট করার চেষ্টা করছিলো যে আপু দেখলেন, হি ইজ একচুয়ালি ভেরি নাইস … আমি ‘নাইস না কচু’ টাইপ একটা এক্সপ্রেশন দিয়ে বসে রইলাম … সবচেয়ে বড় কথা উনার ক্লাস তো দুইদিনের একদিনও আমি এনজয় করতে পারলাম না … উনি কথা বলেই যায়, তাও আবার খুব শ্লথগতিতে … সেই কথা শুনতে শুনতে বোরিং লাগতে থাকে … আমার আবার বদভ্যাস হচ্ছে ক্লাস বোরিং লাগতে থাকলে আমি ক্লাসনোটের খাতায় আঁকিবুঁকি করতে থাকি, ‘ভাল্লাগে না’ ‘বোরিং’ টাইপ কথাবার্তা লিখতে থাকি … এইসব যদি কোনোদিন উনার চোখে পড়ে তাহলে নিশ্চয়ই একটা অঘটন ঘটবে … আমি একবার চিন্তা করেই ফেলেছিলাম যে অফিসে গিয়ে ব্যাচ চেঞ্জ করার ব্যাপারে কথা বলবো, দরকার হলে কষ্ট-মষ্ট করে উইক ডে-তে সন্ধ্যায় ক্লাস করবো … কিন্তু ব্যাচ চেঞ্জ করার অপশন নাই … দাঁত-মুখ খিঁচে কোনোভাবে এই তিনমাস পাড় করার ধৈর্য্যটা আমি কোথা থেকে পাবো তাই ভাবছি! … এম্নিতেই যেই মেজাজ খারাপ মুডে চলছি গত কয়েকদিন যাবৎ! ! …

কালকে দুপুরে মা একটা কথা বললো … তাতে যে মেজাজটা খারাপ হয়েছে, ওইটাই এখনো যাচ্ছে না, তার মধ্যে আবার গতকাল সন্ধ্যার আর আজকের কাহিনী … কামতাদের জন্য মা কিছু গিফট কিনেছিলো … তো দুপুরে অমিত এসেছিলো … আমি আর অমিত মিলে গিফট র‍্যাপিং করে, ডেকোরেশন করে দিচ্ছি … এর মধ্যে মা বসে বসে বলতে শুরু করলো … আর একবছর পর আমার চাকরি শেষ … চাকরির শেষ দিন সবাই সুন্দর সেজেগুজে এসে বীরদর্পে কলেজ থেকে বের হয়, আর আমি বের হবো পরাজিত সৈনিকের মতো … কারণ অন্যদের সাথে তাদের ছেলে-মেয়ে, ছেলের বৌ, মেয়ের জামাই থাকে, নাতিনাতনি থাকে … আর আমার দুই ছেলে-মেয়ে … দ্যাখো, তোমাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ, তোমরা আগামী এক বছরের মধ্যে একটা কিছু করবা এই সিদ্ধান্ত দাও … আমার এমন মেজাজ খারাপ হলো, আমি বলে উঠলাম, সিদ্ধান্ত দিলাম, অবশ্যই বিয়ে করবো না … মানে, কি অদ্ভুত আবদার! … একজন কলেজ শিক্ষক জীবনে এতগুলো বছর পাড় করে এসে, এত এত ছাত্র-ছাত্রীর ভবিষ্যৎ গড়ে এসে সেটা নিয়ে গর্বিত না হয়ে বরং ছেলে-মেয়ে ক্যারিয়ারে এস্টাব্লিশড হলো কি হলো না, বিয়ে করলো কি করলো না এই দিয়ে নিজের চাকরির সার্থকতা মাপে! … আমার জীবনের সার্থকতা আমি নিজেকে দিয়ে মাপবো না আমার বাবা-মা-ভাইকে দিয়ে মাপবো? … মা প্রায়ই এইসব কথাবার্তা বলে যে কি করলাম জীবনে, ছেলে-মেয়ে মানুষ করতে পারলাম না … এই … সেই … কালকে একবার মুখ দিয়ে বের হয়েই যাচ্ছিলো যে ‘আরেকদিন তুমি যদি এইসব কথা বলো আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাবো’ … একদিন হয়তো বলার অপেক্ষাও করবো না … অমিত যেমন এইসব কথা শুনতে হয় দেখে বাসাতেই আসে না, আমিও হয়তো অন্য কোথাও চলে যাবো …

আমাদের বাংলাদেশের এই সমাজব্যবস্থায় বাবা-মা হলেই যেন নিজের সকল সুখ-শান্তির সিদ্ধান্ত সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দিতে হয়! … ‘তুমি একটা ভালো চাকরি করলে মরেও শান্তি পেতাম’ ‘ তুমি বিয়েটা করলে আমার জীবনটা সার্থক হতো’ ‘ … ‘বাবা-মা সবসময় সন্তানের ভালোর জন্যই এইসব চাহিদা করে’ … আরে আজব! সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমানো পর্যন্ত আমাকে চালাচ্ছি আমি, বাইরে বের হচ্ছি আমি, চিন্তা-ভাবনা করছি আমি, অনুভব করছি আমি, পড়ালেখা করছি আমি, মানুষের সাথে মিশছি আমি, আর বাবা-মা’র সাথে বাসায় আসলে সারাদিনে ঘুমানোর সময় বাদে মাত্র ৩/৪ ঘণ্টা দেখা হয় আর তারাই নাকি বুঝে আমার কোনটায় ভালো হবে! … এই সামাজিক স্টেরিওটিপিক্যাল চিন্তাভাবনা অন্তত আমি যখন আমার ‘উচ্চশিক্ষিত’ ‘উচ্চপদস্থ শিক্ষিকা’ মায়ের মধ্যে দেখি, আমার খুব হতাশ লাগে! … মনে হয় যে এত পড়ালেখা জেনে, এত চারদিকে সমাজ-ব্যবস্থা নিয়ে জেনে-শুনে শেষমেশ চিন্তা-ভাবনা কথাবার্তা যদি ‘স্টার জলসা’র সিরিয়ালের সংলাপে আটকে যায়, তাহলে এর চেয়ে হতাশামূলক আর কিছু হতে পারে না … এইসব করে করে বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের মধ্যে চরম আইডেন্টিটি ক্রাইসিস তৈরি করা ছাড়া ভালো আর কিছুই করতে পারে না …

নিজেকে দিয়ে ভাবলে সেটা যেমন বুঝি … তেমনি অমিতকে দেখি … একে দেখি … তাকে দেখি … এদের দেখি … তাদের দেখি …

যাই হোক, আজকে আর লিখবো না … স্কুলের কিছু খুচরা কাজ জমে আছে … সেগুলো গুছিয়ে তারপর ঘুমাতে হবে … যদিও ঘুমে অলরেডিই আমার দুনিয়া আঁধার হয়ে আসছে … তারমধ্যে কালকে আবার ‘বনমানুষ’-এর শো … স্কুল শেষ করে সেখানে যাবো … ফিরতে ফিরতে রাত … কালকে মোটামুটি একটা রেস্টলেস দিনই যাবে বলা যায় … শাড়ি পরার ইচ্ছা ছিলো … কিন্তু যেই শীত … শাড়ি পরে যথেষ্ট পরিমাণে প্যাকেট হওয়া যায় না … ঠান্ডার কাছে কাবু হয়েই হয়তো কাল জিন্স-টিন্স পরে সোয়াটার, চাদর সব নিয়ে প্যাকেট হয়ে বের হবো …

দেখা যাক, কাল আবার কি মেজাজ খারাপ করা ঘটনা ঘটে …