ককশ্‌বাজার/ কক্সবাজার/ Cox’s Bazar_পর্ব ৩

২০১৭ সালের ২৮ জুন । কক্সবাজারে ফ্যামিলি ট্রিপের তৃতীয় দিন । এইদিনের একমাত্র উল্লেখযোগ্য ঘটনা এইটাই যে আমরা ওইদিন সকালবেলা সবাই সমুদ্রে ঝাঁপাঝাঁপি করতে গিয়েছিলাম । আমাদের হোটেল ছিলো কলাতলী পয়েন্টে। আমরা গেলাম লাবণী পয়েন্টে। ওখানে মানুষের ভীড় হয় সবচেয়ে বেশি … আর কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের সবচেয়ে নোংরা অংশও বোধকরি ওই লাবণী পয়েন্ট। মানুষজনের কী সব অভ্যাস! সমুদ্রের পানিতে দাঁড়িয়ে চিপস খেয়ে, কোক খেয়ে সেই চিপসের প্যাকেট, কোকের বোতল সমুদ্রেই ছুঁড়ে ফেলছে … সিগারেট খেয়ে সিগারেটের বাটটাও ফেলছে সমুদ্রে থুতুও ফেলছে সেই সমুদ্রের পানিতেই … এই সমুদ্রের পানিতেই আবার সবাই গা ভিজিয়ে গোসল করছে … কীভাবে সম্ভব! আমার ইচ্ছাই করে না কক্সবাজারে গিয়ে সমুদ্রের পানিতে গা ভিজাই … মানুষ কীভাবে সমুদ্রের পানিকে নোংরা করছে, সমুদ্র সৈকতটাকে নোংরা করছে সেটা ভাবলেই আমার গা ঘিন ঘিন করে …

কিন্তু প্রচুর মানুষ নির্বিকার ভাবে এই সমুদ্রেই গা ভেজায় … সমুদ্রস্নান করে … বাসা-বাড়িতেও এরা কি নোংরা পানিতেই গোসল করে কি না বা গোসলের পানি এরকম নোংরা করে কি না আমার খুব জানতে ইচ্ছা হয় …

 

আমার কাছে নির্জন সমুদ্র ভালো লাগে … বিশেষ করে যখন একটু সন্ধ্যা হয়ে আসে … আর সমুদ্র একটু একটু করে জোয়ারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে … মেঘেরা রঙ নিয়ে খেলা করে … তখন বিশাল সমুদ্রের প্রান্তে গুটিকয়েক মানুষের মধ্যে একজন হিসেবে নিজেকে দেখতে ভালো লাগে …

তো, তৃতীয় দিন আমাদের দুপুর পর্যন্ত অনেকটা সময় সমুদ্রেই কাটলো … তারপর হোটেলে ফিরে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া-দাওয়া … আর বিকেলবেলা যাওয়া হলো শপিং-এ … ওইদিন আমরা বার্মিজ মার্কেটে গিয়েছিলাম কি না মনে নাই … সম্ভবত ওইদিনই যাওয়া হয়েছিলো … মার্কেট বন্ধ পাওয়া গেলো ঈদের জন্য … একটা-দুইটা দোকান খোলা … আর সেসব দোকানেও যা পাওয়া যায় সেগুলো আদৌ বার্মিজ কিছু নয় … আবার এইসব জিনিস বিচের পাশের মার্কেটগুলাতেও ভরপুর … তবে আমি এখন আর মনে করতে পারছি না যে বার্মিজ মার্কেটে আগে গেলাম, নাকি বিচের পাশের মার্কেটগুলাতে … সম্ভবত বার্মিজ মার্কেটে গিয়েছিলাম এক সন্ধ্যায়, তার পরেরদিন সন্ধ্যায় যাওয়া হয়েছিলো বিচ মার্কেটে … ড্রাই ফ্রুট কিনেছিলাম অনেকগুলা … ওই তথাকথিত বার্মিজ মার্কেট থেকে … বিচ মার্কেটে যেদিন যাওয়া হলো ওইদিন আমি আর প্রভা আবার কাঁকড়া অভিযানে বের হলাম … কাঁকড়া খাওয়ার কথা শুনে বাকি সবাই বেশ নাক সিটকালো, ধর্ম-টর্মের দোহাই দিলো …. যাই হোক, তাও আমরা গেলাম । অনেক ভিড় কাঁকড়ার দোকানে … মানুষ ভীড় জমায় এখানে সামুদ্রিক মাছ ভাজা, কাঁকড়া ভাঁজা খাবে বলে … তো অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে দুইটা কাঁকড়া ফ্রাই পার্সেল নেয়া গেলো … রাতে ভাত খাবার সময় খাবো বলে … কারণ অন্যরা বারবার ফোন করে তাড়া দিচ্ছিলো যে হোটেলে ফিরবে …

 

পরদিন, মানে ২৯ তারিখ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আবার সমুদ্র দেখতে যাওয়া হলো … এবার গেলাম কলাতলী বিচেই … সকালের শান্ত, নির্জন সমুদ্র … জোয়ার আসবে আসবে করছে … আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই স্রোতের বেগ বেড়ে যেতে শুরু করবে … অনেকদূর থেকে ঢেউ এসে দুর্বল হয়ে গড়িয়ে আসছে পায়ের দিকে … আলতো করে ভিজিয়ে দিচ্ছে পা … সূর্যের নরম আলোয় চিকচিক করছে সেই পানি … এই সমুদ্র দেখতে সুন্দর … চুপচাপ দাঁড়িয়ে এরকম সমুদ্র দেখতে আমার ভালো লাগে …

কিংবা, ঝড়ের আগে উত্তাল হয়ে যাওয়া সমুদ্র … বড় বড় উপর্যুপরি ঢেউ নিয়ে সে সময় সমুদ্র এগিয়ে আসতে থাকে … প্রচণ্ড গর্জনে … সেই সমুদ্রের সাথে আমি আমার অনেক মিল পাই … আমার ভেতরেও এরকম এক সমুদ্র ব্যথা, কষ্ট, গ্লানি আর অনুশোচনা ক্রমাগত আছড়ে পড়তে থাকে … আবার কখনো সে ওই সকালের শান্ত সমুদ্রের মতোই হয়ে যায় … মাঝামাঝি বলে কিছু নেই … এইজন্যই আমার হয়তো পাহাড় বেশি ভালো লাগে … সমুদ্রের মতো অস্থির না হয়ে পাহাড়ের মতো দৃঢ়, শক্ত, স্থির হতে ইচ্ছা করে আমার … কিন্তু আমি পাহাড় নই … কখনো হয়তো হতেও পারবো না … সমুদ্রের মতোই ধাবমান থেকে যাবো …

 

যাই হোক, চতুর্থ দিন দিনের বেলা আমাদের বেড়ানো বলতে হিমছড়ি যাওয়া হলো, আর দুইটা বৌদ্ধ মন্দির দেখা হলো … সন্ধ্যায় কেনাকাটা, ঘোরাঘুরি … আগের দিন ওই তথাকথিত বার্মিজ মার্কেট থেকে প্রমা একটা খেলনা কিনলো, যেটাতে ফু দিয়ে বুদবুদ তৈরি করা যায় … মজার ব্যাপার হচ্ছে এই জিনিস সে আমার কাছে আবদার করে একটা নিলো, প্রভার কাছে আবদার করে আরেকটা নিলো … আমি আর প্রভা দুইজনই ওর জন্য একই জিনিস কিনলাম, কিন্তু কেউই টের পাইনাই যে দুইজনের কাছেই প্রমা একই আবদার করেছে … সম্ভবত ও নিশ্চিত ছিলো না যে কে ওর আবদার রাখবে, তাই দুইজনকেই বলেছে এই ভেবে যে কেউ না কেউ তো কিনে দেবে! … এদিকে আমরা দুইজনই ভেবেছি যে প্রমাই তো আবদার করেছে, আর এমন কীই বা জিনিস, কিনেই দেই! …

 

হিমছড়ির পাহাড়ের ওপরে উঠতে পারলে নিশ্চয়ই ভালো লাগতো … একদম চূড়ায় দাঁড়িয়ে বিশাল সমুদ্র দেখতাম … কিন্তু কেউই সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ে উঠতে চাইলো না … বরং পাশের মার্কেট থেকে শামুক, ঝিনুক কিনলো … আমিও কিনলাম … মা বলেছিলো একটা বড় শামুক নিতে তার জন্য … সেই শামুক কিনতে গিয়ে নিজেও এটা-সেটা কিনে ফেললাম … এরপর বৌদ্ধ মন্দির যাওয়া হলো … আমার বৌদ্ধ মন্দির ভালো লাগে … সেটা এর প্রাচীনত্বের জন্যই হোক, আর শান্তি শান্তি একটা পরিবেশ থাকে বলেই হোক … অবশ্য কক্সবাজারের বৌদ্ধমন্দিরগুলো অত আহামরি নয় … রাঙ্গামাটিতে যে একবার পাহাড়ের ওপরে একটা বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়েছিলাম, আর সবজায়গায় স্পিকারে ‘ওম মণিপদ্মে হুম’ বাজছিলো … ওই বৌদ্ধমন্দিরটা খুব ভালো লেগেছিলো …

কিন্তু আমার এই এক আজব সমস্যা … আমি কোনোকিছুর নাম মনে রাখতে পারি না … এমনকি নোটবুকে লিখে রাখার অভ্যাসও করতে পারি না … কোনো একটা নোটবুকে কোথায় কোথায় গেলাম লিখে রাখলে তো পরে সেটা দেখেও মনে করা যায় যে জায়গাগুলোর নাম কি ছিলো!

যাই হোক, হিমছড়ি ঘোরা আর দুইটা বৌদ্ধমন্দির দেখা … কক্সবাজার ট্যুরের এই শেষ ঘোরাঘুরি … পরের দিন আমরা সকালবেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রওয়ানা দিলাম … ওইদিন কি জানি হলো, কক্সবাজারের একটা জায়গাতেই অনেকক্ষণ বসে থাকলাম … সবাই বোধহয় ওইদিনই ঢাকা ফিরতে শুরু করেছিলো … চট্টগ্রামে আবার একটা হোটেলে লাঞ্চ করা হলো … হোটেলটা নাকি খুব বিখ্যাত … কিন্তু আমি একদমই এখন আর নাম মনে করতে পারছি না … জসিম … জামাল … জালাল … এইসব এইসব নাম মনে আসছে, কিন্তু হোটেলটার নাম মনে হয় ওরকম কিছু ছিলো না … তবে নাম যাই হোক, খাবার ভালো ছিলো …

কক্সবাজার ট্যুর নিয়ে আর তেমনকিছু লেখার নেই … ট্যুরটা খুব মজার হতে পারতো … কিন্তু ওই যে বললাম, শুরুতেই এমন এক মেজাজ খারাপ করা ঘটনা ঘটেছিলো যে পুরো ট্যুরের ওপর সেটার ইমপ্যাক্ট পড়েছে … খালি মনে হচ্ছিলো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আবার কেন ঘুরে বাসায় চলে গেলাম না … কেন গাড়িতে উঠলাম … হয়তো ট্যুরটায় যাওয়া হচ্ছে না বলে বড়জোর একদিন খুব মেজাজ খারাপ থাকতো, কিন্তু এই যে প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে পরের ৪/৫টা দিন পার করে আসলাম, ট্যুরের কিছুই এঞ্জয় করতে পারলাম না এমনটা হয়তো হতো না …

এই পর্যন কক্সবাজারের সবচেয়ে বোরিং এবং বাজে ট্যুর ছিলো এটা … তবু মন্দের ভালো ছিলো এই যে এর চেয়ে বোরিং ‘ছুটির দিন’ গুলো কেটে গিয়েছে ঘুরতে ঘুরতে …

টিল নেক্সট টাইম … এইটুকুই গল্প …

আগের দুইদিনের গল্প এখানে –

https://prajnatrubayyat.wordpress.com/2018/06/07/%E0%A6%95%E0%A6%95%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E2%80%8C%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B8%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B0-coxs-bazar_%E0%A6%AA-2/

https://prajnatrubayyat.wordpress.com/2018/06/05/%E0%A6%95%E0%A6%95%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E2%80%8C%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B8%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B0-coxs-bazar_%E0%A6%AA/

Advertisements

ককশ্‌বাজার/ কক্সবাজার/ Cox’s Bazar_পর্ব ২

আমরা কক্সবাজার পৌঁছলাম ২৬ জুন সন্ধ্যাবেলা … ইফতারের কিছু সময় আগে … হোটেল -এর নাম ‘সি উত্তরা’ … নতুন হোটেল … ছোটোখালা, মানে যাকে আমি টিয়াম বলে ডাকি, সে তার অফিসের কোনো এক ক্লায়েন্ট-এর রেফারেন্সে এই হোটেল পেয়েছিলো … হোটেলটা একদম কলাতলী বিচের পাশেই … হেঁটে গেলেও দুই মিনিট লাগে বিচে পৌঁছাতে … তবে, হোটেলটা একটু গলির ভেতর হওয়াতে হোটেল থেকে সরাসরি সমুদ্র দেখা যায় না কারণ সামনে নির্মিত, আধা-নির্মিত আরও অনেকগুলা হোটেল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বা দাঁড়াতে যাচ্ছে … যেমন, আমরা যেই রুমে ছিলাম তার ডান কোণাতেই সায়ামান হোটেলের নতুন বিল্ডিংটা মোটামুটি পুরো সমুদ্রের ভিউ ব্লক করে দাঁড়িয়ে … তারপরও আমাদের রুম থেকে একটু আনাচে-কানাচে দিয়ে সমুদ্র দেখতে পাওয়া গেলো …

নতুন হোটেলের সবচেয়ে ভালো ফিচার হচ্ছে একদম ঝকঝকে-তকতকে বাথরুম … আমার মতো মানুষ যাদের বাথরুম নিয়ে বেশ ভালোই খুঁতখুঁতানি আছে, তাঁদের জন্য যেকোনো ট্যুরের একটা বড় ইস্যু হয়, ‘যেখানে যাবো, বাথরুম কেমন হবে?’ … শুধুমাত্র বাথরুমের কথা চিন্তা করে অনেক জায়গায় আমি যাওয়ার আগ্রহই পাই না … আর গেলেও আমাকে একটু লাক্সারিয়াস জায়গা বেছে নিতে হয় যাতে অন্তত বাথরুমটা ভালো পাওয়া যায় … তো এই হোটেলে আমরা যেই রুমে থাকলাম, সেই রুম, রুমের বাথরুম সবই দশে দশ! …

ছোটোখালার মেয়ে প্রমার জন্য সমুদ্র দেখার অভিজ্ঞতা নতুন … আগের দিন যেহেতু আমাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, সেদিন ওর বোঝার উপায় ছিলো না সমুদ্র আসলে কতটা বিশাল … প্রমাকে নিয়ে আমি আর প্রভা, আমার মামাতো বোন, যেদিন কক্সবাজার পৌছালাম সেদিন সন্ধ্যার দিকে ঘুরতে বের হয়েছিলাম … সমুদ্রের পাড়েই একটা রেস্টুরেন্টে বসেছিলাম আমরা … সারাদিন আমাদের তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি, আর ইফতারেও ভাজাপোড়া খেতে আমাদের কারো ইচ্ছা করেনি … প্রভার ইচ্ছা ছিলো কোনো একটা রেস্টুরেন্টে কাঁকড়া খাবে … সম্ভবত মারমেইড রেস্টুরেন্টটা খুঁজছিলো ও … তো মারমেইড রেস্টুরেন্ট, কাঁকড়া কোনটাই পেলাম না … এমনিই একটা রেস্টুরেন্টে বসলাম, নুডলস খেলাম … একেবারে বিচের ওপর খোলা জায়গায় বসে খাওয়ার ব্যবস্থা … কিন্তু আলো জ্বালানো গেলো না … অন্ধকারে বসে থাকতে হলো আমাদের … কারণ আলো জ্বালালেই বাদুড় উড়ে উড়ে আসছিলো … রেস্টুরেন্টটার নাম মনে নাই … যাই হোক, ওই রেস্টুরেন্টে বসে বসে অন্ধকারের সমুদ্র দেখানো গেলো প্রমাকে … সাদা ফসফরাসের ফেনা আর প্রবল গর্জন ছাড়া অবশ্য সমুদ্রের আর কিছু ওখানে অভিজ্ঞান করার মতো ছিলো না … ওইদিন আকাশও মেঘলা ছিলো … না হলে হয়তো অ্যাডিশনাল হিসেবে আকাশ ভরা তারার ঝাঁক দেখানো যেতো ওকে … বিশাল সমুদ্রের ওপরে ঝাঁকে ঝাঁকে তারা দেখার সৌন্দর্য নিশ্চয়ই অন্যরকম হতো! … যদিও সেই সৌন্দর্য বোঝার বয়স প্রমার হয়নি …

তো, আমরা যেদিন গেলাম, তার পরদিনই, মানে ২৭ জুন ছিলো ঈদ … ঈদের দিন বলে কথা … আমরা সবাই সেজেগুজে বের হলাম ঘুরবো বলে … মেরিন ড্রাইভের রাস্তাটা তার কয়েকদিন আগেই পাকাপোক্ত করে খুলেছে সবার জন্য … তো ঠিক হলো সেই রাস্তা দিয়েই গাড়ি নিয়ে সোজা ড্রাইভ করে যাওয়া হবে … যেতে যেতে একজায়গায় এসে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ানো হলো, যেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায় … এইবারই প্রমার প্রথমবারের মতো কাছ থেকে সমুদ্র দেখার, পানিতে পা ভেজানোর অভিজ্ঞতা হলো … ওর কাছে সমুদ্র একটা ‘বড় নদী’ ছাড়া তেমন আহামরি কিছু লাগলো না! …

তবে, এখানে আমরা বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না … বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো হঠাৎ … তাতে ভালোই হলো… সমুদ্র না দেখে সবাই যেমন ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো, তাতে ছেদ পড়লো … দৌড়ে সবাই গাড়িতে উঠতে উঠতেই বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেলো … আবার একটু সামনে যেতে যেতেই বৃষ্টি নাই … যাই হোক, মেরিন ড্রাইভের শেষ মাথা পর্যন্ত যাওয়া হলো … তারপরেই টেকনাফ … তবে ওখানে গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না … তো আমরা ঘুরে ফিরতি পথে রওনা দিলাম … মাঝখানে থামলাম রয়্যাল টিউলিপ … ঈদের দিন স্পেশাল লাঞ্চ হবে সবাই মিলে … কামতা, মানে বড় মামা’র ট্রিট …

ফাইভ স্টার হোটেলগুলায় ঢুকলে আমার নিজেকে কেমন জানি বেমানান লাগতে থাকে … খালি মনে হয় এইখানকার লোকেরা খুব জাজ করে যে কে আসলো, সে দেখতে কেমন, কি পরেছে, কি করছে, কি খাচ্ছে … খুব অস্বস্তি লাগে আমার … আমি তো খুব যা-ইচ্ছে-তাই অবস্থায় থাকতেই পছন্দ করি সবসময় … ফলে, আমার অস্বস্তির জায়গাটা এইসব জায়গায় গেলে একটু বেশিই কাজ করে … যাই হোক, খাওয়া ভালো ছিলো … ইন ফ্যাক্ট, ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছায় কক্সবাজার যাওয়া পর্যন্ত পুরোটা সময়েই খাওয়া নিয়ে আমার খুব সমস্যা হচ্ছিলো … খাবার-দাবারের ব্যাপারে না হলেও খাবারের অভ্যাস নিয়ে আমি খুব প্যারা খাচ্ছিলাম … রোজার দিন বলেই মনে হয় প্যারাটা আরও বেশি ছিলো …

তো, রয়্যাল টিউলিপে থাকার অভিজ্ঞতা কেমন হতো জানি না … নিশ্চয়ই অনেক টাকা খরচ করার বিনিময়ে আরামটাও সেরকমই হতো … রুম আর বাথরুম দেখে নিশ্চয়ই বলতাম দশে একশ’! … যাই হোক, সবাই যখন দলেবলে ছবি তুলছিলো, আমি প্রমা-কে নিয়ে আলাদা হয়ে গেলাম … আমার দলেবলে ছবি তুলতে ভালো লাগে না … নিজেকে কেমন দেখাচ্ছে সেটা নিয়ে এত চিন্তিত থাকি যে ছবিতে আর আমাকে ভালোই দেখায় না … সেলফি হলে তাও নিজেকে একটু দেখে নেয়া যায়, কীভাবে দাঁড়ালে নিজেকে খুব বেঢপ লাগবে না সেটাও যাচাই করে নেয়া যায় … কিন্তু যখন পোজ দিয়ে দাঁড়াতে হয় আর অন্য কেউ ছবি তুলে দেয়, তখন আমার খুব অস্বস্তি লাগতে থাকে যে আমাকে না জানি কেমন লাগছে … সেকারণে আমি দলেবলে ছবি তোলার সময় যতটুকু সম্ভব আলাদা হয়ে যাচ্ছিলাম …

রয়্যাল টিউলিপ থেকে হোটেলে ফেরার পথে আমরা ইনানি বিচে নামলাম … তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে … আকাশও মেঘলা … তেমন কিছু দেখার ছিলো না … আর সমুদ্র তো সবজায়গাতেই একইরকম … সমুদ্রের দৃশ্যেও এক মেঘের খেলা ছাড়া আর কোনো ভেরিয়েশন নাই তখন … ওখানে কিছুক্ষণ থেকে দল বেঁধে ছবিই তোলা হলো … তারপর ব্যাক টু হোটেল …

ওইদিন রাতে আমরা আবার ওশেন প্যারাডাইস-এ খেতে গিয়েছিলাম … কটু মামা’র ট্রিট … ওখানে আমরা যে যার যার পছন্দসই মেন্যু সিলেক্ট করে অর্ডার দিলেই মনে হয় ভালো হতো … তাতে করে প্রচুর খাবার নষ্ট হতো না … সবাই সবকিছু খেতে পছন্দ করবে এমন তো না … আমার যেমন রাতে ভাত খাবারই অভ্যাস নাই, তারমধ্যে ওইদিনই দুপুরবেলা একদম পেট ভরে ঠেসে-ঠুসে খেয়েছি … আমার পক্ষে তো আর রাতে অনেককিছু খাওয়া সম্ভব ছিলো না … এক বাটি স্যুপ আর জাম্বো প্রন ফ্রাই-ই আমার জন্য মোর দ্যান এনাফ ছিলো … এর পর বিশাল সাইজের রূপচাঁদা, রাইস, ভেজিটেবল এইসব আমি নিজের জন্য অর্ডারই দিতাম না হয়তো! … আমরা ওখানে যারা যারা ছিলাম প্রত্যেকেরই খাবারের পছন্দ এবং অভ্যাস ভিন্ন হবে সেটাই স্বাভাবিক … তো প্রায় ১০ জনের একটা বড় দলের জন্য খাবারের মেন্যু একা সিলেক্ট করার রিস্ক কটু মামা কেন নিলেন কে জানে! স্টার্টারটাই এত হেভি ছিলো যে এর পরের মেইন ডিশ সবারই প্লেটেই অর্ধেক খাবার রয়ে গেলো! কতগুলি খাবার! কতগুলি টাকার খাবার নষ্ট হলো! …

পরেরদিন সকালে লাবনী পয়েন্টের বিচে সমুদ্রে ঝাঁপাঝাঁপি করতে যাওয়া হবে বলে প্ল্যান হলো … সে পর্যন্ত দ্বিতীয় দিনের গল্প এখানেই শেষ …

প্রথম দিনের গল্পের জন্য এই লিঙ্কে যাওয়া যেতে পারে –

https://prajnatrubayyat.wordpress.com/2018/06/05/%E0%A6%95%E0%A6%95%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E2%80%8C%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B8%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B0-coxs-bazar_%E0%A6%AA/

 

ককশ্‌বাজার/ কক্সবাজার/ Cox’s Bazar_পর্ব ১

কক্সবাজার এর আগে বেশ দুই/তিনবারই যাওয়া হয়েছে আমার … প্রতিটা ভ্রমণ অভিজ্ঞাতাই একের থেকে আরেকটা ভিন্ন … সময়, স্থান, ভ্রমণসঙ্গী, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি সব সাপেক্ষেই …

২০১৭ সালের জুনের শেষে কক্সবাজার যাওয়া হয়েছিলো ফ্যামিলি ট্যুরে … ঈদের ছুটিতে আমার বাসায় থাকাটা বোরিং লাগে … কিছু করার নেই … কোথাও যাবার নেই … কিছু দেখার নেই… তাই ছোটোখালার সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে যাওয়াই হয় মাঝে-সাঝে … অন্তত ৩/৪টা দিন তো কোনোভাবে কেটে যায় … তো গতবার রোজার ঈদে প্ল্যান হলো এবার সবাই মিলে কক্সবাজার যাবে … আমার জন্য এইসব ফ্যামিলি ট্রিপ একটু বোরিং-ই হয় … বন্ধু-বান্ধব দলবলের সাথে যতটুকুও হাহা-হিহি করা মানুষ আমি, পারিবারিক গণ্ডিতে আমি ততটাই চুপচাপ, বোরিং … অনেককিছুই আমি মেলাতে পারি না … অনেককিছুই অন্যরা মেলাতে পারে না … আর সবখানে কম্প্রোমাইজ করে নেই যতটুকু পারি, পরিবারের গণ্ডিতে এসে করি না … ভালো লাগা, মন্দ লাগা সবকিছুরই প্রকাশনা খুব অকপট হয়ে যায় আমার …

কক্সবাজারের ট্যুরটার শুরুতেই … মানে একদম বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠবার মুহুর্তেই প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ করা একটা ঘটনা ঘটে গেলো … ট্যুরের পুরোটা জুড়েই সেই বিরক্তিকে সঙ্গী করেই থাকলাম …

যাই হোক, এইসব এইসব অনেককিছুর মধ্যেই আমি ‘ছুটিটা তো কাটছে’ বলে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে ঘুরে এসেছিলাম কক্সবাজার … স্থানীয় দোকানপাটে যার নাম লেখা থাকে ককশ্‌বাজার … আবার ইংরেজিতে লেখে কক্স’স বাজার …

কক্সবাজার ট্যুরের একটা বড় অংশ আমার কেটেছে মেঘের ছবি তুলে … বিশেষ করে যাওয়া আসার পথে … কক্সবাজার গিয়েছি দিনের বেলায়, আর ফিরেছি যেদিন সেদিন সন্ধ্যা হয় হয় সময়ের দৃশ্য পেয়েছি … আমি মেঘ ভালোবাসি … মাঝে মাঝে আমার নিজের খুব ইচ্ছা হয় যদি আমি মেঘ হয়ে ভেসে বেড়াতে পারতাম! …

প্রকৃতিকে বেশিরভাগসময় গাড়ির কাঁচের ভেতর থেকেই দেখেছি … বেশিরভাগ সময়ই ভালোলাগা দৃশ্যটা তুলতে তুলতে গাড়ির চাকা সেই ফ্রেম পার করে চলে গেছে … কক্সবাজারের গেট দিয়ে ঢোকার আগেই একটা টিলার ওপর প্রায় হেলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম একটা গাছ … আমি কল্পনা করছিলাম, যদি এটা একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ হতো, কিংবা জারুল, কিংবা সাকুরা! কেউ সেই গাছের নিচে বসে থাকতো, আর চারপাশ লাল, বেগুনি নয়তো গোলাপি হয়ে থাকতো ঝরে যাওয়া ফুলের পাপড়িতে … যাই হোক, ওটা নিতান্তই একটা সাদামাটা পত্রপতনশীল গাছ ছিলো … কিন্তু দৃশ্যটা খুব সুন্দর লাগছিলো … ছবি তুলবার সুযোগ হয়নি …

ঢাকা থেকে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়া হলো … বড়মামার বাসায় … সেখান থেকে পরদিন সকালে আবার সবাই মিলে কক্সবাজার রওয়ানা … ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেই কক্সবাজার যেতে আমাদের লাগলো প্রায় ৮/৯ ঘণ্টা … এই দীর্ঘ যাত্রায় বেশিরভাগ সময়টাই সবাই কম-বেশি ঘুমিয়েই কাটিয়েছে … আমি জার্নিতে ঘুমাতে পারি না … মনে হয় ঘুমালেই কী জানি মিস হয়ে যাবে! … আমার প্রকৃতির দৃশ্য দেখতে ভালো লাগে … বাতাস কেটে কেটে যখন এগিয়ে যাই, তখন গাছগুলো, মাঠের ঘাসগুলো যেন দূরে দূরে সরে যেতে থাকে … মনে হয় সব পেছনে ফেলে দিয়ে কোথায় চলে যাচ্ছি! … আবার কখনো মনে হয়, যদি পথে অ্যাকসিডেন্ট করি, যদি মরেই যাই, তাহলে তো জানতেও পারবো না কীভাবে মারা গেছি! … এইসব অনেককিছু মাথায় খেলে, আমার আর ঘুম আসে না … মাঝে মাঝে তন্দ্রা লাগে … আবার জেগে উঠি … আবার তদ্রাচ্ছন্ন হই … তারপর একটা সময় পুরোদস্তুর জেগেই থাকি …

দিনযাপন । ৩০০৫২০১৮

সারাদিন ধুলাবালি ঝেড়ে ঘর গোছালে গোসল করে আসার পরেও কেমন একটা অদ্ভুত অস্বস্তিকর অনুভূতি হতে থাকে … মনে হয় যাই ধরছি তাতেই ধূলা! যেমন ধরা যাক, ল্যাপটপে টাইপ করছি, কিন্তু সারাদিনে সেটা আসলে হাতের কাছেই ছিলো না … সন্ধ্যায় গোসল করে এসে হয়তো ল্যাপটপটা বের করে বসলাম … তারপরও মনে হবে ল্যাপটপের কিবোর্ডটায় বুঝি ধূলা পড়ে আছে … মোবাইল হাতে নিচ্ছি, মনে হচ্ছে ধূলা … সারা গায়ে, কাপরে-চোপড়ে, এমনকি বিছানাতেও কেমন ধূলা ধূলা অনুভূতি হতে থাকে … অথচ, যেদিনই ঘর পরিষ্কার হয় সেদিন গোসল করে নতুন সেট কাপড় তো পরিই, বিছানার চাদরও পাল্টানো হয় … গতকালকে থেকে এরকম অনুভূতির মধ্যে আছি … 

গতকালকে সকালবেলা  ঘুম থেকে উঠেই মনে হলো কাপড়চোপড় গুছাতে হবে … খুব অগোছালো হয়ে আছে সবকিছু … যেমন ভাবা তেমন কাজ … তা কাপড় গোছাতে বেশি সময় অবশ্য লাগলো না … তারপর হঠাৎ করে মাথায় ঢুকলো ঘরের এক কোণায় আপাত স্টোররুম হিসেবে ব্যবহৃত জায়গাটাও গোছানো দরকার … কেমন জানি ঘরের সৌন্দর্যই নষ্ট করে দেয় স্তূপ করে রাখা জিনিসগুলো … তো সেগুলো গুছাতে গিয়ে মোটামুটি ধূলায় মাখামাখি হয়ে গেলাম … তাও অর্ধেক গোছানো হয়েছে কেবল … কিছু কাজে আমাদের বাসায় সকালে কাজ করতে আসে যে, জানু, তার সাহায্য দরকার ছিলো … আজকে সে আসে নাই … ফলে আজকে সকালে কাজগুলো করা গেলো না … আজকে অবশ্য বেরও হয়েছি … না হলে হয়তো নিজে নিজেই আরেকটু গোছানোর অ্যাটেম্পট নিয়ে নিতাম …  

তবে কালকে ঘর গোছানোর কাজ করতে গিয়ে একটা ভালো হয়েছে … আগের দুইদিন সারাদিন বাসায় থেকে থেকে মনে হচ্ছিলো শরীরে জং ধরে আছে … কাজ বলতে তো খুব হাত-পা নাড়ানো টাইপ কিছু হয়নি … সারাদিনই বসে বসে ল্যাপটপে অনুবাদের কাজ করেছি … ইদানীং আবার একটানা ল্যাপটপে কাজ করতেও পারি না … মাথা ভার লাগতে থাকে, হাত-পা কেমন ঝিম মেরে আসে … ফলে এমনও না যে ওই কাজও খুব দ্রুতবেগে হয়েছে … আর দুইদিন ধরে গরমও যা পড়েছে … এতদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো, গরমের তাপদাহ বোঝা যায়নি … রবিবার থেকে একেবারে খবর করে দিয়েছে … গরমের জন্যই আরও মনে হয় অবসন্ন লাগে … তবে গতকালকে বেশ কায়িক পরিশ্রম করে মনে হলো ভালোই হয়েছে … অন্তত দিনের একটা বড় অংশের সময় কেটে গেছে … সারাদিন বাসায় থাকলে তো সময়ও কাটতে চায় না …  

আরেকদিন আমার ওয়ার্কিং টেবিলের পাশের শেলফটা গোছাতে হবে … গত সেশনের ফাইলপত্র আলাদা করতে হবে, আগামী সেশনের ফাইলপত্রের জন্য জায়গা খালি করতে হবে … সেটাও মোটামুটি একবেলার মামলা … দেখি, কালকে করা যায় কি না … অন্তত আরেকটা দিন কাজের ব্যস্ততায় কেটে যাবে …

তবে, আজকে কিছু সময়ের জন্য বাসা থেকে বের হয়ে পুরা অসুস্থ হয়ে গেলাম! … গরমের কারণে! … বাংলাদেশ বিমানের বনানীর সেলস সেন্টারটায় গেলাম টিকিটের ডেটটা চেঞ্জ করবো বলে … ডেট চেঞ্জ করতে দেরি করে ফেললে না আবার ১৮-২২ ক্লাস্টারেই যেতে হয়, এই টেনশনেই আজকে চলে গেলাম … ইনফ্যাক্ট গতকালকেই যাবো ভেবেছিলাম, কিন্তু ঘর গোছানো শুরু করায় আর বের হইনাই … যাই হোক, আজকে বের হয়ে প্রথমে গেলাম সাড়ে এগারোর রাস্তায় একটা প্রিন্ট-ফটোকপির দোকান আছে সেখানে … ওখানে আবার দোকানের সামনেই এমনভাবে রাস্তা কেটে রেখেছে যে দোকানে ঢোকা,বের হওয়া খুব ঝামেলা! প্রায় লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে দোকানে ঢুকতে হবে, বের হতে হবে … একবার যদি ব্যালেন্স হারায় পড়ি তাইলেই শেষ! আমি নিরুপায় হয়ে দোকানে যে ছেলেটা বসে তাকে অনুরোধ করলাম যে বাইরে এসে আমার কাছ থেকে পেনড্রাইভটা নেন, আমি ফাইলের নাম বলে দিচ্ছি, একটু কষ্ট করে প্রিন্ট করে দেন … উনি সেভাবেই প্রিন্ট করে দিলো, আবার বাইরে এসে প্রিন্ট দিয়েও গেলো, টাকা নিলো … এদিকে এই প্রিন্টের কাজ হবার যেই ৫ মিনিট, ওইটুকু সময় আমাকে কড়া রোদেই দাঁড়িয়ে থাকতে হলো … আশেপাশে সব লাইন ধরে দোকান, আর সবগুলারই ঢোকার মুখটাতেই কাটা … ছায়ায় দাঁড়ানোর মতো কোনো জায়গা নেই … গলার স্কার্ফটা দিয়ে মাথা ঢেকে রাখলাম যাতে সরাসরি রোদ না লাগে, কিন্তু তাতে কি আর গরম মানে? ঘামতে ঘামতে প্রায় গোসল করে ফেলার অবস্থা হয়ে গেলো … যাই হোক, প্রিন্টের কাজ হতে হতেই উবার ডেকেছিলাম, একটা গাড়ি রিকোয়েস্ট এক্সেপটও করলো … সে কাছেই ছিলো, মিনিট পাঁচেকও লাগতো না আসতে, কিন্তু প্রথমে সে রাস্তা কাটা, চলন্তিকা মোড় থেকে কীভাবে সাড়ে এগারো আসবো, কোন রাস্তা দিয়ে আসবে এইসব নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করলো, তারপর কোথায় যাবো সেটা নিয়ে প্যাঁচানো শুরু করলো … আমি বিরক্ত হলেও তাকে কিছু বললাম না … শেষমেশ দেখলাম সে নিজেই ক্যান্সেল করে দিয়েছে … আরেক গাড়ি যেটা কানেক্টেড হলো, সে আসতে বেশ মিনিট দশেক সময় নিয়ে নিলো … ওই মিনিট দশেক আমি কিছুটা এগিয়ে একটু ছায়ায় দাঁড়ানোর পরেও গরমের চোটে আমার মনে হচ্ছিলো যে কোন সময় রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে গেলেও ব্যাপারটা অবাক করার মতো হবে না … পুরাই হিট স্ট্রোক করার মতো অবস্থা …

যাই হোক, টিকিটের ডেট চেঞ্জ করা গেলো কোনো ঝামেলা ছাড়াই … ১৬-২০ জুন কনফার্ম করলাম ডেট … যেই বিল্ডিং-এ বাংলাদেশ বিমানের সেলস সেন্টার, তারই ১৩ তলায় দুরন্ত টিভির অফিস … তো ভাবলাম এসেছিই যখন, একটু ঢুঁ মেরে যাই … আগের যে মুভিটার কাজ করছিলাম, সেটার ইনিশিয়াল কাজ শেষ … এখন ভিডিও দেখে দেখে মেলাতে হবে … যখন স্ক্রিপ্টটা পেয়েছি তখন ভিডিওটা আনা হয়নি … তো ভাবলাম আজকে ভিডিওটা নিয়ে আসলে এই উইকেন্ডের মধ্যে এইটা শেষ করে ফেলা যাবে … তাহলে নতুন আরেকটা মুভির কাজও শুরু করা যাবে … এদিকে তরুণ ভাই দেখলাম আজকে বেশ ব্যস্ত, যেহেতু শিডিউল করে যাইনি, তাই আমাকে বসিয়ে রেখেই তাকে দৌড়াদৌড়ি করতে হলো … ফাঁকে ফাঁকে কথা হলো … এক ফাঁকে বললো ভিডিওটা কয়েকদিন পরে নিতে হবে … বলেই আবার দৌড় … আমি ভাবলাম যে আবার ঘুরে আসলে বলবো যে তাহলে আমাকে নতুন কোনো কাজ দেন, আমি সেটা করতে থাকি … পরে দেখি যে অনেকক্ষণ সময় হয়ে গেছে, তরুণ ভাই আর এদিকে আসছে না … আমিও ভাবলাম যে কতক্ষণ আর বসে থাকবো, এদিকে খুব ক্ষুধাও লেগেছে, আবার কোনো কাজ ছাড়া নিরুদ্দেশ বসে থাকাটাও একটু বোরিং … পরে চলেই আসলাম … 

এদিকে বাসায় এসে পড়লাম আরেক হুজ্জতে … আব্বু ঘুমিয়ে গেছে … বেল দিয়েই যাচ্ছি, দরজা খোলে না … মা কলেজে … মা’কে ফোন করে জানালাম … মা আব্বুকে ফোন করে, তাও রেসপন্স করে না … এর মধ্যে আমেনাও চলে আসলো … আমি আর আমেনা প্রায় মিনিট পনেরো/বিশ দাঁড়িয়েই থাকলাম … পরে মা দুইতলায় বিবির কাছে ফোন করে বললো আমাদের বাসার ইন্টারকমে ফোন করতে, দুইতলা থেকে মরিয়ম বোধহয় ফোন দিলো, সেই ইন্টারকমের আওয়াজে আব্বুর ঘুম ভাঙলো … তারপর আব্বু দরজা খুললো …  

গরম, ক্ষুধা সব মিলিয়েই আজকে আমি কেমন জানি কাহিল হয়ে গেলাম … ভাগ্যিস এইরকম গরমে স্কুলে যেতে হচ্ছে না … না হলে মনে হয় সত্যি সত্যি একদিন হিট স্ট্রোক করে পড়ে থাকতাম! …

সারাদিনের গরমের ধকলে আজকে বিকালে খুব মাথা ব্যথা নিয়ে ঘুমালাম … সেই ঘুমে কি কি সব অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম … তন্দ্রা তন্দ্রা ভাবের মধ্যেই মনে মনে নেপালের ট্যুর প্ল্যান করছিলাম … কবে কোথায় যাবো, কি করবো এইসব … গুগলে কিছু কিছু জায়গার তথ্য, ছবি এইসব ব্রাউজ করছিলাম … তো ঘুমের প্রথম দফায় মনে আছে যে এইগুলাই মাথায় ফিরে ফিরে আসছিলো … অনেকটা মোস্ট রিসেন্ট মেমোরি প্রজেক্ট হবার মতো … তো এই করতে করতেই কোনো এক সময় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়েছি … তখন এটা-ওটা অনেক কিছুই মনে হয় দেখছিলাম … মনে আছে শেষের অংশটুকু … তাও ছাড়া ছাড়া … দেখলাম আমি প্রেগন্যান্ট … ৮/৯ মাস হবে … এর মধ্যে আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট ভালো আসে নাই … সম্ভবত টিউমার সংক্রান্ত কোনো একটা জটিলতা … ডাক্তার বলেছে বাচ্চা না-ও বাঁচতে পারে … এদিকে হঠাৎ দেখলাম স্কুলের অনেক কলিগ … আমাকে স্বান্ত্বনা দেয়ার জন্য আসছে কি না কে জানে! … আমি সামনে সামনে খুব শক্ত হয়ে আছি, ‘ব্যাপার না’ টাইপ ভাব নিয়ে চলছি … ভেতরে ভেতরে কান্না চেপে আছি … মনে মনে বলছি এটাই তো ভবিতব্য হবার কথা … শাস্তি … শাস্তি … কৃতকর্মের ফল …

কেন যে এই একটা বিষয় কিছুতেই মাথা থেকে বের হয় না … মনে হয় এই অনুভূতিগুলা, এই প্রচন্ড রকমের অনুশোচনার অনুভূতিগুলা শরীরেরই একটা অংশ হয়ে গেছে … রক্তে মিশে গেছে মনে হয় …

রক্তের কথা বলতে মনে হলো … গত শনিবার যে ব্লাড টেস্ট করিয়েছিলাম, তার রিপোর্ট-এ দেখা গেলো হিমোগ্লোবিন গত মাসে ৯ ছিলো, এই মাসে আবার ৮ হয়ে গেছে, আয়রন লেভেল গত মাসে সামান্য বেড়ে ৩.৫ হয়েছিলো, এই মাসে আবার সেটা ৩ এ নেমে গেছে … স্কুলের পরীক্ষার খাতা আর রেজাল্টের কাজের ধাক্কায় সম্ভবত এই ডিটোরিয়েশন … তবে ডাক্তার বলেছে জুনের প্রথম সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে দুই ব্যাগ রক্ত আর দুই ব্যাগ আয়রন ট্রান্সফিউশন করতে হবে … খালি ওষুধ খেয়ে অবস্থার উন্নতি হবে না … হাসপাতাল যাওয়ার ব্যাপারটাই ভালো লাগে না আমার … এদিকে আয়রন ট্রান্সফিউশনের নাকি হুজ্জতও অনেক … সব জায়গায় এইটা নাকি ঠিকঠাক মতো দিতে পারে না … হলিক্রসের এক ক্লাসমেট সিফাৎ বলছিলো ওর নাকি আয়রন ট্রান্সফিউশন করতে গিয়ে ভেইনে আয়রন চলে গেছে, হাতে এখন বিশ্রী দাগ পড়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি … এইসব শুনে আমি আরও মিইয়ে গেছি … একদম শিওর না হয়ে এই কাজ করা যাবে না … আর রক্তও যে নেবো … কাকে বলবো? আমি তো এইসব ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে … যা কারোর রক্ত নেবো না আমি … অপরিচিত মানুষের তো নয়ই … প্রথমত সে আমার পরিচিত হতে হবে, দ্বিতীয়ত আমার জানা থাকতে হবে তার রক্তে অন্য কোন রোগের সম্ভাবনা বা আর কোনো সমস্যা নাই … আমার ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তাকে আমার পছন্দসই হতে হবে … এমনিতেই আমার অ্যালার্জি-প্রোন ব্লাড … আমাকে যে রক্ত দেবে তার নিশ্চয়ই আমার সাথে ক্রস ম্যাচ হতেও অনেক ঝামেলা হবে …

এইসব চিন্তা করলেই আর হাসপাতালে যাওয়ার ইচ্ছা হয় না …

যাই হোক, হাবিজাবি অনেককিছু লিখলাম আজকে … আর লিখতে ইচ্ছা করছে না … থ্যাংকস টু দ্য এক্সট্রিম হট ওয়েদার আর আমার সাইনাসাইটিস, অনেকদিন পর খুব বাজে রকমের মাথা ব্যথা নিয়ে বসে আছি … হাতুড়ির বাড়ি মার্কা অনুভূতি হয় এই মাথা ব্যথায় … মনে হয় হঠাৎ হঠাৎ কেউ বুঝি মাথায় একটা গাট্টা মারলো! …

ঘুমালে বোধহয় ঠিক হবে … কিন্তু যেই গরম … ঘুমটাও তো ঠিকমতো হয় না … 

  

দিনযাপন । ২৬০৫২০১৮

মাঝে মাঝে এমন কিছু পরিস্থিতি আসে যখন বিরক্ত হতেও বিরক্ত লাগে! … মনে হয় যে একটা ‘ভালো দিন’ এর ইম্প্রেশন নিয়ে বাসায় ফিরে যদি একটা বিরক্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করতে হয়, তাহলে সেটা নিয়ে কি বিরক্ত হবো, নাকি ইগ্নোর করে যাবো? গতকালকে থেকে ঠিক সেরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে আছি …

যদিও আমার কথায়, আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বেশ বিরক্ত হয়ে আছি একটা কারণে … রিগার্ডিং নেপাল ট্যুর … মানে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি হয় না যে কিছুই করলাম না, কিন্তু দেখা গেলো ভিকটিম অভ্‌ সারকামস্টেন্স আমিই হলাম, সেরকম আর কি! … এইরকম অবস্থায় পড়তে কারই বা ভালো লাগে?

যাই হোক, কালকে সন্ধ্যা পর্যন্তও খুব সুন্দর একটা দিন কাটছিলো … একদম মনের মতো দিন … অনেকদিন পর বেশ আড্ডাবাজি, হাহা-হিহি টাইপ দিন গেলো … সকালে ঘুম থেকেই উঠলাম খুব ফ্রেশ মন নিয়ে … স্কুল ছুটি হয়ে গেছে আগেরদিন, আগামী এক মাসের জন্য খালি শুক্র-শনি সকালে উঠবার রুটিন, এইসব মাথার ভেতর কোড হয়ে গেছে বলেই বোধহয় খুব ঝরঝরে লাগছিলো … রেডি হয়ে বের হবো এমন সময় বৃষ্টি বৃষ্টি একটা ভাব এলো … আমিও সিএনজি-তে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে উবার ডাকলাম … প্রথমে এক শোফার পেলাম যে ‘কোথায় যাবেন’ সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে কিছুক্ষণ প্যাঁচালো, তারপর আমি যখন জোর দিয়ে বললাম যে আমি বলবো না কোথায় যাবো, রাইড স্টার্ট হলেই উনি দেখতে পাবে, তখন ‘আচ্ছা আসতেসি’ বলে মোটামুটি পরের ৫/৭ মিনিট সে একই জায়গাতেই বসে থাকলো … আমিও ভাবলাম যে এই গাড়িতে গেলে নিশ্চয়ই একটা বিরক্তিকর কিছু ঘটবে, তাই ক্যান্সেল করে দিয়ে নতুন করে উবার রিকোয়েস্ট করলাম … এবার ভালো একজন ড্রাইভারই পাওয়া গেলো … একটু দেরি করে বের হলেও রাস্তা ফাঁকা থাকার বদৌলতে আধা ঘণ্টাতেই আলিয়ঁসে পৌঁছে গেলাম, তাও ক্লাস শুরু হবার দুই মিনিট আগেই! …

তো দুপুরে ক্লাস শেষ করে বের হতে যাবো, এমন সময় দেখি কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো … বৃষ্টি দেখে আটকে গেলাম … সিএনজি-তো পাবো না, আবার সিএনজি পেলেও বৃষ্টি জোরেশোরে আসে কি না সেই ভয় … তো উবারই ডাকবো কি না ভাবলাম … এর মধ্যেই উপর্যুপরি কিছু ঘটনার চক্রে আর বাসার দিকে যাওয়া হলো না … হুট করেই একজনের সাথে দেখা হলো, কথা হলো, তার সাথে লাঞ্চ করতেও চলে যাওয়া হলো … পরে মনে হলো, ‘এভ্রিথিং ইন দিজ ওয়ার্ল্ড হ্যাপেন্স টু আস অ্যাজ আ চেইন অভ্‌ অ্যানাদার ইভেন্ট’ থিওরিতে যদি বিশ্বাস করি, তাহলে এই হঠাৎ লাঞ্চ করতে যাওয়ার ব্যাপারটাও সেরকমই পরবর্তী ঘটনার উপলক্ষ্য মাত্র! … আবার লাঞ্চ করতে গেলাম যার সাথে তার ওপর তো আমি নিজেই বিভিন্ন কারণে বিরক্ত ছিলাম এই সপ্তাহখানেক! সেই ব্যক্তি আমার ইনবক্সে পাঠানো মেসেজই এক সপ্তাহ ধরে দেখেনা, অথচ আজকে হঠাৎ দেখা হবার পর নিজেই আমার সাথে খুব নর্মালি কথা বলবে সেটাও আমার এক্সপেক্টেড-ই ছিলো না! … সামনাসামনি দেখা হবার পর আমি যখন ভাবছি এড়িয়ে যাবো না কি করবো, কি-ই বা করা উচিৎ, তখনই সে নিজেই খুব ক্যাজুয়ালি কথা বলতে শুরু করলো, আমারও কেমন সব বিরক্তি পড়ে গেলো! কি আজব! আমিও খুব নর্মালিই কথা বলতে শুরু করলাম। ‘আমার মেসেজ-এর তো উত্তর দেন না, এখন আবার কথা বলছেন!’ টাইপ এক্সপ্রেশন দিলাম না, মুখ ফুটে বললামও না! … অথচ মনে মনে তো আমার অনেক রাগ তার ওপর! তবে আজকে আমি তার সাথে কথা বললাম খুব আরামের একটা অনুভূতি নিয়ে … কেন কে জানে! …

যাই হোক, লাঞ্চ থেকে ফিরে আলিয়ঁসের সামনের টং-এর দোকানে চা খেতে যাবো বলে হাঁটছি, হঠাৎ অমিতের আর্কিটেকচারের ক্লাসমেট শামীম-এর সাথে দেখা … ও-ই আমাকে আগে খেয়াল করেছে, আমি চোখ নিচু করে হাঁটতে হাঁটতে কেবল অনুধাবন করছিলাম যে সামনেই একটা সিএনজি থেমেছে, একজন নেমেছে … তো যে নামলো সে ফুটপাথে না উঠে সিএনজি’র সামনেই দাঁড়িয়ে আছে দেখে চোখ তুলে দেখি শামীম … অনেকদিন পরে ওর সাথে দেখা হলো … আলিয়ঁসে আর্কিটেকচারের একটা এক্সিবিশন হবে সকালেই দেখছিলাম … শামীম বললো সেখানেই এসেছে … ৩টায় নাকি এক্সিবিশন-এর ওপেনিং … তো তখন অলরেডি পৌনে ৩টার মতো বাজে … ভাবলাম যে তাহলে এক্সিবিশনটা দেখেই যাই … তো ৩টার দিকে গ্যালারিতে ঢুকলাম ঠিকই, কিন্তু গ্যালারিতে, ক্যাফেতে বসে শামীম আর ওদেরই আর্কিটেকচারের কয়েকজনের সাথে কথাবার্তা বলতে বলতে শেষে যখন বের হলাম তখন ইফতারের সময়। হয়তো নিজেকে খুব পুশ করে বের না হয়ে গেলে আরও কিছুটা সময় থাকা হতো … কিন্তু আমি মনকে বুঝাচ্ছিলাম যে ইফতারের সাইরেনটা দিয়ে দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে বের হয়ে গেলে রাস্তা একদম ফাঁকা পাওয়া যাবে, সন্ধ্যার পর যদি বৃষ্টি নামে তাহলে বিপদে পড়তে হবে, উবারের ভাড়াও তখন বেড়ে যাবে এইসব এইসব … তো ঠিকই ইফতারের সময় বের হয়ে ২৫ মিনিটে বাসায় চলে আসলাম … রাস্তাঘাট এত ফাঁকা দেখে কেমন একটা পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছিলো! এই না হলে ঢাকা শহর! … কিন্তু আবার মন খচ্‌খচ্‌ও করছিলো … আসলে মন তো অবচেতনে চাইছিলো আরেকটু থাকি আলিয়ঁসে, আরেকটু গল্প-গুজব করি, ভালো বোধ করার অনুভূতিটাকে আরেকটু দীর্ঘায়িত করি … কিন্তু বাস্তবিক কিছু বিষয় চিন্তা করে আমি চলে আসলাম …

তো কালকের সন্ধ্যার উবারের ড্রাইভারটা কেমন অদ্ভুত কিসিমের ছিলো … এমনিতেই রাস্তা-ঘাট ফাঁকা, তার মধ্যে উনি বলা শুরু করলেন যে উবার-এর গাড়িতে যাত্রী থাকা অবস্থায় যদি রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট হয় তাহলে উবারের পলিসি আছে যে সেটার ডেমোরেজ উবার কর্তৃপক্ষই দেবে … হাত-পা ভাঙ্গা থেকে শুরু করে সবকিছুর চিকিৎসার খরচ বহন করবে … এমনকি যাত্রী যদি মারাও যায় … ইয়েস, হি লিটেরেলি মেনশন্ড ইট যে যাত্রী যদি মারাও যায়, তাইলেও নাকি উবারের কত টাকা ক্ষতিপূরণের পলিসি আছে … কিন্তু সেটা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উবার কর্তৃপক্ষের কাছে নোটিফাই করতে হবে … এইসব এইসব … এর মধ্যে লোকটার কথা বলার টোনও খুব রিলাকটেন্ট … আমার মনে হচ্ছিলো থ্রিলার সিনেমার আভের মধ্যে আছি … উনি এখন এভাবে অ্যাকসিডেন্ট নিয়ে কথা বলছেন, রাস্তা ফাঁকা, সিনেমা হলে নিশ্চয়ই এর পরের দৃশ্য হবে আউট অভ্‌ নো হোয়্যার আরেকটা গাড়ি সামনে চলে আসবে, আর এই গাড়িটা অ্যাকসিডেন্ট করবে … আমি মারা যাবো, কিন্তু ড্রাইভার বেঁচে থাকবে … তারপর ড্রাইভার গাড়ি থেকে বের হয়ে জম্বির মতো হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে!… এইসব ভাবতে ভাবতে অবশ্য আর অ্যাক্সিডেন্ট-এ পড়া হলো না, বাসায় পৌঁছায়ই গেলাম …  

এদিকে বাসায় এসে কিছুক্ষণ ধাতস্থ হতে না হতেই নেপাল ট্যুরের কাহিনীর মধ্যে পড়লাম … টিকিট কাটা হয়ে গেলো, এখন শুনি তিন্নি আপু বলতেসে সে একাই ট্যুর দেবে … আমরা বাকি দুইজন যা খুশি, যেভাবে খুশি প্ল্যান করতে পারি! … শামা আপু মাঝখানে যাবে না বলে আবার যাবে বলসে এইগুলা নিয়ে সে হয়তো বিরক্ত, কিন্তু সেখানে আমি তো নিতান্তই পরিস্থিতির শিকার … আমি তো যেতেই রাজি ছিলাম, কিন্তু যখন প্রথমবার টিকিট বুকিং দেয়া হলো তখনো আমার হাতে টাকা নাই যে আমি নিজের টিকিটের টাকাটা নিজেই দেবো … তো শামা আপু বলেছিলো দিয়ে দেবে, আমি পরে ফেরত দেবো … যেহেতু শামা আপু বললো যে যাবে না, আমিও বিপাকে পড়ে গেলাম যে বেতন না পাওয়া পর্যন্ত তো টাকা দিতে পারবো না , টিকিটও করতে পারবো না … তো তিন্নি আপুও বললো তার দুইজনের টিকিট কাটার টাকা নাই, তাই সে নিজের টিকিট নিজেই আগে কেটে নিচ্ছে, আমি যেতে চাইলে বেতন পেয়ে সেইম ফ্লাইটে, সেম দিনের টিকিট কেটে নিতে পারি … তো আমিও সেভাবেই ভেবেচিন্তে রাখলাম … আমার খালি একটাই অবজেকশন ছিলো যে আমি লাস্ট রিসোর্ট যাবো না … যেহেতু বাঞ্জি জাম্পিং করবো না, তাই এমনেই থাকার জন্য লাস্ট রিসোর্ট যাওয়াটা আমার জন্য লেজিট লাগছিলো না … ধরা যাক, ভয়-কে জয় করে সাসপেনশন ব্রিজ কোনোমতে পাড় হয়ে ওইখানে গেলাম, তো আমার যাওয়া-আসা-থাকা-খাওয়ায় ঠিকই একরাতে হাজার পাঁচেক টাকা খরচ হয়ে যাবে! সেই টাকাটাও তো কম না! ওই পরিমাণ টাকায় অন্য যেকোনো জায়গায় আরামে দুই দিন/দুই রাত কাটিয়ে দেয়া যায় … সেকারণেই আমি লাস্ট রিসোর্টে যাওয়ার আরও উৎসাহ পাচ্ছিলাম না … ভাবছিলাম যে তিন্নি আপু গেলে যাবে, আমি না হয় কাঠমান্ডুতেই থাকবো … দরকার হলে সৌর-এর সাথে যোগাযোগ করবো … এদিকে গত শুক্রবারে শামা আপু আবার নক করে জানালো যে উনি যাবে, আমার টিকিট কাটবে কি না … আমিও টিকিট কাটতে বললাম, রবিবারে টিকিট কাটাও হয়ে গেলো … এখনো পর্যন্ত কিন্তু আমার জানা মতে প্ল্যান এরকমই থাকলো যে তিন্নি আপু আর শামা আপু লাস্ট রিসোর্ট যাবে, আর ওইদিনটায় আমি অন্য কোথাও যাবো বা কাঠমান্ডুতেই থাকবো … এদিকে শামা আপু আবার দুইদিন আগে বললো উনিও লাস্ট রিসোর্ট যাবে না … তিন্নি আপুও ঘোষণা দিলো সে কারো সাতে-পাঁচে নাই, একাই ঘুরবে! … আমি মাঝখান থেকে পড়লাম একটা দোটানার মধ্যে! … পুরা ব্যাপারটা এখন কেমন একটা ভজঘট লেগে গেলো! … আমি সন্ধ্যাবেলা বেশ কিছুক্ষণ নিজেই নিজেকে অনেকধরণের যুক্তি দিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা রাখলাম… কারণ সারাদিনের ‘ভালো বোধ’ এর ইমপ্যাক্ট-টা নষ্ট করতে চাচ্ছিলাম না … তো এইটাও ভাবলাম যে রবিবারে বিমানের অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখবো ডেট-টা আগানোর কি সিস্টেম, আর ক্যান্সেল করানোর কি সিস্টেম … পরে ক্যান্সেল করার ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম … টিকিট যেহেতু কাটাই হয়েছে, যাবো না কেন? … যাই ঘুরেই আসি! … খালি এইটা খোঁজ নেয়া লাগবে যে এখন যদি আমরা ১৮-২২ জুন এর ডেট-টাকে ১৫-২০ করতে চাই তাহলে ফাইন-টাইন দেয়ার বিষয়আশয় আছে কি না, থাকলে কত এইসব …

এইসবকিছু মিলিয়েই হঠাৎ করেই কেমন খুব বিরক্তির অনুভূতি তৈরি হলো কালকে সন্ধ্যায়, সেই বিরক্তিভাবটা আজকের সারাদিন অবধি সাস্টেইন করলো … মনে মনে ভাবনারা ঘুরপাক খাচ্ছিলো যে মনে মনে তো খুব চাইছিলাম ভুটান যেতে, গত ৩/৪ মাস তাইই ভাবছিলাম যে ভুটান যেতে পারলে খুব ভালো লাগতো … কিন্তু ঘটনাচক্রে নেপালের প্ল্যান হলো, টিকিটও কাটা হলো, এখন আবার এত ক্যাচাল! এর চেয়ে ভুটান যাওয়ার প্ল্যান করতাম, সেটাই বোধহয় ভালো হতো! … অবশ্য ভুটান যাবে এমন কাউকে পাচ্ছিলাম না দেখেই নেপাল যাওয়ার প্রস্তাব যখন আসলো তখন ‘পাহাড়েই তো!’ ভেবে নিয়ে নেপালের প্ল্যানে ঢুকে গেলাম … কিন্তু ঘটনা কী হলো শেষ পর্যন্ত? একেবারে জগাখিচুড়ি! … নেপালের প্লেনে উঠতে উঠতে আরও কি কি কাহিনী হবে কে জানে!

এদিকে, আজকে ফ্রেঞ্চ ক্লাসে পরীক্ষার তারিখ ফিক্স করে ফেললো ২২ জুন … তারমানে এটা এখন ইনেভিটেবল হয়ে গেলো যে শামা আপু টিকিটের ডেট চেঞ্জ করুক বা না করুক, আমাকে চেঞ্জ করতেই হবে! … অন্তত ২১ তারিখে ফিরতেই হবে আমাকে … এদিকে আমি আবার ভাবছি ২১ তারিখে তো আলিয়ঁস ফ্রঁসেস-এ ‘ফেত্‌ দ্য লা ম্যুজিক’ হয়, সেইটাই বা মিস করবো কেন? তাইলে ১৫ তারিখে গিয়ে ২০ তারিখেই ফিরি! সবাই সবার সুবিধাটাই দেখছে, আমি কেন আমারটা দেখবো না? … আমি নেপালেও যাবো, আলিয়ঁসের মিউজিক ফেস্টিভ্যালেও থাকবো, ২২ তারিখে পরীক্ষাও দেবো! …

আজকে কেমন জানি অস্থির লাগছে … দুপুরবেলা ক্লাস শেষ করে হাসপাতালে গেলাম ব্লাড টেস্ট করানোর জন্য … এক মাস পর পর আয়রন লেভেল চেক করার জন্য ব্লাড টেস্ট করানো এখন একটা রুটিন হয়ে গেছে … তো আলিয়ঁস থেকে টেকনিক্যাল যাবো, ভাবলাম রাস্তা তো খালিই থাকবে, সিএনজিই নিয়ে নেই … উবারের ভাড়াও ওইসময় প্রায় সিএনজি ভাড়ার সমান সমানই দেখাচ্ছিলো … তাও ভাবলাম যে থাক, বিলাসিতা হয়ে যাবে নিশ্চয়ই … সিএনজি-তে উঠে বুঝলাম খুব ভুল একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি … একে তো সিএনজির ভেতরে প্রচণ্ড গরম লাগতে শুরু করলো, একেবারে সেদ্ধ হবার অনুভূতি, তার মধ্যে রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম! … পরে শুনলাম যে আমিনবাজারের ওইদিকে নাকি দুপুরের দিকে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, সম্ভবত ওইটার কারণেই জ্যাম ছিলো … তো আমি সিএনজি’র ভেতরে ঘামতে ঘামতে অস্থির হয়ে গেলাম … কেমন অস্থির লাগতে শুরু করলো … কোনোমতে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তো সাথে সাথেই ব্লাড টেস্টের জন্য বসে গেলাম … এদিকে ব্লাড টেস্ট করে বের হয়ে হুট করেই মা’র সাথে কথায় কথায় প্ল্যান হয়ে গেলো আড়ং-এ যাবো … ক্ষুধাও লেগেছে, আবার মা’রও কি কি কেনাকাটা আছে আব্বুর জন্য … তো আড়ং-এ গিয়ে খেয়ে-দেয়ে, কেনাকাটা করে বের হতে হতে প্রায় ৫টা বেজে গেলো … বাসায় ফিরে হঠাৎ করে খুব খারাপ লাগতে শুরু করলো … কেমন গরম লাগতে শুরু করলো, ঘুমে পড়ে যাবার মতো অনুভূতি হলো … তন্দ্রা তন্দ্রা ভাব নিয়ে শুয়েও রইলাম কতক্ষণ, কিন্তু বাইরের কাপড় পড়ে আছি, আবার ঘামছি এর মধ্যে আর শুয়ে থাকতেও ইচ্ছা করলো না, ঘুমও হলো না … উঠে বরং গোসল করলাম … তাতে একটু আরাম লাগলো …

কিন্তু আড়ং-এ গিয়ে আজকে একটা ব্যাপারে হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে গেলাম … প্রথমত অনেক অনেক টপস-এর মধ্যে নিজের এই বেঢপ শরীরের সাথে যেতে পারে এমন তিনটা টপস বের করতে পারলাম অনেক খুঁজে পেতে … সেগুলোর আবার ‘এক্সট্রা লার্জ’ কিংবা ‘প্রেগ্নেন্সি’ সাইজ ছাড়া আমার গায়ে হবার সম্ভাবনা কম … ইদানীং এক্সট্রা লার্জ-ও অবশ্য লাগে না … ‘প্রেগ্নেন্সি’ সাইজটা নিতে হয় … এটাকে একরকম উপহাস হিসেবে ধরে নিয়েই এখন আড়ং থেকে কাপড়চোপড় কিনি … যাই হোক, আজকে তিনটা টপস-এর একটাও ঠিকঠাকমতো হলো না … ট্রায়াল রুমে একেকটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াই, আর নিজের কাছেই নিজেকে কেমন হাস্যকর টাইপের বেঢপ লাগতে থাকে … তারপর ভাবি যে এই জামা পরে রাস্তায় বের হলে তাইলে অন্য লোকে কি বলবে? … পেটটা যেন দিন দিন বড়ই হয়ে চলেছে … যেই জামা-ই গায়ে দেই না কেন, দেখতেই কেমন জানি লাগে!

কিন্তু তারপরও আমার টিউমাররা নিয়ে কিছু করতে ইচ্ছা করে না … মনে হয় এইটা রিমুভ করার ইনিশিয়েটিভ নিলেই নিজেকে অনেক বেশি প্রায়োরিটি দেয়া হয়ে যাবে! … আমি সেটা চাই না … নিজেকে প্রায়োরিটি দিয়ে চলার মতো অধিকার এখনো অনুভব করতে পারিনা আমি … সেটা ভাবতে গেলে মনে হয় আমিই তো আমার এই যাবতীয় অবস্থার জন্য দায়ী, আমি আবার আমার নিজের ভালো চাইবো, নিজেকে প্রায়োরিটি দেবো কোন অধিকারে ? …

যাই হোক, গত দুই/তিন দিনের মধ্যে সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার এটাই ঘটেছে যে স্কুলটা আগামী ১ মাস ৮ দিনের জন্য বন্ধ হয়েছে! জুলাইয়ের ২ তারিখে স্কুল খুলবে … এইবারের মতো একটা হেক্টিক এবং প্রচণ্ড বাজে একটা সেশন যে শেষ হয়েছে, এতেই আমি মহাখুশি! …  

আর লিখতে ইচ্ছা করছে না আজকে … ভেবেছিলাম ফেসবুকের নতুন বিনোদন ‘স্টুলিশ’ মেসেজ অ্যাপ্লিকেশনটা নিয়ে লিখবো … মানে গত দুই/তিন দিনে ওখানে যা যা মেসেজ পেয়েছি সেসব নিয়ে … কিন্তু এখন আর ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকতে ভালো লাগছে না … এই লেখাটা শেষ করে এটা ওয়ার্ডপ্রেসের পেজ-এ নিয়ে ছবি-টবি দিয়ে গুছিয়ে পোস্ট করতেও তো বেশ খানিকটা সময় চলে যাবে … ফলে লেখার পেছনে আর সময় দিতে ইচ্ছা করছে না …

অতএব আজকের মতো শেষ করি … হঠাৎ করে খুব বিষণ্ণ লাগছে সবকিছু … চোখ ফেটে কান্না আসা টাইপের বিষণ্ণতা … গত দুইদিনের আপাত ইতিবাচক অনুভূতির জলাঞ্জলি হলো বোধহয় … এখন সবকিছু আমার মধ্যে আস্তে আস্তে নেতিবাচক ভাবনা আসতে শুরু হবে … কিছুই আর ভালো লাগবে না …

যাই হোক, শেষ করি বকবকানি …  

দিনযাপন । ২১০৫২০১৮

গতকালকে সারাদিন পার করে রাত প্রায় ১২টা সময় রিয়েলাইজ করলাম যে আব্বু বাসায় নাই … আব্বুর খুলনা যাবার কথা শুনছিলাম, কিন্তু কালকেই যাবে সেটা খেয়াল ছিলো না… কালকে দুপুরে মা যখন বললো ‘তোমার আব্বু একটু আগেই বের হয়ে গেলো’, তখন মাথায় কাজই করে নাই যে ‘বের হওয়া’ বলতে মা বাসা থেকে বের হওয়া বুঝিয়েছে … আমি ভাবছিলাম যে বাথরুম থেকে গোসল করে বের হয়েছে বোধহয়, আর আমি খেয়ে উঠলে আব্বু খেতে বসবে, সে কথা বলছে … সন্ধ্যা থেকেই মা কেন বাসার দক্ষিণ পাশে, যেখানে শোবার ঘর, টেলিভিশন, ডাইনিং রুম সেখানে না থেকে উত্তর পাশেই এসে বসে আছে, সেটাও আনইউজুয়াল লাগছিলো, কিন্তু তখনও মাথায় এটা কাজ করে নাই যে বাসায় আব্বু নাই তাই ওইদিকটা সম্পূর্ণ খালি… যেহেতু উত্তর দিকে নিজের থাকার জায়গাটা থেকে শুধুমাত্র দুপুরের খাওয়া আর বাইরে বের হওয়া ছাড়া আর কোনো কারণে বাসার দক্ষিণ দিকটায় যাওয়াই হয় না আমার, আর আমি আর আব্বু দুইজনই বাসার দুই প্রান্তে নীরব, নিশ্চুপ বাসিন্দা হিসেবেই থাকি, তাই আব্বুর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি টেরই পাই না আমি … তো রাতে কথায় কথায় মা যখন হঠাৎ বলে উঠলো, এত বড় বাসা, তোমার আব্বু নাই, ওইদিকটায় গেলেই ক্যামন জানি লাগে … পুরাই তো খালি … এর চেয়ে এইদিকেই বসে থাকি … তখন আমার মনে হলো যে ‘ওহ আচ্ছা, আজকে তো আব্বুর খুলনা যাবার কথা…’

নিজের অবস্থা বুঝে নিজেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম আমি … তবে, সেইম ঘটনা আব্বুর ক্ষেত্রেও ঘটে, যেহেতু সে তার দক্ষিণ রাজ্য থেকে এই উত্তর রাজ্যে কদাচিৎ আসে … মাঝে মাঝে আব্বুও শুনি ডাইনিং রুম থেকে রাত ১০টা/সাড়ে ১০টার দিকে মা’কে জিজ্ঞেস করে, ‘ত্বিষা বাসায় ফিরে নাই এখনো?’ … বাসায় ঢুকলে নিজের থাকার জায়গাটায় এত নীরব, নিশ্চুপ হয়ে থাকি যে মাঝে মাঝে নিজেরই অবাক লাগে! এই আমিই বাইরে গেলে, কিংবা আশেপাশে মানুষদের সাথে কত কথা বলি! … কারণে, অকারণে কথা বলি! … তবে, আমার মনে হয় ঘরের বাইরেও আস্তে আস্তে আমার ঘরের মতোই চুপচাপ হয়ে যাওয়া উচিৎ … কথা বলতে গেলেই মানুষজনের সাথে বিরক্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয় … নিজের জন্য … অন্যের জন্যও … তাই যত কম ইন্টারঅ্যাক্ট করা যায় ততই ভালো …  

যাই হোক, গত তিন/চারদিনের চাইতে গতকালকে থেকে তুলনামূলকভাবে আমার মাথা ঠান্ডা … মেজাজও কিছুটা শান্ত … এমনকি, গতরাত থেকে ওষুধও খাচ্ছি আবার, জানালা দিয়ে ফেলে দিচ্ছিনা গত কয়েকদিনের মতো … আগামীকাল আবার কেমন যায় কে জানে! …

তবে, এর আগের তিন/চারদিন যে মেজাজ খারাপ করার মতো কিছু ঘটেনি তাও না … বরং নিজের ওপর, অন্যের ওপর রাগ করার মতোই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে একের পর এক … মা’র সাথে কথায় কথায় লেগে গেলো, অমিত বাসায় আসলো ওর সাথে লেগে গেলো, এর সাথে তার সাথে বিরক্তির উদ্রেক করা ঘটনা ঘটতেই থাকলো … গতকালকে আবার সারাদিনই আবহাওয়া খুব শান্ত গেলো … নিজেরও মন-মেজাজ ভালো বোধ হলো, এমনকি কারো সাথে লাগলোও না… আজকে আবার স্কুলে এক-দুইটা বিষয় নিয়ে বেশ বিরক্ত হবার মতো ঘটনা ঘটলো … তবে, কারো সাথে সরাসরি তর্ক বাঁধেনি তাই-ই অনেক …

সেদিন মা’র সাথে কি নিয়ে লাগলো? দুপুরবেলা হোক আর সন্ধ্যাবেলা হোক, সাধারণত স্কুল ডে-গুলোতে আমি বাসায় ফিরি খুব ক্ষুধা নিয়ে কারণ বাইরে আমার খুব একটা ভারী খাবার খাওয়া হয় না স্কুল থাকলে … দেখা যায় ৯টা/১০টার দিকে একটু হাল্কা কিছু খাই, তারপর প্রায় ৩টা/ ৪টা নাগাদ বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে আর কিছুই খাওয়া হয় না … ফলে ক্ষুধার অনুভূতি থাকে তীব্র … বাসায় ঢুকেই আমি কাপড়চোপড় ছেড়ে ফ্রেশ হতে পারি না কারণ প্রায় ১০/১২ কিলোমিটারের জার্নি করে বাসায় ফিরতে ফিরতে আমার পিঠ, কোমর সব শক্ত হয়ে যাবার অনুভূতি হয় …  অন্তত আধাঘণ্টা বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে থেকে একটু বিশ্রাম নিতেই হয়… ক্ষুধা তখন আরও চাগাড় দিয়ে উঠতে থাকে … এদিকে গত শনিবার ফ্রেঞ্চ ভাষার ক্লাস থেকে ফিরতে ফিরতে খুব ক্ষুধা লেগে গেলো … আমি সেদিন প্রায় ঘণ্টাখানেক বিছানায় গড়াগড়ি করে সময় পার করে তারপর যখন খাবো বলে ডাইনিং রুমে গেলাম, তখন মা বলে ‘তোমার ভাত মাত্র বসিয়েছি, দেরি হবে’ … আমার জন্য বাসায় মিনিকেট চালের নরম ভাত করা হয়, কারণ বাসায় আব্বুর জন্য যে ঝরঝরা ভাত রাঁধে সেটা আমার খেতে কষ্ট হয় … কিন্তু মাঝে মাঝে ওই মোটা, ঝরঝরা ভাতই তো আমি খাই… যদি দুপুরে মা কলেজে থাকে আর আব্বু ভাত গরম করে, তাহলে তো আর নরম ভাত খাওয়ার সুযোগ হয় না … তো ওইদিন ক্ষুধা পেটে ভাত রান্না হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে এইজন্য মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো … ভাত যদি রাঁধবেই তো আগেই রেঁধে রাখতো, নয়তো আমি বাসায় ঢুকবার সাথে সাথেই রাঁধতো! আমি বাসায় চলে এসেছি প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়ে গেছে, এখন আবার আরও আধা ঘণ্টা বসে থাকবো ভাতের জন্য? … ক্ষুধা পেটে শক্ত ভাতই কি আর নরম ভাতই কি! … রাগে কতক্ষণ গজগজ করলাম এইটা নিয়ে … এই ভাতের টাইপ নিয়েও যে আমার আর আব্বুর কেন এত অমিল! আব্বু নরম, গলাগলা ভাত হলে মুখেও দেবে না, আমি শক্ত, ঝরঝরা ভাত হলে চোখমুখ শক্ত করে বিষ খাচ্ছি টাইপ এক্সপ্রেশন দিয়ে সেই ভাত খাবো! …   

এদিকে অমিতের সাথে হাল্কা-পাতলা একটু লাগলো, কিবোর্ড নিয়ে … আমার একটা মিডি কিবোর্ড আছে … পিয়ানো বাজানো শিখতাম যখন, তখন প্র্যাকটিস করবো বলে কিনেছিলাম … সেন্ট্রাল রোডে থাকতে সেটা জায়গার অভাবে পাঁচ তলায় রেখে এসেছিলাম … পরে শরীফ ভাই ভায়োলিনের ক্লাস নেয়ার সময় ওইটা মাঝে মাঝে ব্যবহার করতো … সম্ভবত মেট্রোনম-এর জন্য … তো এখন সেটা নোবেল ভাইয়ের বাসায় আছে … আমার আর কিবোর্ড-টা এই বাসায় আনা হয় না বিভিন্ন আলসেমিতে … একে তো মোহাম্মদপুরে নোবেল ভাইয়ের বাসায় সাত তলা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে শুনেই যেতে ইচ্ছা করে না, তারওপর মিরপুরের বাসায় এখনো আমার পরিকল্পনার ‘মিউজিক কর্ণার’ করার জন্য জায়গাই গোছাতে পারিনি … তো অমিত হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো ‘তোর না একটা কিবোর্ড ছিলো?’ বললাম যে সেটা নোবেল ভাইয়ের বাসায় … ও বললো যে ওটা নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে … আমি কই নিবি জিজ্ঞেস করতে ও খালি বলে সারলো যে ‘দেখি কই নেয়া যায়’, আমি বলে উঠলাম, ওই কিবোর্ড নোবেল ভাইয়ের বাসা থেকে বের হলে একমাত্র এই বাসায় আসবে, আর কোথাও না … ও-ও বেশ বিরক্তি দেখায় ঘর থেকে চলে গেলো … আমার মনে এই চিন্তা কাজ করছিলো যে এইটা যদি ও গ্রুপে নিয়ে যায়, সেখানে হয়তো এটার বারোয়ারি ব্যবহার শুরু হয়ে যাবে … এমনিতেই বকুল ভাই সেই কবে আমার কাছ থেকে আমার নেপাল থেকে আনা চ্যান্টিং বোলটা নিয়েছে, সেইটা আমি যতই চাই আর ফেরত দেয় না! … বছরখানেকের বেশি হয়ে যাবার কথা! … এ এক আজব আচরণ … মনে হচ্ছে একদিন খুব বিরক্ত হয়ে দুইটা রূঢ় কথা না বললে ওইটা আর আমার বাসায় ফেরত আসবে না! … আমি বকুল ভাইকে নিজে গরজ করে পর্যন্ত নেপাল থেকে একটা চ্যান্টিং বোল আনায় উপহার দিলাম, কিন্তু আমার ওই চ্যান্টিং বোল ছাড়া নাকি তার ‘মুল্লুক’ নাটকের একটা বিশেষ জায়গায় মিউজিক হয়ই না! … তো সে যাই হোক, ফেরত তো দেবে! … দরকার হয় শো-এর সময় নিয়ে যাবে … তা না! ওইটা একেবারে হাতছাড়া হবার যোগাড়! …

তবে, এইসব ছোটোখাটো রাগারাগির আগে আরেকটা ঘটনা ঘটলো, যেটার প্রেক্ষিতে আসলে দুইদিন ধরে মন-মেজাজ খারাপ থাকার পাশাপাশি সবার সাথে কথায় কথায় খুব লাগলো … এতই বিরক্তিবোধ হচ্ছিলো ব্যাপারটা নিয়ে যে সেটার প্রতিক্রিয়া গিয়ে আসলে অন্যদের ওপরে পড়ছিলো … ঘটনাটা কার সাথে ঘটলো সেটা এখানে উল্লেখ করা খুব জরুরি না, কিন্তু ঘটনাটার রেফারেন্স রাখা জরুরি …যার সাথে এই রাগ করার ব্যাপারটা ঘটলো তার অনেক কিছুই আমার খুব পছন্দ, আবার কিছু কিছু বিষয় আছে আমি নিতেই পারি না … যা যা ভালো লাগে সেসব যেমন খুব উজ্জ্বল হয়ে ফিরে ফিরে আসে না, যা যা আমি নিতে পারি না সেগুলোই না চাইতেও প্রবল বিক্রমে বার বার ফিরে আসে! এ আরেক আজব বিষয়! … যেমন, ওইদিন সেই ব্যক্তি যে আচরণটা করলো সেরকম সে আগেও এক-দুইবার করেছে, আমি তখন তাকে বলেছিও যে এইরকম না করতে কারণ আমার ভালো লাগে না , কিন্তু দেখা গেলো আমার কি ভালো লাগে বা লাগে না সেটা বলা না বলায় আসলে তার কখনোই তেমন ভাবান্তর হয়না … ঘটনা হচ্ছে, সে যদি আমাকে কারো কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়, তাহলে কেন জানি উনি শুধু নাম বলে, বা তার সাথে আমার পরিচয়সূত্র কি সেটা বলেই সে থামে না … বরং নতুন পরিচয় হওয়া ব্যক্তির সাথে আমার হাই-হ্যালো হবার পর আর কোনো কথা আগানোর আগেই উনি একে একে বলতে থাকেন ‘ ও কিন্তু একজন আর্টিস্ট! ও ভালো ছবি তোলে, ও থিয়েটার করে, ও ভায়োলিন বাজায়, ও ঢাকা ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি’ … আমার তখন খুব বিব্রত লাগে এই ব্যাপারটায় … কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রথম পরিচয়েই সবাইকে আমার ব্যাপারে সবকিছু জানাতে চাই না … আর যার কথা বলছি, সে নির্দিষ্টভাবে আমার যা যা বিষয় হাইলাইট করে, তার একটাও তো অবশ্যই না … কিন্তু সে এটা সবসময়ই করে … এবং আমি বিব্রত হয়েই যাই … যাকে এগুলা বলা হচ্ছে সে আমার ব্যাপারে কি ইম্প্রেশন পাচ্ছে, কিংবা আদৌ প্রথম পরিচয়েই একজন আমার ব্যাপারে এইসব কথাবার্তা শুনতে চায় কি না সেসব চিন্তা আমাকে বিব্রত করে … আমি নিজে তো কারো সাথে পরিচয় হলে নিজের নাম ছাড়া আর কিছুই পারতপক্ষে বলিই না … সেখানে আরেকজন আমার ব্যাপারে এভাবে কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই এতগুলা বিশেষণ দিয়েই যাচ্ছে, তাও আবার এমন কাউকে যে নাকি খালি আমার নামটাই জানলো একটু আগে, ব্যাপারটা ‘ধরণী দ্বিধা হও, আমি তন্মধ্যে প্রবেশ করি’ টাইপের অনুভূতি উদ্রেক করে … আর তার চাইতেও বড় কথা, আমি তো আগেও এ ব্যাপারে আমার বিরক্তি প্রকাশ করেছি তার কাছে, সুতরাং আমার এক্সপেকটেশন থাকবেই যে ব্যাপারটা সে কন্সিডার করবে … তো সেদিনও একজনের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে সে বলতে শুরু করলো আমি এই, আমি সেই … এমনিতেই কয়েকদিন ধরেই আমার নিজের ওপরেই নিজের প্রচণ্ড বিরক্তি, সেই ব্যক্তির ওপরও কিঞ্চিৎ বিরক্তি, তার মধ্যে আবারো এরকম বিব্রত হবার অনুভূতিটা খুব গায়ে লেগে গেলো … এমন রাগ হচ্ছিলো তখন! … মোটামুটি ইনক্রেডিবল হাল্ক-এর মতো ফুলে ফেঁপে ওঠা রাগ! … ভাবছিলাম, আমার ব্যাপারে ইম্প্রেশনটা কি হচ্ছে মানুষটার, যে মাত্রই আমাকে দেখলো, আমার নামটা জানলো, এখন আবার এমন এমন সব বিশেষণ শুনছে আমার নামে ? নিশ্চয়ই মনে মনে হাসছে আমাকে নিয়ে! … আমি নিজেই মুখ শক্ত করে হাসি দিয়ে তাকে, মানে যার সাথে পরিচয় হলো তাকে বললাম, ‘না, না! আসলে আমি জ্যাক অভ্‌ অল ট্রেডস’ … ভেতরে আটকে থাকা রাগটা না ওইখানেই প্রকাশ হয়ে যায়, সেটা খুব নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিলাম নিজেকে অনেক কিছু বলে বলে … আলটিমেটলি রাগ আমি দেখালামই … সামনাসামনি নয়, তবে মেসেঞ্জারের ইনবক্সে … আমার কথা বলার টোন খুব ভালো ছিলো না অবশ্যই … মানে, পিসড অফ ফিল করলে আমার যা হয় কি! ধারালো কথাবার্তা বের হতে থাকে … সেরকমই হলো … সেই ব্যক্তি তাতে বিরক্ত হতেই পারে … ভাবতেই পারে যে এভাবে তার সাথে আমি অন্তত কথা বলতে পারি না … কিন্তু আমার নিজেকে এত বিব্রত লাগছিলো সেইদিন যে উনি বিরক্ত হলো কি না সেটা ভাববার মতো মন-মেজাজই ছিলো না … সেই সাথে আগের আরও অনেকগুলা জমা রাগ-ক্ষোভ ছিলো তার প্রতি, সেগুলোও বিস্ফোরিত হলো … আর সেই রাগ থেকে উদ্ভূত হওয়া চরম বিরক্তির একটা অনুভূতি মোটামুটি পরের দুইদিন পর্যন্তও ভীষণভাবে জ্বালাচ্ছিলো ভেতরে … খালি মনে হচ্ছিলো এত ফালতু নাকি আমি যে এভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়বো বারবার? … বিরক্তির চোটে সেই ব্যক্তি এখন অবশ্য পুরাই সাইলেন্ট মোডে চলে গেছে … আমার আবার সাইলেন্সও পছন্দ না… মনে হয় যে বিরক্ত হলে, রাগ হলে সেটা প্রকাশ করাটাই বেটার … তর্ক হোক, তাও ভালো … তাতে অন্তত নিজের সাথে নিজের একটা স্বচ্ছতা থাকে …

যাই হোক, আজকে সারাদিনে তো একটু শান্ত ছিলো মন-মেজাজ … কাল আবার কি হবে কে জানে! …

তবে, এই সময়টাই যন্ত্রণার … এই যে আজকে, কালকে, পরশু, তার পরদিন , কিংবা তার পরের দিন … মে মাসের এই শেষ কয়েকটা দিনই খুব যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিকে বহন করে চলা সময় … বিশেষ করে ২৪-২৬ তারিখ আসলে আমার মন বিক্ষিপ্ত থাকে সবচেয়ে বেশি … এইবার মনে হচ্ছে ওইদিনগুলোতে কোনো একটা বোম ফাটিয়ে নিজের ভেতরে চাপা থাকা কিছু জিনিস একেবারে প্রকাশ করে ফেলবো … তারপর যা হয় হবে … অন্তত নিজের মনের ভেতর কিছু চেপে রাখতে তো পারি না আমি … তাতে আমার আরও অস্বস্তি বাড়ে … পৃথিবী জানুক সবকিছু! … এক ধাক্কায় … তারপর একেবারে নীরব হয়ে যাবো আমি … আমাকে নিয়ে মানুষ যা ভাবে সব জেনে-শুনে তবেই ভাবুক, হালকার ওপর ঝাপ্সা মন খারাপের কথাবার্তা পড়ে পড়ে কি হয়েছে না হয়েছে ভুলভাল ভাবার দরকার নাই …

যেমন, যারা যারা প্রতিদিন ফেসবুকে আমার খুব হতাশাবাদি লেখাগুলো পড়ে, তাদের মধ্যে খুব বেশি হলে হয়তো ৮/১০ জন মানুষ জানে আমার যাবতীয় রিগ্রেট-এর অনুভূতির ভিত্তি কি … বাকিরা নিশ্চয়ই ধরেই নেয় যে আমার সকল লেখালেখির মূলে প্রেমে ব্যর্থতা টাইপ কিছু একটা আছে … অথচ, যেই ঘটনাটা নিয়ে আমি ক্রমাগত অনুশোচনা করে যাই, কষ্ট পাই, নিজেই নিজেকে প্রচণ্ড শাস্তি দেই সেই ঘটনার সাথে সোহেলের সম্পর্ক আছে ঠিকই, কিন্তু সোহেলের সাথে তো আমার আদৌ প্রেম-এর সম্পর্ক ছিলো বলা যায় না এবং সেটা নিয়ে আমি মোটেও কখনো ব্যথিত ছিলাম না … একরকম অনুভূতিহীন জায়গা থেকেই ওর সাথে মিশেছি … সোহেলের সাথে আমার যে এখন কোনো যোগাযোগও নেই সেটা নিয়ে আমার মধ্যে প্রশান্তির অনুভূতিই বরং বেশি … এমনকি এই মুহুর্তে কারো সাথে নতুনভাবে কোনো সম্পর্কে যাবার কথাও আমি ভাবতে পারি না … অন্তত যদি না কখনো আমার প্রতি কারো আচরণে আমি যথেষ্ট কনভিন্সড না হই যে সে আসলেই আমাকে ভালোবাসে বা আমার ব্যাপারে সে সিরিয়াস, এবং সেই অনুভূতি সে যতক্ষণ পর্যন্ত নিজে থেকে মুখ ফুটে প্রকাশ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আসলে কোনোভাবেই কোনোরকম সম্পর্কে জড়ানোর ব্যাপারে ভাবারই প্রেষণা পাবো না … ফলে, মানুষ যদি ভাবে যে আমি ফেসবুকে বা ইন্সটাগ্রামে যা যা হতাশামূলক কথাবার্তা লিখি সেসব প্রেম নেই, কিংবা প্রেম হয়না বলে, সেই ভুল মানুষের ভাঙ্গা উচিৎ! … 

এমনকি, একটু আগেই যার সাথে রাগ করার ঘটনা নিয়ে লিখলাম, আমার কেন জানি মনে হয় সেই ব্যক্তিও ভাবে যে আমি তার সাথে যোগাযোগ করি এইজন্য যে আমি আসলে তার সাথে প্রেম-টেম করতে চাই … তো সেই ব্যক্তিও আমাকে নিজ দায়িত্বেই মাঝে মাঝে শুনিয়ে দেয় কেন সে এখন প্রেম-টেম করতে চায় না, কিংবা কেন সে বিয়ে করেনা, কিংবা আমাকেই মাঝে মাঝে খোঁচায় ‘ তুমি কেন বিয়ে করছো না?’ ‘তুমি বিয়ে করে ফেলো প্রজ্ঞা! তোমার একাকীত্ব কাটবে!’ … খুব বিরক্ত লাগে তখন … মনে হয় যেন আমি বিয়ে করলে উনিই হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে যে উনার আমার সাথে কিছু করতে হলো না! আমি তার সাথে মাঝে মাঝে যখন খুব মন খারাপের কথা বলি, একা লাগার কথা বলি, সে আমাকে বলে ‘ তুমি সাইকোলজিস্ট-এর কাছে যাও…বিষণ্ণতার চিকিৎসা নাও … আমি তো এসবের কোনো সমাধান করতে পারবো না”… তখন আরও বেশি বিরক্ত লাগে! … কারণ কাউকে তো আমি আমার সমস্যার দায় নিতে কখনো বলি না! তাকেও বলি না … মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ হলে একটু সহানুভূতিশীল আচরণ আশা করি … মনে হয় যে কেউ একটু ইন্সপায়ারিং কিছু বলুক, একটু বুঝাক, অন্তত বলুক, ”থাক, মন খারাপ করো না … একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে” … কেউ এইটুকু বললেই তো খুব মন খারাপের মনে ভালো লাগে … আমার সাথে কেউ একটু বন্ধুসুলভ আচরণ করলে, সামান্য একটু যত্নশীলতা দেখালেই আমার ভালো বোধ হয়  … সে আশেপাশে যে বা যারাই হোক না কেন … কিন্তু সেরকম না করে কেউ যদি খুব দায়সারা আচরণ করে, তখন মন আরও খারাপ লাগে … আবার ধরা যাক, যার কথা বলছিলাম, সেই ব্যক্তিকেই আমি যদি বলি ‘আপনি এইসব বললে আমার খারাপ লাগে’ বা ‘আপনার এসব কথায়, আচরণে আমি অনেক কষ্ট পাই’ উনি হয়তো ধরেই নেয় আমি আসলে তার সাথে কেন আমার কিছু হচ্ছে না সেটা নিয়ে কষ্ট পাই! … কিন্তু এইটা বোঝেনা যে আমার বন্ধুসুলভতাকে কেউ প্রেমের আকুলতার মতো করে ভাবলেই  আমি আসলে বেশি অস্বস্তি বোধ করি আর কষ্টও পাই … 

যাই হোক, এইসব কথাবার্তা আপাতত বাদ দেই …

নেপাল ট্যুরের আপডেট দেই বরং … শামা আপু শেষমেশ আবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে উনি যাবে … আজকে টিকিটও করে ফেলেছে উনি … তিন্নি আপু আগেই টিকিট করে ফেলেছে, তাই আমাদের দুইজনেরটা করা হলো আজকে … আমি আবার গতকালকে জেসি আপুকে নক করে খোঁজ-খবর নিচ্ছিলাম যে লাস্ট রিসোর্টে যাওয়ার প্রক্রিয়া কি এইসব এইসব … তো কথাবার্তা বলে নিশ্চিত হলাম যে একটা সাসপেনশন ব্রিজ পাড় হয়েই রিসোর্টে যেতে হয় … এই সাসপেনশন ব্রিজের কথা শুনেই লাস্ট রিসোর্টে যাবার সকল ইচ্ছা-আগ্রহ চলে গিয়েছে আমার, কালকে নিশ্চিত খবর পেয়ে আরও দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম … উনি আবার খুব সাহস দিলো যে ওই ব্রিজ খুব একটা দোলে না … আর সাহস করে চলে গেলে খুব ভালো লাগবে … কিন্তু আমি জানি না আমি আসলে কি সিদ্ধান্ত নেবো … সম্ভবত আমি এই প্ল্যানেই স্ট্রিকড থাকবো যে তিন্নি আপুরা লাস্ট রিসোর্টে গেলে যাবে, আমি অন্য কোথাও ঘুরবো … পাটান স্কয়ার, ভক্তপুর স্কয়ার, দরবার স্কয়ার … কাঠমান্ডুর এই প্রাচীন তিন সীমানা সময় নিয়ে ঘুরবার ইচ্ছা আছে আমার … কিংবা চলে যাবো লুম্বিনি, বুদ্ধের জন্মস্থানে … কিন্তু লাস্ট রিসোর্টে যাওয়ার মোটিভেশন এখনো পাচ্ছি না … আবার এটাও ভাবছি যে দিনের বেলা না হয় একা একা ঘুরলাম, রাতে কীভাবে কি করবো? … লাস্ট রিসোর্টে না গিয়ে যেখানেই যাই আমাকে তো অন্তত এক রাত একাই থাকতে হবে! … সেটা আবার আরেক যন্ত্রণা! …

দেখি, কীভাবে কি প্ল্যান করা যায় … আপাতত নেপাল যাচ্ছি ঈদের সময়, টিকিট করা হয়েছে এইটাই আপডেট …

তবে, নেপাল যাবার আগে আমাকে অনেকগুলা কাজ সেরে ফেলতে হবে … স্কুলের পরীক্ষার খাতা দেখা আর রেজাল্ট তৈরির কাজ করতে গিয়ে দুরন্ত টিভি’র অনুবাদের কাজটায় একটু ভাটা পড়েছে, সেটা শেষ করতে হবে, মুনির ভাইয়ের অনুবাদের কাজ অবশ্যই শেষ করতে হবে আর স্কুলের পরের সেশনের কাজ শেষ না করলেও কিছুটা কঙ্কাল দাঁড় করাতে হবে … স্কুলের কাজটা পুরোপুরি ধরবো হয়তো নেপাল থেকে ফিরে এসে স্কুল খোলার আগ পর্যন্ত … কিন্তু দুইটা অনুবাদের কাজ শেষ করা মাস্ট, অবশ্যই নেপাল যাবার আগে … একেবারে টার্গেট সেট করে কাজ করতে হবে ২৫ তারিখ থেকে … এর মধ্যে হয়তো ফ্রেঞ্চ ক্লাসের পরীক্ষাও পড়বে … সেটাও উৎরে যেতে হবে … অনেক অনেক কাজ …

আজকের মতো আর লেখার জন্য কোনো প্রসঙ্গ মাথায় আসছে না … আপাতত যাই একটু খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি … বিকালে আবার ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম’ এর শেষ দুই এপিসোড ব্যাক টু ব্যাক দেখতে গিয়ে ঘুমানো হয়নাই … আজকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি না হয় … কাল স্কুলে যেতে হবে একটু তাড়াতাড়িই … অনেক কাজ কালকে … পরশু রিপোর্ট কার্ড ডে … কাল সব কাজ না গুছিয়ে আসলে একটা হচপচ লাগবে …

ওকে, শেষ করি এখানেই …

 

দিনযাপন । ১৭০৫২০১৮

কেমন বিক্ষিপ্ত মন-মেজাজ নিয়ে কয়েকদিন যাবৎ চলছি … আজকের দিনযাপনের লেখাতেও নিশ্চয়ই তার প্রতিফলন ঘটবে …

কিন্তু আজ আমার দিনযাপন লিখতে ইচ্ছা করছে খুব … আমি লিখবো … অনেকদিন হয়ে গেলো দিনযাপন তো দূরের কথা, ল্যাপটপ নিয়েই বসার সুযোগ পাচ্ছিলাম না! … আজকে মনে হয় প্রায় সপ্তাহ দেড়েক পরে ল্যাপটপটা নিয়ে বসলাম … স্কুলের পরীক্ষার খাতা দেখার চাপে আর সব কাজই মোটামুটি শেলফে তুলে রাখার অবস্থা ছিলো … আজকে সব খাতা দেখে শেষ করলাম, নাম্বার জমা দিয়ে দিলাম … মাথা হাল্কা … এখন খালি রিপোর্ট কার্ড বানানোর কাজ … ২৩ তারিখে রিপোর্ট কার্ড দেয়া হয়ে গেলে আরও মাথা হাল্কা হবে … অন্তত এক মাসের জন্য …

ইদানীং এত স্ট্রেসড লাগে সবকিছু … খুব অল্পতেই কাবু হয়ে যাই … না শরীর নিতে পারে, না মন … অবশ্য শরীরের দোহাই আমার দেয়া উচিৎ না … কারণ আমি নিজেই যতটা পারছি শরীরকে ট্রাবল দেয়ার কাজ করেই যাচ্ছি … এমনকি গত তিন/চারদিন যাবৎ মন-মেজাজ খারাপ বলে ওষুধগুলাও খাচ্ছি না … নিয়ম করে জানালা দিয়ে ফেলে দিচ্ছি … কারণ আমার মনে হচ্ছে ভালো থাকবার কিংবা ভালো থাকতে চাওয়ার অধিকার আমার নেই … আমি সেটা ডিজার্ভ করি না …

কেবল মনে হচ্ছে আমি যা করি, যা ভাবি, যা চাই সবই ভুল … এমনকি কিছু একটা ভুল করছি ভেবে যদি ঠিক কাজটা করতে চাই, সেটাও আরেকটা ভুলই হয় … চরম এক কনফিউজিং মন নিয়ে চলছি আমি … খালি মনে হয় মরে যাই না কেন আমি … হয়তো মরে গেলে আমি নিজেও শান্তি পেতাম … আশেপাশের মানুষদের জন্যও রিলিফ হতো … কিন্তু আমি আবার একই সাথে প্রচণ্ড ভীতু মানুষ … আত্মহত্যার কথা ভাবলেও সেটা ভাবনা পর্যন্তই … সত্যি সত্যি নিজেকে নিজে মেরে ফেলার সাহস আমার কাজ করে না … কিন্তু ইদানীং আমার মধ্যে সুইসাইডাল থটস খুব ফ্রিকোয়েন্টলিই আসে … এমনকি আমি ভাবছি একটা নতুন ডাইরি লিখতে শুরু করবো, সেটা অনেকটাই আমার সুইসাইডাল নোটস-এর মতোই হবে … আমি যদি সত্যি কোনোদিন কোনো একটা হিট অভ্‌ মোমেন্ট-এ আত্মহত্যা করেই ফেলি, তাহলে আমি হয়তো আমার সকল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিয়ে যাবো … তখন এই ব্লগ, এই দিনযাপন এইসবও কেউ খুঁজে পাবে না … কিংবা যদি সেটা না-ও করি, তারপরও মানুষের নিশ্চয়ই এত ইচ্ছা জাগবে না যে আমার পুরনো দিনযাপন ঘেঁটে ঘেঁটে মৃত্যুর কারণ নিয়ে গবেষণা করবে …

ইনফ্যাক্ট, আমি যদি কোনোদিন হুট করে সুইসাইড করেই ফেলি, তাতে কারোরই হয়তো কিছু যাবে আসবে না … কেউ কেউ হয়তো কয়েকদিন শোক করবে, ফেসবুকে, ইন্সটাগ্রামে, কফি টেবিলে, ক্লাসে, স্কুলে, গ্রুপে আমাকে নিয়ে কিছুদিন ‘কেন এমন করলা’ টাইপ কথাবার্তা লিখবে, তারপর একসময় সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে … আমার যখন খুব মন খারাপ থাকে, আমি ফেসবুক খুব ডিপ্রেসিং কথাবার্তা লিখি … নিজের মনের ভারাক্রান্ত ভাবটা ফিল্টার করার জন্যই লিখি … হয়তো ফেসবুকে না লিখে ব্যক্তিগত ডাইরি-তেই লিখতে পারতাম, কিন্তু আমি ইচ্ছা করেই কথাগুলো ফেসবুকেই লিখি … তাতে অন্তত মানুষের প্রতিক্রিয়াগুলো জানা যায় … ইদানীং যেমন এইসব কথাবার্তায় কেউ খুব একটা রেসপন্স-ই করে না … আবার এমন এমন সব মানুষেরা রেসপন্স করে, একটা-দুইটা কথা লেখে যাদের আমি আশাই করিনাই যে আমার পোস্টগুলাই হয়তো দেখে! … তো, একটা প্যাটার্ন বোঝার চেষ্টা করছি … এই যে এখন অনেকেই খুব সাটলভাবে আমার পোস্টগুলোতে রেসপন্স করা, কিংবা এমনকি সরাসরি দেখা হলেও ইন্টারঅ্যাক্ট করার ব্যাপারগুলো এড়িয়ে যায়, এরকম মানুষের সংখ্যাই নিশ্চয়ই দিন দিন বাড়বে … কারণ মানুষের একটা স্বভাব হচ্ছে তাড়া কখনো কারো সমস্যার, খারাপ সময়ের দায় নিতে চায় না … ফলে চুপচাপ এড়িয়ে থাকাটাই শ্রেয় মনে করে … কারণ দায়বদ্ধ অনুভব করতে গেলেই সমস্যা … তখন আমাকে তাদের অতিরিক্ত একটু মনোযোগ দিতে হবে … এদিকে, আমি অনুভব করছি যে এইসব দেখতে দেখতে আমার নিজেকে আইসোলেটেড করে ফেলার একটা টেন্ডেন্সি গ্রো করছে … ইদানীং আমি যত কম পারি মানুষের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি … আসলে ইচ্ছাই করে না … এমনকি যাদের সাথে নিয়মিত এখন একটু কথাবার্তা হয়, তাদের সাথেও আস্তে আস্তে যাবতীয় কথা-বার্তা কমিয়ে দিতে ইচ্ছা করে … একসময় হয়তো এরকমই হবে যে আমি নিজেকে একেবারেই গুটিয়ে নেবো … এমনকি ফেসবুকে, ইন্সটাগ্রামে, দিনযাপনে কিছুই লিখবো না … তারপর একদিন হঠাৎ মনে হবে মরে যাই, তারপর কোনো না কোনো উপায়ে মরে যাবো …

আত্মহত্যার কথা মনে আসলেই আমার রিঙ্কন দা’র কথা খুব মনে হয় … মানুষটা খুব ভেবে-চিন্তে, অনেক সময় নিয়ে নিজের মৃত্যুর পরিকল্পনা করেছে বলে মনে হয় আমার কাছে … এবং এখন তার মৃত্যুর পরে আস্তে আস্তে তার লেখা, তার গান, তার এটা-সেটা কথা নিয়ে ভাবলে হঠাৎ মনে হয় আরেহ! এইসব কথা কি রিঙ্কন দা নিজের মৃত্যুর কথা ভেবেই লিখে গিয়েছিলো? নাকি এসব লেখার কারণে তার মধ্যে মৃত্যুচিন্তা আসছিলো? … সেদিন চারুকলার আরেকজনের মারা যাবার খবর শুনলাম … প্রদীপ নাম ছিলো তার … আমি তাকে চিনি না … হয়তো দেখেছি বা দেখিনি, মনে করতে পারি নাই … তার খবর পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিলো, সে-ও নিশ্চয়ই হুট করে মনে হয়েছে বলে আত্মহত্যা করেনি … নিশ্চয়ই তার কথা, তার আচরণ কেউ খুব মনোযোগ দিয়ে বিবেচনা করলে তার সুইসাইডাল থটসগুলো বুঝতে পারতো! …

যারা আত্মহত্যা করে, তাদের শেষ ভাবনাটা হয়তো এটাই হয় যে তারা আশেপাশের মানুষদের কাছ থেকে একটু মনোযোগ পেলেই জীবনকে নিয়ে ইতিবাচকভাবে ভাববার প্রেষণা পেতো! …

আমারও ইদানীং মনে হয় আমার ব্যাপারে মানুষের মনোযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে … আর এই মনোযোগ না থাকার অবকাশে আমি নিজেকে নিয়ে যত নেতিবাচক ভাবনাদের প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছি আর নিজেকে শেষ করে ফেলার কথাও ভাবছি …

যাই হোক, এইসব নিয়ে কথাবার্তা আপাতত বাদ দেই …

খুব ইচ্ছা হচ্ছে কোথাও বেড়িয়ে আসি … একদম কাম অ্যান্ড কোআয়েট একটা বেড়ানো … ভুটানে যেতে ইচ্ছা করে খুব … মনে হয় ভুটান গেলেই হয়তো আমার মন ভালো হয়ে যাবে … থিম্পু শহরের প্রতিটা কোণা থেকে যে বড় বুদ্ধমূর্তিটা দেখা যায়, সেই মুর্তির পায়ের কাছ থেকে পুরো থিম্পু শহরটা দেখা যায় … বুদ্ধমুর্তির পায়ের কাছে রেলিঙয়ে বসে পাহারঘেরা থিম্পু শহরটা দেখতে এক আশ্চর্যরকমের শান্তি লাগে … কিংবা নেপালের নাগরকোটে কোনো একটা হোটেলের বারান্দায় বসে পুরো হিমালয়টা যায় … পূর্ব থেকে পশ্চিমে, পশ্চিম থেকে পূর্বে … সে আরেক অপরূপ দৃশ্য … নেপাল যাওয়ার একটা প্ল্যান হচ্ছিলো তিন্নি আপুর সাথে … কিন্তু সেটা আবার বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস প্ল্যান … লাস্ট রিসোর্ট নামে একটা জায়গা আছে, কাঠমান্ডু থেকে ৩ ঘণ্টার রাস্তা … সেখানে গিয়ে বাঞ্জি জাম্পিং করবে … আমার বাঞ্জি জাম্পিং-এর ইচ্ছা ছিলো না, কিন্তু অন্তত কোথাও ঘুরে আসা হবে চিন্তা করে রাজি ছিলাম নেপাল যেতে … এদিকে লাস্ট রিসোর্ট-এর ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখলাম যে ওই রিসোর্টে যেতে হলে হাইওয়ে থেকে একটা সাসপেনশন ব্রিজ হেঁটে পাড় হতে হয় … নিচে একটা গিরিখাত … আর ব্রিজের ওপারে আরেক পাহাড়ের ওপরে ওই রিসোর্ট … তো এই ঝুলন্ত ব্রিজ হেঁটে পাড় হতে হবে চিন্তা করেই আমার সেখানে যাবার উৎসাহ চলে গেলো … পরে ভাবলাম যে নেপাল যাবো তিন্নি আপুর সাথে, তারপর সে লাস্ট রিসোর্টে গেলে যাবে, আর আমি নিজের মতো কোথাও ঘুরবো … কিন্তু টিকিট কেনার টাকাও এই মুহুর্তে নাই … জুন মাসের আগে সেই টাকা হবেও না … এদিকে আমাদের সাথে তিন্নি আপুর আরেক বান্ধবীও যেতে রাজি হয়েছিলো … তো পরে ঠিক হলো যে প্লেনের টিকিট কেনার সময় তিন্নি আপু আর শামা আপু মিলে এখন আমার টাকাটা দিয়ে দেবে, আমি হাতে টাকা আসার পর বাকি খরচে কন্ট্রিবিউট করবো … কিন্তু শেষমেশ শামা আপু টিকিট বুকিং পর্যন্ত দিলো, অথচ টিকিট আনতে যাবার ঘণ্টাখানেক আগে হঠাৎ জানালো যে উনি যাবে না, এমনকি টিকিটও আনতে পারবে না … তো ওই টিকিটের বুকিং ক্যান্সেলও হয়ে গেলো, কারণ তিন্নি আপুর আবার একসাথে দুইজনের টিকিট কেনার মতো টাকাও নাই এই মুহুর্তে … সে মনে হয় সবকিছু মিলায় একটু বিরক্তও হয়েছে … সে বললো নিজের টিকিট সে নিজেই কাটবে, আমি যদি যেতে চাই তো যেন নিজেই নিজের টিকিট কাটি … এদিকে এখন আমার মনের এমন অবস্থা, এখন মনে হলো আসলে নেপালে যাওয়া আমার ভাগ্যে নাই বলেই এত রকমের বাঁধা আসছে … তাই মনে মনে ভেবেই নিলাম, যতই কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা থাকুক আমার, আমি যাবো না … ঘুরতে গেলেই আমার ভালো লাগবে, কিন্তু কোনোরকম ভালো লাগার মতো কিছুই তো আমি ডিজার্ভ করি না … তাই ঘুরতেই বা কেন যাবো? …

অতএব, নেপাল যাচ্ছি না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি … দরকার কি এত ভালো লাগার ?

আসলে, দেখা যায় যে যেটাই আমি মনে মনে চাই, ঠিক তার বিপরীতটাই ঘটে … এই যেমন এখন একটা নাটক চলছে শিল্পকলায়, ‘রুধিররঙ্গিনী’ … একটা নাটকই প্রায় সপ্তাহব্যাপী প্রতিদিন একটা করে শো হচ্ছে … তো ১৫ তারিখে প্রথম শো হলো … তার আগেরদিনও আমার এত মাথা ব্যথা ছিলো যে বিছানা থেকেই উঠতে পারছিলাম না … তাই ১৫ তারিখে নাটকটা দেখতে যাবো কি যাবো না তাই নিয়ে দোনোমনো করছিলাম … ১৮ তারিখ, মানে আগামীকাল কিনু কাহারের থেটারের শো হবার কথা, তো ভাবলাম যে ওইদিন বিকাল ৫টায় রুধিররঙ্গিণী’র একটা শো আছে, ওইটা দেখে ফেলতে পারবো … যেহেতু নিজেদের গ্রুপের শো আছে, ওই উছিলায় তো শিল্পকলা যাওয়া হবেই … এদিকে ১৫ তারিখ অমিতের সাথে আরেকটা ইভেন্টে যাওয়া নিয়ে কথা বলছিলাম, তখন ও জানালো যে যেহেতু শুক্রবারে কিনু কাহারের শো আছে, তাই ও মঙ্গলবারেই রুধিররঙ্গিনীর শো দেখে ফেলছে বিকালে … তো আমার বেশ মন খারাপ হলো যে ও তো আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করলো না যে আমি নাটকটা দেখবো কি না! অথচ আমি যেদিনই যেই নাটক দেখতে যাই, ওকে একবার হলেও জিজ্ঞেস করি দেখবে কি না! … কেমন ভাই আমার যে নিজের বোনের কথাও একবার ভাবে না! – এইরকম ভেবে মন খারাপ করে ফেললাম … অমিতের সাথে একবার আলোচনা করলাম যে ও আমার জন্য একটা টিকিট ম্যানেজ করতে পারবে কি না, তাহলে আমিও দেখবো … পরে নিজেই আবার বললাম যে শুক্রবারেই দেখবো … তারপর ইভেন্ট-টা একজনকে শেয়ার করে ভাবলাম তাকে সাহস করে জিজ্ঞেস করেই ফেলবো যে নাটকটা দেখতে যাবে কি না … তাহলে অন্তত তার উছিলায় আমি নাটকটা দেখে নেবো … কিন্তু তাকে ইভেন্ট শেয়ার করলাম ঠিকই, কিন্তু উত্তরে যদি ‘না’ শুনে কষ্ট পেতে হয়, সেজন্য আর জিজ্ঞেসই করলাম না … এদিকে তোড়ার সাথে স্কুলে বলে নাটকটা নিয়ে কথা বলতে বলতে হঠাৎ তোড়াও বললো যে টিকিট পেলে ওইদিনই সন্ধ্যায় দেখে ফেলা যায় নাটকটা, কারণ অন্যদিন ও পারবে না … তো আমরা দুইটা টিকিটের জন্য খোঁজ-খবর নিলামও, কিন্তু শেষ মুহুর্তে তোড়া আর যেতে চাইলো না, বাসায় একটা কাজের কথা মনে পড়লো ওর … তো আমিও ভাবলাম যে ঠিক আছে, সমস্যা নাই, শুক্রবারেই না হয় দেখে নেবো … এদিকে যাকে আমি সাহস করে বলতে পারিনি নাটকটা দেখতে যাবে কি না, রাতে জানলাম যে সে-ও ওইদিন ঘটনাচক্রে নাটকটা দেখতে গিয়েছে … আমার নিজের ওপর, নিজের চাওয়া না চাওয়া, সার্বিক পরিস্থিতি, প্ল্যান হওয়া আড় ক্যান্সেল হওয়া সবকিছুর ওপরেই তখন হঠাৎ খুব রাগ হলো … মনে হলো যে, এই যে সে নাটকটা দেখতে যাবে, আর আমি এতরকমের প্ল্যান করে টরেও গেলাম না, এটা এজন্যই হয়েছে যে আমি মনে মনে একবার হলেও ভেবেছিলাম যে তাকে আমার সাথে নাটকটা দেখতে যাওয়ার জন্য বলবো … যেহেতু আমি নিজের জন্য এরকম একটা কিছু মনে মনে চেয়েছি, তাই সেটা যাতে না হয় সেজন্যই সবকিছু এভাবে ঘটলো! … না হলে আমিও যদি মঙ্গলবারে নাটকটা দেখতে যেতাম, তাহলে তো কোনো না কোনোভাবে তার সাথেই নাটকটা দেখা হয়ে যেতো! … সেটা হলো না এইজন্যই যে আমি এটা মনে মনে চেয়েছি …

তো নিজের ওপর এই রাগটা আমার তার ওপর খুব অভিমান দিয়ে প্রকাশ হলো … সেটাও হওয়ার কোনো যুক্তি নাই … কিন্তু হলো … তার সাথে বেশ রাগ দেখায়, কষ্ট পেয়ে নিজেই আবার কথা বন্ধ করে দিলাম দুই দিন যাবৎ …

কেন যে এইসব করি নিজেই বুঝি না! … এইজন্যই মাঝে মাঝে ভাবি যে মানুষের সাথে আমার ইন্টারঅ্যাকশন যত কম হবে তত ভালো … নিজের জন্য না হোক, অন্যের জন্য … অন্যের কাছ থেকে এক্সপেকটেড মনোযোগ পাচ্ছি না বলে দুঃখ করি, আসলে এই মনোযোগগুলো আমি নিশ্চয়ই ডিজার্ভও করি না … শুধু শুধুই নিজেই এমন সব আচরণ করে বসি যে নিজেরই খুব রাগ লাগে যে এমনই কেন হয় আমার সাথে! … কতরকমভাবে আমি কষ্ট পেতে পারি সেজন্যই হয়তো আমার চারপাশের সবকিছু কেমন উল্টে-পাল্টে যায় … অথচ আমিই কেন কখনো উল্টোটা চাই না, কে জানে! …

এই যেই মানুষটার সাথে আমিই এমন করলাম, আবার আমিই কথা বন্ধ করলাম, তাকে নিয়েই আবার তিন/চারদিন আগেই একটা খুব মন খারাপ করা স্বপ্নও দেখেছি … এমন স্বপ্ন কেন দেখলাম সেটা ভেবেও মনটা বেশ বিক্ষিপ্ত হয়েই আছে … স্বপ্নের যেটুকু অংশে সে ছিলো তার আগেও কি কি জানি সব অদ্ভুত বিষয় আশয় দেখছিলাম … কোথাও যাচ্ছি, কিন্তু অনেকটা সময় রাস্তায় আটকানো … হঠাৎ বুঝলাম যে যেখানে আটকে আছি ওটা একটা রানওয়ে … সেখানে প্লেন থামিয়ে এক দেশের ( সম্ভবত বাংলাদেশেরই) প্রেসিডেন্ট আরেক দেশের প্রেসিডেন্ট-কে রিসিভ করছে … লাইন ধরে মানুষজন দাঁড়িয়ে তাদের লাল গালিচায় ওয়েলকাম করছে … এদিকে আমি ভাবছি যে আমাদের নেপাল যেতে তো দেরি হয়ে যাচ্ছে … রানওয়ের ওপর এসব করার দরকার কি? … আবার কোথায় গিয়েছি, সেখানে বিশাল খোলা প্রান্তরের মাঝখানে একটা জারুল গাছ … গাছের নিচটা পুরোটা জারুলের পাপড়িতে বেগুনি হয়ে আছে … কিন্তু যতই সেই জায়গাটা কাছে মনে হোক, আমি কিছুতেই সেখানে পৌঁছাতে পারছি না … হেঁটেই যাচ্ছি, কিন্তু মনে হচ্ছে একজায়গাতেই হাঁটছি! … এইরকম কি কি সব দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখলাম আমি আমার বাসায় … আর আরেক রুমে বসে সে ল্যাপটপে কাজ করছে … আমি মনে মনে ভাবছি যে দুইদিন ধরে এই মানুষটা আমার বাসায় আছে, আর দুইদিন যাবৎ দেখলাম যে সে খালি অন্য অনেক মেয়ের সাথেই কথা বলছে, অথচ আমার সাথে তো কোনোরকম ইন্টারঅ্যাক্ট করছে না … এখানে আমি আবার নিজেই স্বপ্নের মধ্যেই ভাবছিলাম যে এই কাজটা তো সোহেল করতো, হয়তো সোহেল-এর স্মৃতিটাই এখানে দেখছি, কিন্তু মানুষটাকে দেখছি আরেকজন … কিংবা হয়তো আমার মনে অবচেতনে এই ভয়টা কাজ করে যে তার সাথে কিছু হলে সেও সোহেলের মতোই করবে … এদিকে আমি তাকে বলেই ফেললাম যে আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেন? আমার খারাপ লাগে না? … তো তখন মানুষটা আমাকে নিয়ে হাঁটতে বের হল … হাঁটতে হাঁটতে বেশ ইমোশনাল কথাবার্তা হচ্ছিলো … সে বলছিলো কেন সে আমাকে তার সাথে জড়াতে চায় না … একপর্যায়ে একটা কনস্ট্রাকশন সাইটের পাশে এসে দাঁড়ালাম আমরা … একটা বালির স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম … হঠাৎ আমাকে এক পুলিশ ডাক দিলো … আমি তার সাথে কথা বলার জন্য নিচে নামলাম … হঠাৎ কোথা থেকে একটা বিশাল পানির ঢেউ আসলো পেছন থেকে … আমি আর সেই পুলিশ তাকে ডাকছি নিচে নেমে আসার জন্য, সে খুব ব্যস্ত হয়ে মোবাইলটা পকেটে ঢোকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সে নামছে না … আমি তাকে টেনে নামাবো বলে বালির স্তূপের কাছে যেতে চাইলাম, কিন্তু ওই পুলিশটা আমাকে ধরে রাখলো … ততক্ষণে সেই পানির ঢেউ এসে তাকে ধাক্কা দিলো … ঢেউটা আমার ওপর দিয়েও গেলো,কিন্তু আমার কিছু হলো না … সে ছিটকে পড়ে গেলো অনেকটা দূরে … আমি খুব জোরে চিৎকার করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তার কাছে গেলাম … দেখলাম রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ে তার মাথা, মুখ সব রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে … আমি তাকে নিজের কোলে আগলায় নিয়ে বসলাম, প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছি, কাঁদছি হাউমাউ করে, কিন্তু কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না … সেই পুলিশটা কি ব্যবস্থা করা যায় দেখি বলে চলে গেলো … রাস্তায় পাশ কাটিয়ে যাওয়া কয়েকজন মানুষ এসে ছবি-টবি তুললো, কিন্তু কেউ কিছু সাহায্য করার ইনিশিয়েটিভ নিলো না … এদিকে আমি তাকে একা উঠাতে পারছি না … আমার হাত-কোল সব রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে … আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই যাচ্ছি, আর তার নাম ধরে বারবার ডাকছি … এদিকে হঠাৎ করেই দৃশ্যপট কেমন পাল্টে গেলো … মানুষটা কেমন হাল্কা হয়ে গেলো ওজনে … মনে হলো শুধু একটা কঙ্কাল … আমি আরও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গেলাম যে সে মারা গেলো কি না … আবার ভাবলাম মারা গেলে তো সে ভারী হয়ে যাবার কথা … এদিকে একদমই একটা নবজাতকের মতো আকার হয়ে যাওয়া মানুষটাকে নিয়ে আমি হাসপাতাল খুঁজে বেড়াচ্ছি … শেষমেশ একটা হাসপাতাল খুঁজে পেলাম … দেখতে সেটা মফস্বলের টিনের ছাদ দেয়া প্রাইমারি স্কুল বিল্ডিং … এটা কেন হাসপাতাল হবে ভাবতে ভাবতে সেখানে ঢুকলাম … আমাকে দেখেই সেখানকার ডাক্তাররা হাসতে শুরু করলো … আমি খুব ঠাণ্ডা গলায় বললাম আমি কেন এসেছি … কোল থেকে আমি তাকে নামিয়ে একটা টেবিলে রাখলাম … একজন একটা কাগজে লিখে দিলো ‘ডেড’, অনেক দেরি হয়ে গেছে … এত ব্লিডিং হয়েছে তার যে শরীরের সব রক্ত বের হয়ে হাড়-মাংস শুকিয়ে সে এরকম কঙ্কালের মতো হয়ে গেছে … আমি কাঁপতে কাঁপতে দরজা দিয়ে বাইরে বের হলাম … দেখি যে খবর পেয়ে মিন্নি, তৃষা আরও কে কে আসছে … আমি প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম … কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো …

কেন এমন একটা স্বপ্ন দেখলাম সেই প্রশ্নটা মাথায় ভীষণভাবে গেঁথেছে … খুব অস্থির করে দিলো আমাকে এই স্বপ্নটা … এমনকি পরের দুইদিন মাথা ব্যথা হয়ে, প্রেশার বেড়ে-টেরে অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো … এভাবে কখনো কারো মৃত্যুর স্বপ্ন দেখিনাই আমি … তাও আবার আমার কোলেই মৃত্যু … এই দৃশ্যগুলো কিসের প্রতীক কে জানে! … আমার অবচেতন মনেরই কোন চিন্তাগুলো এখানে প্রতিফলিত হয়েছে সেটা ভাবতে বসে আরও অস্থির হয়ে যাচ্ছি …

যাই হোক … আর লিখতে ভালো লাগছে না আজকে … মাথা কেমন জ্যাম হয়ে গেছে … কালকে আবার সকালবেলা আলিয়ঁস ফ্রসেঁস-এ ক্লাস আছে … কাল নাকি মসিঁয়ু আকবর পরীক্ষা নেবে … আমি এক লাইনও কিছু দেখলাম না ফ্রেঞ্চ-এর … এই সেশনটা খুব বিরক্ত লাগছে … প্রতিদিন একই জিনিসই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ায়, একই কথা বলে … উনার খুব প্রশংসা শুনতাম সবসময় সবার কাছে … অথচ এখন ক্লাস করতে বিরক্ত লাগছে … খালি মনে হচ্ছে এই সেশনটা তাড়াতাড়ি শেষ হয় না কেন! … শুধুমাত্র বাসায় এক লাইনই ফ্রেঞ্চ পড়া হয়না দেখে ক্লাসগুলা নিয়মিত করতে যাই … নাহলে হয়তো যেতামই না! … বে-আ তে একের পর এক খালি সেশনগুলা বিরক্তিকরই হচ্ছে … আগামী সেশন আরও কেমন হয় কে জানে! …

ওহ! আগামীকালকে কিনু কাহারের থেটার নাটকটা ক্যান্সেল হয়ে গেছে কি কারণে জানি … ফলে এখন আর আমার শুধুমাত্র ‘রুধিররঙ্গিনী’ দেখার জন্য শিল্পকলা অ্যাকাডেমি যেতেও ইচ্ছা হচ্ছে না … কিনু কাহারের থেটারের শো হলে তাও ফ্রেঞ্চ ভাষার ক্লাস করে শিল্পকলার দিকে চলে যাওয়া যেতো, ৫টা পর্যন্ত সময় কেটে যেতো … কিন্তু কাল শুধু রুধিররঙ্গিণী দেখতে হলে ক্লাসের পরে আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না … তখন হয় আলিয়ঁসেই চুপচাপ বসে থাকতে হবে, নয়তো বাসায় এসে আবার যেতে হবে … কিন্তু এর কোনটাই করার কোন মানসিক উদ্যম এখন আর আমার কাজ করছে না … আমার সাথে এমনই হতে হয় সবকিছুর, এইটা ভেবেই আর ভালো লাগছে না …

ইন ফ্যাক্ট, কিছুই ভালো লাগে না এখন আর … খালি মনে হয়, একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখতাম মরে গেছি তাহলেই বোধহয় সবচেয়ে ভালো হতো …